একটি কার্যকরী ভুল মেইল

সালমান শাকিল, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:০৪

‘দেশে এসে গবেষণা করব বলে পিএইচডি শেষ করে দেশে ফিরেছিলাম। কিন্তু গবেষণা শুরুর জন্য কোনো কেমিক্যাল ছিল না। ছিল না কোনো যন্ত্রপাতিও। তাই পূর্ব পরিচিত জাপানি আর্সেনিক গবেষক অধ্যাপক ড. সাকুরাইকে বাংলাদেশে আর্সেনিকের গবেষণায় সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে একটি ই-মেইল করেছিলাম। তবে ভুলবশত যাকে মেইল করা উদ্দেশ্য ছিল সেই মেইলটি একই নামের আরেক গবেষকের কাছে চলে গিয়েছিল। এমন একটা ভুল থেকে শুরু হয়।’ বলছিলেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও আর্সেনিক গবেষক ড. খালেদ হোসেন। তিনি জানতেন না মেইল করার ৬ মাস আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন জাপানের সেই গবেষক ড. সাকুরাই।

তখন ২০০৭ সালের শেষের দিক। মেইলের ফিরতি রিপ্লাই না আসায় অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল গবেষণা। জাপানে পিএইচডি শেষ করে সবেমাত্র কর্মস্থল বিশ^বিদ্যালয়ের বিভাগটিতে অধ্যাপক হিসাবে যোগ দিয়েছেন ড. খালেদ। গবেষক ধরেই নিয়েছিলেন, হয়তো আর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এই চিন্তার কিছুদিন পরই অন্য একটি মেইল থেকে রিপ্লাই এসেছিল অধ্যাপক খালেদের মেইলে। মেইলে বেশ অনুরোধ জানিয়ে বলা হলো, আমি আর্সেনিকের গবেষণার জন্য যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছি, তা থেকে যেন সরে না আসি। তখনই বাংলাদেশে আর্সেনিকের স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে কাজ শুরু করার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম।

গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করতে শুরু করেন রিপ্লাই দেওয়া সেই গবেষক। তিনি জাপানের টকুশিমা বুরনি বিশ^বিদ্যালয়ের মলিকুলার নিউট্রিয়েশন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেইসিরো হিমনু।
হিমনু প্রথম বাংলাদেশে আসেন ২০০৯ সালে । ওই সময়ে একটি লাগেজ ভর্তি গবেষণা কেমিক্যাল ও যন্ত্রপাতি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তিনি।

গবেষণায় নতুন মোড় পেয়েছিল তখন থেকেই। যার যাত্রা শুরু হয়েছিল ভুল ঠিকানায় পাঠানো একটি মেইল থেকে।

মজার বিষয় ছিল ড. সেইসিরোর আগে থেকেই আগ্রহ ছিল আর্সেনিক নিয়ে কাজ করার। আর যার কাছে মেইলটি গিয়েছিল সেও ছিল হিমনুর পরিচিত। অনেক খোঁজাখুঁজির পর প্রয়াত সাকুরাইকে না পেয়ে ঐ মেইলটি পরিচিত গবেষক ড. সেইসিরোকে সাকুরাই নামের একজন গবেষককে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।

সেখান থেকেই যৌথ গবেষণা শুরু হয় রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের আর্সেনিক গবেষক অধ্যাপক খালেদ হোসেন ও জাপানের টকুশিমা বুরনি বিশ^বিদ্যালয়ের মলিকুলার নিউট্রিয়েশন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের আর্সেনিক গবেষক ড. হিমনুর।

কাজ শুরু করলেন দেশে আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে। গবেষণা কাজে গতি আনতে বিভাগে গবেষণাগার স্থাপনের জন্য সুপারিশও করেন তিনি। ওই বছর বিশ^বিদ্যালয় ও প্রাণ রসায়ন-অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পরিবেশ স্বাস্থ্য বিজ্ঞান গবেষণাগার’।

বিভাগের আরেক শিক্ষক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সাউদকে নিয়ে গবেষণার কাজ শুরু করেন তিনি। শিক্ষার্থীদেরও সম্পৃক্ত করেন গবেষণায়। শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঘুরে দেখতে থাকেন আর্সেনিক আক্রান্ত এলাকাগুলো। এলাকাগুলোর অবস্থা নিয়ে তথ্যগুলো প্রকাশিত হয় বিদেশি জার্নালগুলোতে। দেশের বেশ কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ সৃষ্টিতে আর্সেনিকের ভূমিকা রয়েছে বলে চিন্থিত করতে পেরেছেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের এই আর্সেনিক গবেষক দল।

তরুণ গবেষক হিসাবে ড. খালেদ হোসেন গবেষণা স্বীকৃতি পেয়েছেন ‘ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্স’ থেকে। পেয়েছেন ই-দেশি পদক। তিন তিনবার ডিনস পদক পেয়েছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ৬০ টির ও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ হয়েছে তার। এরই মধ্যে ৬ জন গবেষক পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন গবেষণাগার থেকেই। আছেন ৪৫ জনের মতো এমএসসি থিসিসের গবেষক। ছুটির দিনেও খোলা থাকে গবেষণাগারটি।

(ঢাকাটাইমস/১৬ডিসেম্বর/এজেড)

সংবাদটি শেয়ার করুন

শিক্ষা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :