বেকায়দায় মেনন

নিজস্ব প্রতিবেদক
 | প্রকাশিত : ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ১১:০৩

নিজ নির্বাচনী এলাকায় একের পর এক ক্যাসিনোকাণ্ডে সমালোচনায় জেরবার ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাংসদ রাশেদ খান মেনন গত নির্বাচন নিয়ে বক্তব্য দিয়ে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের জোট ১৪ দলের শীর্ষ এই নেতা সম্প্রতি দাবি করেছেন, তিনি সাংসদ হলেও গত সংসদ নির্বাচনে এবং পরবর্তী উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এ নিয়ে তোলপাড় রাজনৈতিক অঙ্গন। সমালোচনার তোড়ে এই মুহূর্তে অনেকটা একলা হয়ে গেছেন জোট সরকারের সাবেক এই মন্ত্রী।

এমনকি সরকারের বিরোধী পক্ষ তার এই বক্তব্যকে লুফে নিলেও তিনি এত দিনে  পদত্যাগ না করায় সমালোচনা করা হচ্ছে তার। এখন আহ্বান জানানো হচ্ছে পদত্যাগের। জোট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সমালোচনার পাশাপাশি সমানতালে চলছে ট্রল। দাবি করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে অভিযানের।

এবার নিজের ঘরে ধাক্কা খেলেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি। বর্তমান নেতৃত্বের আদর্শচ্যুতির অভিযোগ তুলে পার্টি ছেড়েছেন পলিটব্যুরোর সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাস। গতকাল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক। এর মধ্য দিয়ে পার্টি আরেক দফা ভাঙনের হুমকিতে পড়ল বলে গুঞ্জন চলছে।

এদিকে গতকাল ১৪ দলের জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, নির্বাচন নিয়ে তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। এরপর তার বিষয়ে করণীয় ঠিক করবে জোট।

বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ওই বৈঠকে যাননি মেনন। তবে তার দলের সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা উপস্থিত ছিলেন সেখানে।

গত শনিবার বরিশালে ওয়ার্কার্স পার্টির এক অনুষ্ঠানে ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি বলে দাবি করেন রাশেদ খান মেনন। বলেন, ‘২০১৮ এর নির্বাচনে আমিও নির্বাচিত হয়েছি। তার পরও আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, ওই নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। এমনকি পরবর্তীতে উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ভোট দিতে পারেনি।’

পরে সমালোচনার মুখে ক্ষমতাসীন জোটের এই নেতা পরের দিন এক বিবৃতিতে দাবি করেন, তার বক্তব্য সম্পূর্ণ উপস্থাপন না করে অংশবিশেষ উত্থাপন করায় এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।

মেনন যা-ই বলুন না কেন, তার বক্তব্যে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। আপাতত কয়েক দিন আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে কোনো অনুষ্ঠানে না যেতে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতারা তাকে পরামর্শ দেন। অসুস্থতা নয়, এ কারণেই গতকালের বৈঠকে যাননি তিনি।

তবে বৈঠকে মেননের না থাকা নিয়ে ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘তার (মেনন) পার্টির সেক্রেটারি এসেছেন। তিনি কেন আসেননি, তা আমি বলতে পারব না।’

এর আগে সোমবার রাতে ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের ধানমণ্ডির বাসভবনে জোটটির শরিক দলগুলোর নেতাদের এক চা-চক্র হয়। সেখানেও উপস্থিত ছিলেন না মেনন।

বিমলের পদত্যাগে ধাক্কা

যশোরে অবস্থানরত ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাস ই-মেইলে আবেদন করে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন। সভাপতি মেননের সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন। ওয়ার্কার্স পার্টির আসন্ন কংগ্রেসের প্রস্তুতির মধ্যেই বিমল বিশ^াসের দল ছাড়ার ঘটনায় তাদের নেতাদের কারও প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। আগামী ২ নভেম্বর দলটির কংগ্রেস অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে।

দল ছাড়ার কারণ হিসেবে বিমল বলেন, ‘আমি মনে করি, ওয়ার্কার্স পার্টি মার্কস-লেনিনের আদর্শের কথা বললেও বাস্তবে তার নীতি-কৌশল, সংগঠন এবং তাদের কর্মকাণ্ডে তার প্রতিফলন নেই। তাই নেতাদের আদর্শগত রাজনৈতিক-সাংগঠনিক বিচ্যুতির কারণে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ প্রত্যাহার করেছি।’

বিমল বিশ্বাস ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন চলাকালীন তিনি বাম রাজনীতিতে যুক্ত হন। নানা দল হয়ে ১৯৯২ সালে অমল সেন ও রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে গঠিত ওয়ার্কার্স পার্টিতে যুক্ত হন বিমল বিশ্বাস।

দলটি গঠনের পর প্রথমে পলিটব্যুরো সদস্য পরে সভাপতি মেননের সঙ্গে ১০ বছর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সর্বশেষ কংগ্রেসে তার জায়গায় আসেন ফজলে হোসেন বাদশা।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট গঠনের পর ওয়ার্কার্স পার্টিতে দুই দফা ভাঙন হয়। এর একটি অংশ সাইফুল হকের নেতৃত্বে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন করে। আরেকটি অংশের কিছু নেতা সিপিবিতে যোগ দিয়েছেন। বিমল বিশ্বাসের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের আগে ওয়ার্কার্স পার্টিতে আরেক দফা ভাঙনের গুঞ্জন উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

ক্যাসিনোকাণ্ড

সম্প্রতি ক্যাসিনো অভিযানেও নাম আসছে রাশেদ খান মেননের। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবে অভিযানে বিপুল টাকা, মদ এবং জুয়া ও ক্যাসিনো সামগ্রী জব্দ করে র‌্যাব। এই ক্লাবের সভাপতি রাশেদ খান মেনন। সেদিনই মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ তিনটি ক্লাবে অভিযান চালানো হয়। এরপর আরামবাগ-মতিঝিল এলাকায় আরও চারটি ক্লাবে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চলে। এসব ক্লাবের অবস্থান মেননের নির্বাচনী এলাকায়।

ফলে তাতে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে নানা মহলে। যদিও এসব অভিযোগ নাকচ করেন মেনন। কিন্তু ক্যাসিনো থেকে তিনি টাকা পেতেন বলে খবর আসছে নানাভাবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ও ক্যাসিনো সম্রাট বলে পরিচিত ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে যে রাশেদ খান মেননকে দেড় কোটি টাকা চাঁদা দেওয়া হয়েছে।

আর এ থেকে গুঞ্জন তৈরি হচ্ছে, মেননের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হতে পারে। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকটি সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা ঢাকা টাইমসকে জানান, তারা এখন এ ব্যাপারে হ্যাঁও বলবেন না, নাও বলবেন না।   

বিভিন্ন মহলে এমনও গুঞ্জন চলছে, অভিযানের বিষয়ে সরকারকে চাপে ফেলতে মেনন নির্বাচন নিয়ে ওই বক্তব্য দেন।

ঢাকাটাইমস/২৩অক্টোবর/এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :