“মাকড়োসা”

এম এম মাহবুব হাসান
| আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২০, ২০:৫৬ | প্রকাশিত : ২৫ এপ্রিল ২০২০, ১৭:৪০

মাত্র দুই বছরের একটি লক্ষী মেয়ে, বাবাকে যে কলিজার মধ্যে ভরে রেখে দিতে চায়, আম্মুকে যে ভীষণ রকমের ভালবাসে। ছোট্ট ছোট্ট দুটো বড় ভাইয়ের সামান্য কষ্টও যে সহ্য করতে পারে না। বাসার সবকিছুর প্রতি যার মারাত্মক খেয়াল। একা একা ময়না পাখির মতো কি সুন্দর করে বাবা, আম্মু, দাদা, নানু, কাকা, মামা ডেকে ডেকে বাসা মাতিয়ে রাখে! তার কন্ঠে আজ একটি ছোট্ট কিন্তু খুবই প্রাকটিক্যাল শব্দ কি করে বাসা বাঁধলো বুঝে উঠতে পারলাম না। পরক্ষণে মোবাইলের অ্যালবাম ঘেটে কয়েকদিন আগের এই ছবিটি খুঁজে পেলাম। এই নিষ্পাপ আদুরে চোখে গড়গড় করে জলরাশি নেমে আসার প্রেক্ষাপটই তাহলে এমন শব্দ রপ্ত করতে বাধ্য করেছে!

আজ অফিস থেকে বেশ দেরীতে বাসায় ফিরে দেখলাম আমার ত্রি-রত্ন, ছয় বছর ও চার বছরের দুটো ছেলে মাহিব, মাহির আর আভা নামের দুই বছরের এই লক্ষ্মী মেয়েটি খেলা করছে। কলিজার টুকরো বাবাকে পেয়ে মেয়েটি লাফিয়ে এসে আমার মুখে, কপালে, গলায় এক নাগাড়ে কয়েক ডজন পাপা দিয়ে নেমে গিয়ে খাটে একটি ডিগবাজি দিলো। আমার স্যুটটি আলমারিতে তুলতে তুলতে বৌ বলতে লাগলো - দেখছো তুমার মেয়ে কেমন দুষ্টু হচ্ছে, ডিগবাজি দেওয়া শিখে ফেলেছে। আমি ফ্রেশ হবো কিন্তু বৌয়ের কথার হাল্কা জবাব না দিয়ে পারলাম না। থাক না, বাদ দাওতো ওসব- পুরো পৃথিবীই এখন দুষ্টু হয়ে যাচ্ছে আর ওরা একটু দুষ্টু হলে সমস্যা কি? দুষ্টু পৃথিবী, দুষ্টু রাষ্ট্র, দুষ্টু সমাজ, দুষ্টু মাঠ-ঘাট আর মানুষ দুষ্টু হবে না, এটা ভাবলে কি করে? থাক হুজুর এখন আর লেকচার দিতে হবে না, নামাজ পড়ে খেতে চলো- মানে খাদ্যমন্ত্রীর অর্ডার!

হঠাৎ ছেলে দুটোকে দেখলাম আমার মেয়েটাকে খেলার ছলে ভীষণ ভয় দেখাচ্ছে। মেয়েটাও মজা করছে। এক্কেবারে টুনটুনি পাখির মতো এখান থেকে লাফিয়ে ওখানে যাচ্ছে। পুরো বাসায় আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। মেয়েটি খিল খিল করে হাসছে। ওর হাসি দেখে অবাক হলাম। এই সেদিন যার জন্ম হলো, চোখ মেলতে ভয় পেতো আর আজ সে দাঁত বের করে খিলখিল করে হাসছে। আজবতো! আমার ছেলে-মেয়ে তিনটেই অধিক হাসি কান্নায় মাঝে মাঝে বমি করে। তাই থামানোর জন্য একটা কিছু বলবো এমন সময় বৌ বললো- থাক, তুমার কিছু বলার দরকার নেই, ওরা এমনিতেই থেমে যাবে, তুমি না করলে ওরা আরো বেশি লাফালাফি করতে পারে। ও আচ্ছা.. তারমানে... বলে ওয়াশ রুমে ঢুকলাম (তার মানে কি? বৌ জানতে চেয়েছিলো কিন্তু উত্তর এড়িয়ে গেলাম)।

কি রে বাবা, এটা আবার কি? বেসিনের উপরের আয়না জুড়ে এক মাকড়োসা পুরো অষ্ট পা মেলে দাড়িয়ে না বলে বসেই রয়েছে বলা যায়। এতোবড় একটা জলজ্যান্ত মানুষ, ইচ্ছে করলে এক টোকায় ওর অস্তিত্ব বিলীন করে দিতে পারি, তবুও তার একটি পা ও কাঁপছে না। আমার বাড়ীওয়ালা আবার ভালো রাজনীতিবিদ, জানি না তার কোনো প্রভাবে এমন গোমরা ধরে আছে কি না। প্রাণীকূলের মধ্যে বিড়াল ও পতঙ্গকূলের মধ্যে মাকড়োসা আমার খুবই প্রিয়। স্কুলে ও কলেজে পড়া অবস্থায় আমি বিড়ালের সাথে ঘুমাতাম। নিজ হাতে খাওয়াতাম, গোসল করাতাম।

শীতের দিনে কম্বল না হলেও একটি ভাল বিড়াল হলেই হয়, তবে বিড়াল আবার কাথা-কম্বল ওয়ালা সঙ্গী ছাড়া ঘুমাতে চায় না, ওরা বড্ড শীতকাতর, আর ঘুমের মধ্যে নাক ডাকে, নাকটা কম্বলের নিচেও বরফের ঠান্ডা থাকে। মাকড়োসার কথা কি বলবো, সত্যি বলতে মাকড়োসাদেরকে আমি ছোটবেলা থেকে অনেক সম্মানও করি, অন্তত আমার দ্বারা ছেলেবেলায় অসংখ্য মশা, মাছি, জেঠি, ইঁদুর, সাপ, কয়েকটি দুষ্টুবিড়ালসহ কিছু পাখির মৃত্যু আর বড় বেলায় হাতেগোনা কয়েকটি ডেঙ্গু মশা আর অসংখ্য তেলাপোকার জীবননাশ হলেও জানা বা অজানা অবস্থায় কোনোবেলায় কোনো মাকড়োসার মৃত্যু যে হয়নি- এটা আমি হলোপ করে বলতে পারি।

ছোট বেলায় যখন আরবী পড়া শিখতে মক্তবে যেতাম তখনকার দিনে সাতাশে রমজানে তারাবীর নামাজের পর আমার শ্রদ্ধেয় মাওলানা সাহেব মামা’র মুখে শোনা - আমাদের প্রিয় মহানবী (সা:) যখন ভয়ঙ্কর কাফের আবু জেহেলের যন্ত্রনায় তাঁর প্রিয় সাহাবী হযরত আবুবক্কর (রা:) কে সঙ্গে নিয়ে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পথে এক পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে ছিলেন তখন মাকড়োসারা সেই গুহার মুখে বাসা বেঁধেছিলো এবং দুষ্টু আবুজেহেলের লোকেরা সেই গুহার মুখের কাছে গিয়ে যখন দেখলো যে ওটা মাকড়সার জালে ছেয়ে গেছে তখন ওরা ভাবলো যে এটা অনেক পুরনো ও পরিত্যক্ত গুহা যেখানে কোন মানুষের থাকার অবকাশ নেই, তাই কাফেরের দল সেখান থেকে ফিরে এলো এবং কাফেরদের আক্রমণ থেকে আমাদের প্রিয় মহানবী (সা:) ও তার প্রিয় সাহাবী রক্ষা পেলেন। মাওলানা মামার মুখে প্রিয় নবীজীর প্রতি ক্ষুদ্র পোকা মাকড়োসাদের এমন দরদের গল্প শুনে আমার মনে এতোটাই নাড়া দিয়েছিলো যে তখন থেকে মাকড়োসাকে দেখলে না মেরে সম্মানেরসহিত তাড়িয়ে দেই। তবে পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় মাকড়সাদের অনেক কষ্ট করে তৈরী বাসাগুলো ভেঙ্গে ফেলতে হয়, কিছুই করার থাকে না।

আমার কেনো যেনো মনে হয়- মাকড়োসারা মানুষকে ভীষণ ভালবাসে, পারলে ওরা সব মানুষকে ওদের ঠুনকো জাল দিয়ে আগলে রাখতে চায়। কয়েক বছর আগে মিয়ানমারের মাকড়সারা হয়তো শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অশান্তির রানী সূ চী কে ভীষণ অভিশাপ দিয়েছে। কারণ ওদের দস্যু জেনারেল ও তার জুলুমবাজ বাহিনী রাখাইন রাজ্যের মানুষকে ছাতু বানিয়ে ফেলেছে আর মাকড়োসার ভালোবাসার ঠুনকো জালতো বুটের আওয়াজেই হাওয়ায় মিলে গেছে। জানি না ভারতের মানবপ্রেমিক মাকড়োসাদের কি অবস্থা। বিশ্ব মোড়ল ট্রাম্পের মুখে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নাম ভুলভাল উচ্চারণ হলেও মাকড়োসাদের কোন অবদানই কেউ স্বীকার করলো না। অথচ ট্রাম্প ও ওদের মিত্ররা মাকড়োসাদের বুনিয়ে দেওয়া জাল থেকে অনেক শিক্ষা নিয়েছে, ওরা দেখেছে কিভাবে এক ক্ষমতাকে মাকড়োসার জালের মতো ছিন্ন করে আরেক ক্ষমতার শক্ত জাল কিভাবে বিস্তার করা যায়। একদিকে চায়নার করোনা ভাইরাসে বিশ্ব মানব সভ্যতার টিকে থাকাকে চ্যালেন্জ ছুঁড়ে দিয়েছে আরেক দিকে ভারত-আমেরিকার বন্ধুত্বের অমরত্ব ঘোষিত হচ্ছে, খুব কাছেই হয়তো লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নাগরিক নিজেদের অস্তিত্বের সংকটে রাস্তায় নেমে হা হুতাশ করছে। তাতে কার কি? লং লিভ ফ্রেন্ডশীপ। যাইহোক কালো মাকড়োসাটিকে অতীব যত্নের সহিত নতুন মেয়রদের প্রস্তাবিত স্বপ্নের ঢাকার শহরের বর্তমান পরিবেশ দেখার জন্য বাইরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলাম।

ফ্রেশ হয়ে প্রতিদিনের মতো একবারে এশার নামাজের জন্য অযু করে বের হলাম। মেয়েটি তখন খাটের ওপর লাফাচ্ছে। হাসছে আর জোরে জোরে বাবা.. বাবা.. বলে ডাকছে। কারণ ওর দুই ভাই খাটের পাশে দাড়িয়ে দাঁত কিড়িমিড়ি করে ভুত সেজে ভয় দেখাচ্ছে। কাছে এসে শুনলাম বাবা... বাঁচাও(আস্তে), বাবা... বাঁচাও (আস্তে) ! বৌকে বললাম এটা আবার কখন শিখলো। বৌয়ের টু দ্যা পয়েন্টে উত্তর, শিখবে না তো কি করবে, সারাদিন ওরা দুইজন আমার মেয়েটাকে একটু শান্তিতে থাকতে দেয় না। তাই নিরুপায় হয়ে বাঁচাও বাঁচাও শিখছে!

দুই বছরের মেয়ের কন্ঠে আনন্দের ছলে বলা বাবা বাঁচাও.. বাবা বাঁচাও কথাগুলো কৌতুহলবশত অনেক ভালো লাগলো বটে। ওর এই আনন্দ আকুতি আমাকে অনেক পেছনে নিয়ে গেলো। শেষমেশ ওর মুখ থেকেও এমন নিতান্ত সত্য দাবী বেরিয়ে এলো, যেখানে পৃথিবী জুড়েই এখন বাঁচার আকুতির তুফান বইছে! আহ তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারী চালে নিহত পাঁচ থেকে সাড়ে আটকোটি মানুষের মধ্যে যারা দুই বছরের শিশু ছিলো তারা নিশ্চয় বাবা বাঁচাও..বাবা বাঁচাও..শব্দটি শিখে ফেলেছিলো, আফগানিস্তানে পেন্টাগনের হামলায় নিহত দুই বছরের শিশুরা, রাখাইনে আর্মির বুটের তলায় পিষ্ট শিশুরা? ইরাক, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে নিহত দুই বছরের শিশুরাও নিশ্চয়? ৭১ এর পাক হায়েনাদের কবলে পড়া নিষ্পাপ শিশুগুলোও নিশ্চয় বাবা বাঁচাও..বাবা বাঁচাও বলে ডেকে ধপাস করে নিষ্প্রাণ হয়ে গিয়েছিলো?

লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :