পদ্মার পাড়ে দুর্ভোগের অবসান

মোয়াজ্জেম হোসেন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৫ জুন ২০২২, ২৩:১৪ | প্রকাশিত : ২৫ জুন ২০২২, ২৩:১২

ঢাকা থেকে যশোরের দুরত্ব ২০০ কিলোমিটারের মত। সচরাচর যশোরের বাসগুলো ঢাকা থেকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাট হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে সময় লাগে সাত-আট ঘণ্টা। আর ঘাটে যদি কোনো কারণে গাড়ির চাপ থাকে সেক্ষেত্রে ফেরি পার হতে আরও বেশি সময় লাগে। উৎসব-পার্বণে যখন ঘরমুখো মানুষের চাপ থাকে তখন অনেক ধকল পোহাতে হয় দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের মানুষদের।

যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই তিক্ত অভিজ্ঞতার অবসান হলো এবার। দুয়ার খুলল উত্তাল পদ্মার বুক ছিড়ে তৈরি করা স্বপ্নের সেতুর। শনিবার সকালে বাংলাদেশের গর্বের প্রতীক এই সেতুর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রবিবার সর্বসাধারনের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে দেশের যোগাযোগ খাতের এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় এই অবকাঠামো।

এখন আর পদ্মা পাড়ের জন্য ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হবে না। সেতুর উপর দিয়ে দ্রুত গতিতে চলবে গাড়ি। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আড়াইশ কিলোমিটারের মত রাস্তা যেতে যানজট না থাকলে সময় লাগে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, যশোরের মতো জায়গায় যেতে এখন সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।

এছাড়া দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে যাতায়াতে এখন সুবিধাভোগ করবে। আর সারাদেশের সঙ্গে এখন নিরবচ্ছিন্ন একটা যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হলো। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মোট জিডিপিতে অবদান রাখবে পদ্মা সেতু। দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পৌঁছে যাবে সব পণ্য। ঘাটে ফেরি পারাপারের জন্য অনেক সময় অনেক রোগীকেও সমস্যায় পড়তে দেখা গেছে। এবার সেই সমস্যারও সমাধান হলো।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে শনিবার ভোর থেকেই দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলা ছাড়াও মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা ও অন্যান্য জেলা থেকেও সড়ক ও নদীপথে মানুষ আসতে শুরু করে। জাতির ইতিহাসের এই মাহেন্দ্রক্ষণ ঘিরে পদ্মার দুই তীরের পাশাপাশি সারা দেশে উৎসবের সাজ ছিল। বিভিন্ন এলাকা থেকে শোভাযাত্রা বের করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, আওয়ামী যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর সেতুতে হাজারো মানুষ হেঁটে উঠে পড়েন। সেতুতে উঠে সবাই নিজেকে মুঠোফোনে ক্যামেরাবন্দি করেছেন। শনিবার দুপুরে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে এমনই চিত্র দেখা যায়। কয়েকজন দর্শনার্থীর সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, ‘ইতিহাসের এই মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হতে পদ্মা সেতুর ওপর সেলফি তুলতে এসেছি।’

বরিশাল থেকে আসা মিরাজ মাহমুদ বলেন, ‘পদ্মা সেতু উদ্বোধন দেখতে গতকাল বরিশাল থেকে এসেছি। একটি সেতুর জন্য অনেক দুর্ভোগ পোহাইছি। সেতু হওয়ায় আমার ও আমার মতো দক্ষিণবঙ্গের মানুষের চিরদিনের জন্য কষ্ট দূর হলো।’

পদ্মা সেতু হওয়ায় এখন যেকোনো আবহাওয়ায় পদ্মা পাড়ি দিতে পারবে যেকোনো বাহন। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবহার করা বাহনগুলোও এখন এ সেতু ব্যবহার করতে পারবে।

সেতুর মাওয়া এলাকায় কথা হয় আনিসুল ইসলাম নামে এক ট্রাকচালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ট্রাক চালাতে গিয়ে ঘাটে অনেক ভোগান্তির শিকার হয়েছি। কখনো দীর্ঘ গাড়ীর জট। কখনো কুয়াশার কারণে ফেরি পারাপার বন্ধ। কখনো নদী উত্তাল থাকায় বন্ধ। আমি ট্রাক চালাতে গিয়ে অনেক সময় তাজা সবজি পঁচে যেতে দেখেছি। এছাড়া অনেক মালামাল নষ্ট হতে দেখেছি। এবার এসবের অবসান ঘটলো। কয়েক মিনিটে এই নদী পার হয়ে যেতে পারবো। ভাবতেই যেন ভালো লাগছে।

শনিবার বেলা ১২টার দিকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-১ উন্মোচনের মাধ্যমে সেতুর উদ্বোধন করেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। এর আগে, সকালে হেলিকপ্টারে করে মাওয়ায় পৌঁছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী মাওয়ার সুধী সমাবেশে অংশ নেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সূচনা সেতুর মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মঞ্চে বক্তব্য রাখেন। এরপর বক্তব্য দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। পরে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আসা সরকারের মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা ও সংশ্লিষ্টরা এসময় উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন। এসময় তাকে হাস্যোজ্জ্বল দেখা গেছে। আবুল হোসেন ছাড়াও এসময় সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াও উপস্থিত ছিলেন।

বক্তব্য শেষে সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতুর ছবি সম্বলিত ১০০ টাকার নোট ও স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করেন। বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটে সেতুর প্রথম টোল দেন প্রধানমন্ত্রী। ১২টার দিকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-১ উন্মোচন করে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুর ওপর দিয়ে শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তের উদ্দেশে রওনা হয়। সেতু পারি দেয়ার সময় মাঝপথে বিরতি দেয় প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর। সেখানে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার সঙ্গীরা ছবি তুলেন এবং বিমান বাহিনীর ফ্লাইং ডিসপ্লে উপভোগ করেন।

১২টা ২৬ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর সেতুর জাজিরা প্রান্তের দিকে রওনা হয়। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে গাড়িবহর জাজিরা প্রান্তে পৌঁছায়। সেখানে মোনাজাত হয়। এরপর জাজিরা প্রান্তে পৌঁছে ১২টা ৪০ মিনিটে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-২ উন্মোচন করেন সরকারপ্রধান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তাঁর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মশিউর রহমান, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরে আলম চৌধুরীসহ অতিথিরা।

এরপর প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাঁঠালবাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। সেখানে মুহুর্মুহু স্লোগান ও কড়তালিতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানান লাখো জনতা। পরে কাঁঠালবাড়িতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মূল সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মোট ৪১টি স্প্যানের মধ্যে প্রথমটি বসে সেতুর পিয়ারে। তখনই দৃশ্যমান হয় সেতুর কিছু অংশ। আর ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর শেষ স্প্যান বসানোর মাধ্যমে সংযুক্ত হয় মাওয়া-জাজিরা প্রান্ত। ২০২১ সালে পদ্মা সেতুতে পিচ ঢালাইয়ের কাজ শুরু হয়। আর গত ৪ জুন সেতুর ল্যাম্পপোস্টে প্রথমবারের মতো জ্বলে বাতি। ৯ জুন পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে সংসদে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

(ঢাকাটাইমস/২৫জুন/কেএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

জাতীয় এর সর্বশেষ

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :