নিদান কালের বন্ধু ওরা...

বোরহান উদ্দিন, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১৯ এপ্রিল ২০২১, ২২:১৯

কখনো করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছেন। কখনো আবার শ্বাসকষ্টে থাকা রোগীকে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করছেন। করোনায় কেউ মারা গেলে স্বজনরা যখন কাছেও আসছে না তখন এগিয়ে যাচ্ছেন। পরম যত্নে মরদেহ হাসপাতাল থেকে নিয়ে গোসল, জানাজা শেষে দাফনের ব্যবস্থা করছেন তারা। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে আলোচিত কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের ‘টিম খোরশেদ’ এর সদস্যরা এভাবেই কাজ করছেন গত বছর দেশে করোনার সংক্রমণ শুরুর পর থেকে।

নারায়ণগঞ্জের নানা শ্রেণি-পেশার কিছু উদ্যমী মানুষকে নিয়ে গঠিত এই টিমের সদস্যরা এখন হয়ে উঠেছেন নিদান কালের পরম বন্ধু। কেউ কেউ আবার তাদেরকে ‘ওরা লাশের স্বজন’ এই নামেও ডাকেন।

গত বছরের মতো এবারও করোনাভাইরাসের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত নারায়ণগঞ্জ। দিনে দিনে এখানে মৃত্যুর মিছিল যত বাড়ছে টিম খোরশদের কাজও তত বাড়ছে। রমজানের রোজা রেখেই দিন কিংবা গভীর রাতেও চলে ওদের দাফন কার্যক্রম। কিছুদিন ধরে যেন এই টিমকে কবরস্থানেই থাকতে হচ্ছে!

জানা গেছে, করোনায় স্বেচ্ছায় মৃত মানুষকে দাফন-কাফন করতে গিয়ে পরিবারসহ করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন কাউন্সিলর খোরশেদ। সৎকারও করতে হয়েছে অনেক মরদেহ। এক পর্যায়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও ছিলেন তিনি এবং তার স্ত্রী। তবুও অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াননি। সুস্থ হয়ে আবারো টিমের সদস্যদের নিয়ে নেমে পড়েছেন দুনিয়ার মায়া ছেড়ে পরপারে জমানো মানুষদের সমাহিত করার কাজে। এই জনপ্রতিনিধি ঘোষণা দিয়েছেন, আমৃত্যু এই কাজ করে যাবেন।

তথ্যমতে, গতকাল রবিবার পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ১৮৮টি মরদেহ দাফন করেছে টিম খোরশেদ। সবশেষ নারায়ণগঞ্জের দেওভোগের আবুল হোসেনের মরদেহ মাসদাইর কবরস্থানে দাফন করেন স্বেচ্ছাসেবকরা।

গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে অদ্যাবদি করোনার সংক্রমণের পাশাপাশি মৃত্যু বেড়েছে দেশে। এতে নারায়ণগঞ্জেও মৃত্যু বাড়ছে। গত ১৫ দিনে নারায়ণগঞ্জে গড়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় চারজনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে টিম খোরশেদের সদস্যরাই প্রতিদিন দাফন করছেন তিন থেকে চারটি মরদেহ। শুধু কবরস্থই নয়, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের লাশ সৎকারও করছেন তারা।

টিম খোরশেদের অন্যতম সমন্বয়ক আলী সাবাব টিপু ঢাকা টাইমসকে জানান, প্রথম রমজানের সারাদিনে মোট চারটি করোনায় মারা যাওয়া মরদেহ দাফন করা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে তিনটি করে করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির মরদেহ দাফন করা হচ্ছে।

টিপু বলেন, স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করতে গিয়ে টিমের চার সদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে ও কাউন্সিলর খোরশেদের বাড়িতে আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। টিমের সদস্যরা করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় দাফন কার্যক্রমে শেষপর্যন্ত কাউন্সিলরের ১৭ বছর বয়সী ছেলে নকিব খন্দকারও যোগ দিয়েছে।

এদিকে দাফনের পাশাপাশি টিমের পক্ষ থেকে বেশি অসুস্থদের ফ্রি অক্সিজেন সাপোর্ট কার্যক্রমও চালু করা হয়েছে। এ পর্যন্ত তিন শতাধিক রোগীকে ফ্রি অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এর বাইরেও নিয়মিত প্লাজমা ডোনেশন, আক্রান্তদের টেলি-মেডিসিন সেবা প্রদান এবং আক্রান্তদের বাসায় ওষুধ পৌঁছে দেয়ার কাজটাও করেন টিমের সদস্যরা।

গত বুধবারে নিজের ওয়ার্ডের এক দম্পতির একই দিনে মৃত্যুর কথা তুলে ধরে কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘গত বুধবার আমার ওয়ার্ডের রফিকুল ইসলাম খান শমরিতা হাসপাতালে করোনায় মারা যান। রাতে তার লাশ দাফন করে বিশ্রাম নেয়ার আগেই শুনি পরদিন ভোরে তার স্ত্রী সাগরিকাও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। দুপুরে তার লাশটিও দাফন করা হয়।’

খোরশেদ বলেন, ‘কষ্টের বিষয় এই দম্পতির দুই সন্তান থাকেন বিদেশে আর এক সন্তানের পরিবারের সদস্যরা করোনায় আক্রান্ত। কতটা মর্মান্তিক ভাবা যায় না।’

আলোচিত এই কাউন্সিলর বলেন, ‘মহামারি করোনায় যারা মারা যাচ্ছেন, তারা কী পরিমাণ কষ্ট ভোগ করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছেন; তা দেখে আমরা নিজেরাই শিউরে উঠলেও হাজারো মানুষ এখনো করোনাকে সামান্য ভাইরাস হিসেবে নিচ্ছেন। অনেক পরিবারের সদস্যরা আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে রেখে আর কোনো খবরই নিচ্ছেন না। এমন ব্যক্তিদের পাশে আমাদের সদস্যরা রয়েছেন।’

করোনার ভয়াবহতা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘যখন দেখি বিধিনিষেধে এখনো মানুষ বের হয় তখন কষ্ট লাগে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হবে।’

(ঢাকাটাইমস/১৯এপ্রিল/বিইউ/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :