ফেনী পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য

এম শরীফ ভূঞা, ফেনী
 | প্রকাশিত : ২২ মে ২০২২, ২২:৪৫

ফেনী পাসপোর্ট অফিস কেন্দ্র করে শুধু দালালদের মাধ্যমেই বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার ঘুষবাণিজ্য হয়। অফিসে বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্টদের লোক রয়েছে। গ্রাহকের পাসপোর্ট সংক্রান্ত সমস্যা শুনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে তারা ফোন দেন। সবুজ সংকেত পাওয়ার পর তারা কাজ শুরু করেন।

পাসপোর্টসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নেন দালালরা। সিরিয়াল ছাড়া আবেদন জমা করতে ৫ থেকে ১৫ হাজার, পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়া পাসপোর্ট পেতে ১৫ থেকে ২০ হাজার, নামের বানান সংশোধনে সর্বনিম্ন ২৫-৩০ হাজার এবং জন্ম তারিখ সংশোধন ও নাম পরিবর্তন বা ভুয়া নাম-ঠিকানায় জাল পাসপোর্ট তৈরি, আঙুলের ছাপ জালিয়াতি (মিস ফিঙ্গারিং) ইত্যাদি কাজ বাবদ ৩০ হাজার থেকে এক লাখ পর্যন্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

শহরের একাধিক ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে কথা বলে এ পাসপোর্ট অফিসে দালালদের সহযোগিতার কথা জানা গেছে। অনলাইনে পূরণ করা পাসপোর্টের ফরমের ওপর ওইসব এজেন্টের সিল ও বিশেষ সংকেত দেওয়া হয়। এসব সংকেতে পাসপোর্ট অফিসের লোকজন বুঝতে পারেন এটি তাদের তালিকার সিল। প্রতিদিন বিকালে আনসার সদস্য করিম তালিকা ধরে প্রতি জমা আবেদনের জন্য এক হাজার ২০০ টাকা করে নিয়ে যান। সেই টাকা বুঝিয়ে দেন অফিসের সহকারী হিসাবরক্ষক আবুল নেসুর, অফিস সহকারী মাফতুল হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি কন্ট্রোলার অপারেটর সাইফুল লতিফকে। তাদের মাধ্যমে অফিসের কর্মকর্তাদের পদ অনুসারে টাকার হিস্যা অনুপাতে বণ্টন করা হয়।

গত মাসে পাসপোর্ট অফিসে হয়রানির শিকার হয়ে কয়েকজন গ্রাহক ফেনী পৌর মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজির কাছে অভিযোগ করেন। তিনি তাৎক্ষণিক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে অভিযোগের সত্যতা পান। এ সময় ফেনীর শত শত গ্রাহক মেয়রকে তাদের হয়রানির কথা জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমানে এখানে সিন্ডিকেট নেটওয়ার্কটির দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী হিসাবরক্ষক আবুল নেসুর, অফিস সহকারী মাফতুল হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি কন্ট্রোলার অপারেটর সাইফুল লতিফ। মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এ চক্রটি ঘুষবাণিজ্য চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সাইনবোর্ড দেখে বাইরে থেকে মনে হবে ট্রাভেল এজেন্ট, স্টুডিও, কম্পিউটার বা ফটোকপির দোকান-কিন্তু ভেতরে ‘ব্যবসা’ ভিন্ন। এভাবেই সাইনবোর্ডের আড়ালে চলছে পাসপোর্ট নিয়ে জাল-জালিয়াতির রমরমা কারবার। ভুয়া সিল-প্যাড ব্যবহার করে তৈরি হয় যাবতীয় নকল কাগজপত্র। টাকার বিনিময়ে সহজেই মেলে পাসপোর্ট। শহরের ৫০টি ট্রাভেল এজেন্ট ও খোদ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনের দোকানঘর ঘিরেই তৎপর পাসপোর্ট দালাল চক্রের সদস্যরা। সরেজমিন ৬ মাসের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে দুর্নীতির এসব তথ্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেনীর প্রায় ৫০ জন চিহ্নিত দালাল নিজেদের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের রেজিস্ট্রার্ড এজেন্ট বলে পরিচয় দেন। বেশির ভাগ পাসপোর্ট প্রত্যাশী ই-পাসপোর্টের ফরম পূরণ করতে গিয়ে এদের ফাঁদে পড়ছেন। দ্রুততম সময়ে পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়ার কথা বলেন তারা। চুক্তি না হলে বিড়ম্বনার শিকার হবেন বলেও জানান।

অফিস সহকারী মাফতুল বলেন, এ নিয়ে আমার কোনো কথা নেই। যা বলার তা পরিচালক বলবেন। আনসার সদস্য করিম বলেন, আমি এখন এ অফিসে নেই। যখন ছিলাম তখন মাঝে মাঝে স্যারদের কিছু কাজ করেছি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী হিসাবরক্ষক নেসুর বলেন, আমি ফেনী অফিস থেকে বদলি হয়ে যাচ্ছি। তাই এ নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না।

ফেনী পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক সাধন সাহা এ অফিসের ঘুষ বাণিজ্যের কথা অস্বীকার করলেও দালালদের দৌরাত্ম্যের কথা স্বীকার করে বলেন, আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি। দালাল নির্মূলে অফিসের পক্ষ থেকে সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য জেলা পুলিশের সহায়তায় মাঝেমধ্যেই ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো হয়। আশা করছি, ধীরে ধীরে সমাধানে যেতে পারব। এ অফিসে প্রতিদিন গড়ে ২০০ পাসপোর্টের আবেদন জমা পড়ে বলে জানান তিনি।

(ঢাকাটাইমস/২২মে/এলএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

বাংলাদেশ এর সর্বশেষ

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :