গার্মেন্টস খোলায় শঙ্কিত বিশেষজ্ঞরা, নির্বিকার মালিকরা

জহির রায়হান, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২৩:৩৫ | প্রকাশিত : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২৩:১৩
ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় ফিরছেন শ্রমিকরা। ছবিটি শনিবার দুপুরে শিমুলিয়া ঘাট থেকে তোলা।

শনিবার কিছু গার্মেন্টস খোলা থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এ সেক্টরের শ্রমিকরা। কাল রবিবার প্রায় সব কারখানা খুলে যাবে। ময়মনসিংহ ও অন্যান্য জায়গা থেকে হেঁটে ঢাকার দিকে ফিরছে অনেক শ্রমিক। এই করোনা-ঝুঁকির সময় হাজারো পোশাক শ্রমিকের কাজে যোগদানের এই মিছিল দেখে আতঙ্ক প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এতে করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ ঝুঁকির ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।

শ্রমিকনেতারাও চান, শিল্পের স্বার্থেই যেন এ শ্রমঘন খাতটি এখন বন্ধ রাখা হয়। না হলে করোনা ঝুঁকিতে পড়বে পুরো শিল্প।

বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখতে আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও এর আগে তিন বলেছিলেন, পোশাক কারখানা বন্ধ রাখার কোনো সরকারি নির্দেশনা নেই। বরং সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে পোশাক কারখানা চালু রাখা যেতে পারে বলা হয়েছে। নির্দেশনা অনুসরণ করে পোশাক কারখানা খুলবেন মালিকরা। আর যারা এখন কাজে যোগ দিতে পারবে না তাদের চাকরি হারানোর ভয় নেই।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে দেশে অঘোষিত লকডাউন চলছে। ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। ট্রেন-বাসসহ সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ থাকবে ১১ এপ্রিল পর‌্যন্ত। সব ধরনের প্রচারমাধ্যমে সরকার দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, যাতে সবাই নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বার না হয়।

বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্তের (৮ মার্চ) ঘোষণার ১৭ দিন পরে সংক্রমণ ঠেকাতে আগে-পরে সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ১০ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এই ছুটি শেষ হয় আজ। এর আগে গত মঙ্গলবার এ ছুটির মেয়াদ আগামী ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

সর্বশেষ আজ দুপুরে আইইডিসিআরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, দেশে পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত দুজন মারা গেছে। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১০ জন।

এমন পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক কারখানা খোলা রাখার ঘটনা ও সিদ্ধান্ত অবাক করেছে সবাইকে।

শ্রমিক নেতারা বলছেন, করোনাভাইরাস সতর্কতা নিয়ে তাদের সঙ্গে দ্বিমুখী আচরণ করা হচ্ছে। তাদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কেউ করোনা থেকে বাঁচতে ঘরে বসে সামাজিক দূরত্ব মানবে, আর কেউ গণপরিবহন বন্ধ থাকার পরও বাইরে বের হবে শ্রমঘন খাতে কাজ করার জন্য!

বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সাধারণ সম্পাদক জুলহাসনাইন বাবু ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা শ্রমিকের স্বাস্থঝুঁকির কথা বিবেচনা করে সব গার্মেন্ট বন্ধ রাখতে বলেছি। যে গার্মেন্ট খোলা ছিল সেগুলোও বন্ধ রাখতে বলেছি। কিন্তু এখন দেখছি এতদিন যারা বন্ধ রাখছিল তারাও খুলছে।’ শ্রমিকরা হতাশ ও ভীত হয়ে পড়ছে বলে জানান তিনি।

মানবিকতা ছাড়াও অর্থনীতির কৌশল হিসেবে শ্রমিকের সুরক্ষা দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করে জুলহাসনাইন বাবু বলেন, ‘শ্রমিকদের মধ্যে করোনা ছড়ালে আমরা কাউকে রক্ষা করতে পারব না। তাতে এ শিল্পেরই ক্ষতি হবে।’

মালিকরা পরস্পরবিরোধী আচরণ করছেন বলে মন্তব্য করেন এই শ্রমিক নেতা। তিনি বলেন, ‘তারা একদিকে বলছে তাদের অর্ডার ক্যানসেল হচ্ছে, তাহলে তারা গার্মেন্ট খোলা রাখছে কেন? আবার তারা কারখানা বন্ধ রাখার জন্য সরকারের কাছ থেকে শ্রমিকের তিন মাসের বেতনের টাকা নিচ্ছে। কিন্তু কারখানা বন্ধ রাখছে না।’

আজ যেভাবে শ্রমিকরা সারাদিন ধরে ঢাকায় ফিরছে সেটা সরকারি স্বাস্থ্যবিধি নির্দেশনা বিরুদ্ধে যাচ্ছে মনে করেন তিনি।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

গার্মেন্ট শ্রমিকের করোনা সংক্রান্ত স্বাস্থ্য বিষয়ে হেলথ এন্ড হোপ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এম এইচ চৌধুরী লেনিন ঢাকাটাইমসকে বলেন, গার্মেন্ট শ্রমিরা এখন যেভাবে চলাচল করছে এটি করোনা ঝুঁকি থেকে বাঁচতে সামাজিক দূরত্বের সঙ্গে যায় না। এটা একেবারে বিপরীত। এর মধ্যে গার্মেন্ট শ্রমিকের কোভিট-১৯ করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে। এটা মারাত্মক হয়ে দেখা দিতে পারে।’

ডা. এম এইচ চৌধুরী লেনিন বলেন, ‘প্রথম কথা হলো সম্ভব হলে অন্যান্য সেক্টরের সঙ্গে গার্মেন্টসকেও বন্ধ রাখা। সম্ভব না হলে শ্রমিকদের আনা-নেওয়ার জন্য একটি স্বাস্থ্যবিধি মেনে উদ্যোগ গ্রহণ করা। এভাবে মানুষকে মৃত্যুর ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া যায় না। একজন মানুষের করোনা আক্রান্ত মানে সে একা নয়, অজান্তেই অনেক মানুষের আক্রান্ত হওয়ার বিষয় ঝুঁকি থাকে থাকে।’

গর্মেন্টস যদি খোলা রাখতেই হয়, তাহলে আগে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করে নেওয়া উচিত বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রমিকরা যেন চার ফুট দূরে দূরে বসে কাজ করতে পারে সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। আর যাদের সর্দি-কাশি আছে তারা যেন কাজে যোগ না দেয়। তারা যেন বিশ্রামে থাকে।’

যারা গাদাগাদি করে ঢাকায় এসেছে তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে বলে মন্তব্য করেন ডা. নজরুল ইসলাম। বলেন, ‘সে জন্য তাদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখতে হবে। আলাদা আলাদা থাকতে হবে তাদের।’

পোশাক মালিকদের কথা

প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে দেশজুড়ে অবরুদ্ধ দশার মধ্যে তৈরি পোশাক কারখানা খোলা রাখা হবে কি না সেই সিদ্ধান্ত মালিকদের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছেন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা। তারা বলছেন, কারখানা খোলা রাখুক বা বন্ধ করে দিক, যা-ই করা হোক না কেন শ্রমিক ও কর্মচারীদের মার্চ মাসের বেতন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।

লাইন ধরে তৈরি পোশাককর্মীরা ঢাকায় আসছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক শনিবার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠানের কাজ আছে তারা অবশ্যই খুলবে। সরকারের পক্ষ থেকে ২৫ তারিখে গণপরিবহন বন্ধ করা হয়েছিল আর আমরা গার্মেন্টস বন্ধ করেছিলাম ২৬ তারিখে। তারা চলে গেছে সে দায়িত্ব তো আমরা নেব না। এখানে আমাদের করার কী আছে। ওনারা ফেরত আসছেন কেন। ওনাদেরকে তো কেউ বলে নাই চাকরি চলে যাবে। তারা কেন ফেরত আসছেন।’

আজ রাত সাড়ে আটটায় বিজিএমইএর সভাপতি ড. রুবানা হক হোয়াটসআপ বার্তায় গণমাধ্যমের কাছে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, ‘কয়েকটি জায়গায় স্পষ্ট করা প্রয়োজন আছে। সেটি হলো, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তর আমাদের যে সার্কুলার দিয়েছিল, সেখানে স্পষ্ট লেখা আছে- যেসব রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক ক্রয় আদেশ আছে এবং যারা পিপিই বানাচ্ছে, যাদের উৎপাদন কার্যক্রম চলমান আছে, সেসব কারখানার মালিকরা শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় স্থাস্থ্যনিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সাপেক্ষে শিল্প-কলকারখানা চালু রাখতে পারবে। কাজেই আমাদের বড় দায়িত্ব হলো শ্রমিকদের স্বাস্থ্য-নিরাপত্তাটি দেওয়া।

‘দ্বিতীয় জায়গাটি হলো সেখানেও আমরা স্পষ্ট, মার্চ মাসের বেতন নিয়ে কোনো রকম অনীহা-অনাগ্রহ কোনো কিছুর অবকাশ নেই। মার্চ মাসের বেতন আমাদের শ্রমিকরা পাবেনই। এটি আমাদের যত কষ্ট হোক, যা-ই হোক মার্চ মাসের বেতন আমাদের শ্রমিকদের দেব।

রুবানা হক আরও বলেন, ‘তিন নম্বর হলো- আমি মনে করি শ্রমিকরা সংগত কারণে যদি কারখানায় উপস্থিত না থাকেন তাহলে মানবিক বিবেচনায় তার চাকরিটি হারাবেন না।’

শ্রমিকরা যেন চাকরি না হারায় এ ব্যাপারে ড. রুবানা হক সদস্য কারখানার মালিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এটুকু আমি আমাদের প্রত্যেক সদস্যের কাছে অনুরোধ করবো। এবং আমি আশা করি, বিশ্বাস করি এই শিল্পখাত যারা অর্থনীতিতে এত অবদান রাখে সেই মালিকেরা আমার অনুরোধটুকু রাখবেন। এ শ্রমিকের অনুপস্থিতির কারণে তারা যেন কিছুতেই চাকরি না হারান।’

তবে রাত পৌনে ১০টার দিকে বিজিএমইএ সভাপতি আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত গার্মেন্টস বন্ধ রাখতে মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

বিকেএমইএর বক্তব্য

এদিকে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সদস্যভুক্ত কারখানা মালিকদের উদ্দেশে সংগঠনের সভাপতি সেলিম ওসমানিএক নির্দেশনায় বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই শ্রমিক অসন্তোষ যাতে সৃষ্টি না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। যদি কারখানা বন্ধ রাখতে চান তবে ছুটিকালীন আপনার কারখানার শ্রমিকরা যে যেখানে অবস্থান করছে সে যেন সেখানেই অবস্থান করে, তা পুনরায় নিশ্চিত করতে হবে।’

আর কোনো মালিক তার কারখানা বন্ধ করার কথা ভাবলে তা যে শ্রম আইন অনুযায়ী করা হয় এবং অবশ্যই বিকেএমইএর অনুমতি নিতে হবে বলে জানান বিকেএমইএ সভাপতি।

বিকেএমইএর আগের নির্দেশনামতো ৪ এপ্রিল পর‌্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখায় মালিকদের ধন্যবাদ জানান সেলিম ওসমান।

সরকার সাধারণ ছুটি ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়িয়েছে, এই পরিপ্রেক্ষিতে কারখানা মালিকদের উদ্দেশে বিকেএমইএ সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান বলেন, ‘৪ এপ্রিলের পর কারখানা চালু রাখবেন কি না বন্ধ রাখবেন, এটি আপনার সিদ্ধান্ত। যদি কেউ কারখানা চালু রাখেন তাহলে করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে আপনার শ্রমিকদের রক্ষা করবেন। স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিধি মেনে কারখানা পরিচালনা করবেন।’

কলকারখানা প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের নির্দেশনা

এদিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তর মার্চের এক তারিখ জানিয়েছে, যেসব রপ্তানি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ বহাল রয়েছে এবং করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে জরুরি অপরিহার‌্য পণ্য যেমন –পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই), মাস্ক ইত্যাদি উৎপাদন কার‌্যক্রম চলমান রয়েছে, সেসব কারখানা বন্ধের বিষয়ে সরকার কোনো নির্দেশনা দেয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং আইইডিসিআর কর্তৃপক্ষ জারিকৃত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নির্দেশিকা কঠোরভাবে প্রতিপালন সাপেক্ষে মালিকগণ প্রয়োজনবোধে তাদের কারখানা চালু রাখতে পারবে। তবে কারখানা প্রবেশের আগে থার্মাল স্ক্যানার ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিকের দেহের তাপমাত্রা বাধ্যতামূলকভাবে পরীক্ষা করতে হবে। কোন শ্রমিকের করোনা ভাইরাসের ন্যূনতম উপসর্গ দেয়া দিলে তার চিকিৎসা প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা মালিকের করতে হবে।’

(ঢাকাটাইমস/০৪এপ্রিল/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :