৭৩-এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুবাদ নয় বছরে এক খণ্ড

মনিরুল ইসলাম
| আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:২১ | প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:০৩

শিক্ষক নিয়োগসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে আইনের অস্বচ্ছতা দূর করার জন্য ৭৩-এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ বাংলায় অনুবাদের কাজ শুরু করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। কিন্তু তিন খণ্ডের এই অধ্যাদেশের এক খণ্ডও শেষ হয়নি গত নয় বছরে।

এই সময়ের মধ্যে প্রথমে অধ্যাদেশের অনুবাদের কাজটি বাংলা একাডেমি ঘুরে এসেছে। কিন্তু সেই অনুবাদ কাজে লাগেনি। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের কাছে পড়ে আছে কাজটি। বাকি অনুবাদটুকু আর করতে রাজি নন তারা।

স্বাধীনতার আগে যে নীতিমালায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হতো তা কালো আইন হিসেবে পরিচিত ছিল। আইনটি বিলুপ্ত করে ১৯৭৩ সালে প্রণয়ন করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার নতুন নীতিমালা, যেটি ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশ নামে পরিচিত। এই নীতিমালার অধীনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের চার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়।

ইংরেজিতে লেখা তিন খণ্ডের এই অধ্যাদেশ দেশের প্রধান চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইডলাইনও বটে। তবে শিক্ষক নিয়োগসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা সময় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে আইনটির বিভিন্ন ধারা নিয়ে দ্বিধা-সংশয়ের সৃষ্টি হয়। ভবিষ্যতে যাতে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা না থাকে সেজন্য ২০১০ সালে আইনটির বাংলা অনুবাদের উদ্যোগ নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সময় দেয়া হয় ছয় মাসের। কিন্তু গত নয় বছরেও কাজটি শেষ না হয়ে বরং অবহেলা আর সমন্বয়হীনতার এক নজির হয়ে পড়ে আছে।

দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এই কাজকে সময়সাপেক্ষ ও জটিল হিসেবে বর্ণনা করে বলছেন, এক খণ্ড অনুবাদ করে জমা দিয়েছেন। কিন্তু এ কাজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ছুটি দেয় না বলে তারা বাকি কাজ করবেন না।

বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার নীতিমালা সংবলিত একটি গণতান্ত্রিক কল্যাণমুখী অধ্যাদেশ প্রণয়নের দাবি ওঠে। এই দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতারা। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন’।

শিক্ষকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার নীতিমালা সংবলিত একটি আদেশ প্রণয়ন করেন। ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ ১১-এর আদেশবলে প্রণীত অধ্যাদেশটি ১৯৭৪ সালে কার্যকর করা হয়। তখন থেকে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এই অধ্যাদেশের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে।

গত দুই দশক ধরে উপাচার্য নিয়োগ, শিক্ষক নিয়োগ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও পদোন্নতিতে বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে এই অধ্যাদেশ। নিজেদের সুবিধামতো এই আইনকে নানাভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন বিভিন্ন সময় প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা। তৈরি করে চলছেন নানা বিতর্কও।

এই সমস্যা রোধে ২০১০ সালে আইনটি বাংলায় অনুবাদের জন্য চিঠি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একই বছরের ১৩ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটে বিষয়টি অনুমোদন হয় এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তৎকালীন সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান (বর্তমান উপাচার্য) এবং অ্যাডভোকেট এ এফ এম মেজবাহ উদ্দিনকে অনুরোধ করা হয়। এজন্য ৬ মাসে কাজটি শেষ করার নির্দেশ দেয়া হয়। অনুবাদের কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রথমে দায়িত্ব দেয়া হয় বাংলা একাডেমিকে। ২০১১ সালে রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বরাবর অর্থ ছাড় করা হয়। সে সময় এ কাজের জন্য বাংলা একাডেমিকে ৪ লাখ ৫৩ হাজার ৭৩২ টাকা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

অনুবাদের কাজ কাঙিক্ষত গতিতে না এগোনোয় ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর পুনরায় বিষয়টি ঢাবি সিন্ডিকেটে তোলা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সে সময় বাংলা একাডেমির ভাষা ও সাহিত্য উপবিভাগকে অধ্যাদেশ অনুবাদের কাজ তদারকির দায়িত্ব দেয়। বাংলা একাডেমি অধ্যাদেশের প্রথম খণ্ড অনুবাদ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পুনর্মূল্যায়নে তাতে নানা অসংগতি পাওয়া যায়।

ঢাবি কর্তৃপক্ষ সেটি পুনরায় সংশোধন ও সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব দেয় বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ভীষ্মদেব চৌধুরী ও আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রহমত উল্লাহকে। এক খণ্ডের কাজ করার পর তারাও হাত গুটিয়ে বসে আছেন। ঢাকাটাইমসের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, কাজটি সময়সাপেক্ষ, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেই সময় তারা পাচ্ছেন না। বাকি কাজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নতুন করে ভাবতে হবে বলে মত দেন তারা।

কাজটি শেষ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে তেমন গরজ আছে বলে মনে হয়নি অনেকের সঙ্গে কথা বলে। কাজটি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে, কিন্তু কেউ গা করছেন না। এমনকি বিশ্বদ্যিালয়ের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না অভিযোগ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই শিক্ষক কাজটি আর করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. এনামুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্পূর্ণ কাজটি শেষ করতে শিক্ষকদ্বয়কে কিছু সম্মানী দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে কাজ শেষ করতে না পারলেও বাংলা একাডেমিকে দেওয়া অর্থ আর ফেরত নেওয়া হয়নি।

আইনটি ইংরেজিতে হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী এটা নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখান না। আর এটা সব জায়গায় পাওয়াও যায় না। বিভিন্ন সময় প্রশাসন কর্তৃক এই আইনের লঙ্ঘন হলেও তা শিক্ষার্থীদের অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। আইনটি বাংলায় অনুবাদ করা হলে কোনো ধরনের লঙ্ঘন ও অনিয়ম সহজে ধরা পড়তে পারে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সচেতন হবে। সেজন্য আইনটি বাংলায় অনুবাদ করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গা-ছাড়া ভাব দেখাচ্ছে বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।

অধ্যাদেশ নিয়ে অবহেলার আরেক নজির দেখা গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে। সেখানে অধ্যাদেশ ’৭৩-এর জন্য নির্ধারিত পাতা থাকলেও তাতে অধ্যাদেশ সম্পর্কিত কোনো তথ্য নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা থেকেও গত কয়েক বছরে অধ্যাদেশের কোনো মুদ্রণ না হওয়ায় তা পাওয়া যায় না বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থার বিক্রয় কেন্দ্রে।

অনুবাদ কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে অধ্যাপক মো. রহমত উল্লাহর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এক বছর আগে অনুবাদ করে জমা দিয়ে দিয়েছি।’

দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য শিক্ষক ড. ভীষ্মদেব চৌধুরী জানান, তারা প্রথম অংশ অনুবাদ করে জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই কাজ করতে প্রচুর সময় লাগে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের কোনো ছুটি দেয় না। আমরা  ঠিক করেছি এ কাজ আর করব না।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ড. রহমত উল্লাহ প্রথম অংশ জমা দেওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, বাকি কাজ করবেন না তারা। তিনিও কাজটির সময়সাপেক্ষতা ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সময় না দেওয়ার অভিযোগ করেন। বলেন, ‘আমরা নিজেদের একাডেমিক কাজের ফাঁকে এই কাজ করি। বিশ্ববিদ্যালয় যে রকম আচরণ করে তাতে এমন বিষয় নিয়ে কাজ করার সময় নেই আমাদের।’

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সময় দেয়া হলে মত বদলাবেন কি না জানতে চাইলে অধ্যাপক রহমত উল্লাহ বলেন, ‘আমরা শিক্ষক মানুষ। আমাদের একাডেমিক রেসপনসিবিলিটি অনেক বেশি।’

নয় বছরে কাজটি শেষ না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আইনের মতো একটা অনুবাদ এত সহজ না। আমাদের নিত্যদিনের কাজ আছে। আর নির্দিষ্ট কোনো সময় বেঁধে দেওয়া ছিল না যে আমাকে এই সময়ের ভেতর করে জমা দিতে হবে।’

বিশ^বিদ্যালয় অধ্যাদেশের অনুবাদের কাজ পড়ে থাকার বিষয়ে কিছু বলতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো এনামুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আমি কিছু বলতে পারব না। তবে এটুকু বলতে পারি, অনুবাদের প্রথম খণ্ডের সম্পূর্ণ অংশ আমরা পাইনি।’

অধ্যাদেশের অনুবাদের হাল অবস্থা জানেন না উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান। তবে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি। ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে এভাবে দুই ধরনের ভাষ্য কাম্য নয়। কোথাও কোনো সমন্বয়ের ঘাটতি আছে কি না দেখতে হবে। এ ব্যাপারে আমি খোঁজ নিয়ে দেখব কী অবস্থায় আছে কাজটি।’

(ঢাকাটাইমস/১৫ডিসেম্বর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :