এবার লোকসানি সিভিওর শেয়ারদরে কারসাজি!

রহমান আজিজ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:৫৪ | প্রকাশিত : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:৪৪

জ্বালানি পণ্য পরিশোধনে মান রাখতে না পারায় সরকারের সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি লিমিটেডের। পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত এ কোম্পানির সব সূচকও নিম্নমুখী। লোকসানে থাকা কোম্পানিটি গত ৩০ বছরে মাত্র ১০ বার লভ্যাংশ দিয়েছে। কয়েক বছর লভ্যাংশ দেয় নামমাত্র ২ শতাংশ।

চলতি বছরের ২২ জুন সিভিও পেট্রোকেমিক্যালের শেয়ারদর ছিল ৮৩.২ টাকা। গত ২১ সেপ্টেম্বর তাদের শেয়ারদর বেড়ে দাঁড়ায় ২৬২.১ টাকা। অর্থাৎ গত তিন মাসে শেয়ারটির দর বেড়েছে ১৭৮.৯ টাকা বা ২১৫ শতাংশ। গত ৯ মাসে তাদের শেয়ার প্রতি লোকসান ১.৯৭ টাকা।

এরপরও গত আড়াই মাসে তাদের শেয়ারদর বেড়েছে ১৭১ শতাংশ। কর্তৃপক্ষের কাছে লোকসানি কোম্পানিটির শেয়ারদর বাড়ার কোনও তথ্য না থাকলেও লাফিয়ে লাফিয়ে তা বাড়ছে। যে কারণে তাদের শেয়ার নিয়ে কারসাজি হচ্ছে বলে আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২২ জুন সিভিও পেট্রোকেমিক্যালের শেয়ারদর ছিল ৮৩.২ টাকা। গত ২১ সেপ্টেম্বর শেয়ারটির দর বেড়ে দাঁড়ায় ২৬২.১ টাকা। অর্থাৎ গত তিন মাসে শেয়ারটির দর বেড়েছে ১৭৮.৯ টাকা বা ২১৫ শতাংশ।

এদিকে কোনো কারণ এছাড়া এভাবে দর বৃদ্ধি সাধারণ বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্ট সবার মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নজর এড়ায়নি ডিএসই কর্তৃপক্ষেরও। ফলে তারা শেয়ারদর বৃদ্ধির কোনো সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে কি-না তা জানতে চেয়ে কোম্পানির কাছে নোটিশ দিয়েছে। জবাবে সিভিও বলেছে তাদের কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধির কোনো সংবেদনশীল তথ্য নেই।

প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছর ধরে সিভিওর শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০১৬ অর্থবছরে এনএভি ছিল ২০.৫০ টাকা; ২০১৭ সালে কমে দাঁড়ায় ১৪.৫৭ টাকা; ২০১৮ অর্থবছরে ১৪.৫৮ টাকা; ২০১৯ অর্থবছরে ১৪.৫৭ টাকা এবং ২০২০ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির এনএভি দাঁড়িয়েছে ১৩.৯০ টাকা।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সিভিওর শেয়ার প্রতি লোকসান বাড়ছে। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির ইপিএস ছিল ৭.৪০ টাকা; ২০১৭ অর্থবছরে শেয়ার প্রতি লোকসান ৩.৪২ টাকা; ২০১৮ অর্থবছরে ইপিএস ০.২৬ টাকা ও ২০১৯ ০ অর্থবছরে ০.১২ টাকা হয়। তবে ২০২০ অর্থবছরে শেয়ার প্রতি লোকসান হয়েছে ঋণাত্মক ০.৫১ টাকা। গত নয় মাসে (জুলাই২০-মার্চ২১) শেয়ার প্রতি লোকসান হয়েছে ১.৯৭ টাকা।

এদিকে সিভিওর লোকসানও বাড়ছে। ২০১৬ সালে নিট মুনাফা ছিল ১৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা। ২০১৭ সালে উল্টো লোকসান হয় ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা; ২০১৮ সালে মুনাফা হয় সাড়ে ৬৫ লাখ টাকা; ২০১৯ সালে মুনাফা আরও কমে দাঁড়ায় ৩১ লাখ ৪০ হাজার এবং ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিট লোকসান হয় ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

জানা গেছে, বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর মধ্যে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত একমাত্র কোম্পানি সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি লিমিটেড। তবে মানহীন জ্বালানি পণ্য পরিশোধনের অভিযোগে সরকারি সিদ্ধান্তে বন্ধ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম। এর আগে কোভিডের প্রভাবে বিক্রি শূন্যে নামে। এতে কোম্পানির লোকসান আরও বাড়ে।

বেসরকারি ১৪টি ও সরকারি সাতটি কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট থেকে সরবরাহকৃত কনডেনসেটের বিপরীতে অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিন নিত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। দেশের চাহিদার সব পেট্রোল সংগ্রহ করা হতো এই ২১ প্লান্ট থেকেই। প্রথম থেকে ৮০ মানের পেট্রোল সরবরাহ করে এলেও ২০১২ সালের ৯ এপ্রিল বিএসটিআই পেট্রোলের আরওএন (রিসার্চ অকটেন নাম্বার) ৮৭ নির্ধারণ করে। তবে শুরু থেকে আরওএন ৮০-এর ওপরে নিতে পারেনি প্লান্টগুলো।

কিন্তু গত বছর ১৭ ফেব্রয়ারি পেট্রোলের মান ৮৯ নির্ধারণ করে বিএসটিআই। এর আগে কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্টগুলো থেকে বিএসটিআইয়ের মান অনুযায়ী জ্বালানি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

পরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় পেট্রোল উৎপাদনকারী ১২ প্লান্টকে কনডেনসেট বরাদ্দ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সে আলোকে গত ১ জুলাই থেকে সেই ১২ প্লান্টকে কনডেনসেট বরাদ্দ বন্ধ করে দেয় বিপিসি। সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি লিমিটেডের কোম্পানি সচিব খাজা মঈন উদ্দিন হোসাইন জানান, শেয়ারদর বৃদ্ধি পেতে পারে এমন কোনো সংবেদনশীল তথ্য তাদের কাছে নেই। এ বিষয়ে ডিএসই কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে জানতে চেয়েছিল, তারা কোনো সংবেদনশীল তথ্য না থাকার কথা বলেছেন।

তবে কোম্পানির অন্য একটি সূত্র জানায়, শিগগির কোম্পানিটি আবার উৎপাদনে ফিরতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বন্ধ থাকা প্লান্টগুলোকে চালু করার অনুমতি দেবে। সে কারণে হয়ত শেয়ারদর বাড়তে পারে।

এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছর সাময়িকভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে কনডেনসেট সরবরাহ বন্ধ রাখে। নানা দেনদরবার করে পরে চালু করলেও মূলত তখন থেকে কোম্পানিটি অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ লাখ মেট্রিক টন হলেও উৎপাদন করতে পারে ১০ থেকে ১২ হাজার মেট্রিক টন। প্রতিষ্ঠানটি চাহিদা অনুসারে কনডেনসেট না পাওয়ায় লাভবান হতে পারছে না। ২০২০-২১ অর্থবছরের ব্যবসা পরিচালনা করে লোকসান হয়েছে এক কোটি ২৮ লাখ টাকা, আগের অর্থবছরের নিট মুনাফা ছিল ৩১ লাখ টাকা।

উল্লেখ্য, ১৯৮৪ সালে তৎকালীন চিটাগং ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রির নামে একটি ভেজিটেবল অয়েল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন মাওলানা মোহাম্মদ ইউনুস। (পরে নাম পরিবর্তন হয়) খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি হিসেবে ১৯৯০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠানটি ভেজিটেবল অয়েল থেকে পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে ব্যবসায়িক ধরন পরিবর্তনের কারণে খাত পরিবর্তন করে ২০১৪ সালের এপ্রিলে।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত মূলধন ১৫০ কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ২৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা। আর মোট শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তাদের ৪৫.৩১ শতাংশ। এছাড়া সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩১.১০, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২৩.৩৯ শতাংশ এবং বিদেশিদের কাছে রয়েছে ০.২০ শতাংশ শেয়ার।

(ঢাকাটাইমস/২৭সেপ্টেম্বর/আরএ/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :