পরকীয়ার বলি মা-মেয়ে, ১২ বছর পর গ্রেপ্তার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০৫ আগস্ট ২০২২, ২০:২৫

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী নিপাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে আসছিলেন জাকির হোসেন। পাঁচ বছরের দাম্পত্যজীবনে তাদের ঘরে আসে একটি কন্যা সন্তান। একপর্যায়ে জাকির তার বড় ভাবির সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি দেখে ফেলায় স্ত্রীকে রাতের আধারে শ্বাস রোধ করে হত্যা করেন। এ সময় মেয়ে দেখে ফেলায় তাকেও হত্যা করেন জাকির। স্ত্রী ও তিন বছরের মেয়েকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জাকির হোসেনকে ১২ বছর পর গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

বৃহস্পতিবার রাতে সাভারের শাহিবাগ এলাকা থেকে স্ত্রী ও তিন বছরের মেয়েকে হত্যার দায়ে জাকির হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৪।

শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‍্যাব-৪ অধিনায়ক (সিও) ডিআইজি মোজাম্মেল হক।

র‍্যাব অধিনায়ক বলেন, পারিবারিক কলহে জেরে ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে স্ত্রী নিপা আক্তার ও তিন বছরের মেয়ে জ্যোতিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন জাকির হোসেন। সেই মামলায় গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যান তিনি। পরে পালিয়ে থেকেই এক যুগ কাটিয়েছেন।

র‍্যাব বলছে, স্ত্রী-সন্তান হত্যায় পাঁচ বছর জেল খেটে জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে চলে যান জাকির। ২০১৩ সালে তিনি পুনরায় বিয়ে করে সাভারের জিনজিরা এলাকায় বসবাস করছিলেন। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি রাজধানীর আরামবাগ, ফকিরাপুল, হাজারীবাগ, খিলগাঁও, সাভার এবং চট্টগ্রামে থেকেছেন। প্রতিনিয়ত পেশা পরিবর্তন করেছেন। কখনো গার্মেন্টস, স্পাইরাল বাইন্ডিং, ঝুট ব্যবসা করেছেন। কখনো বাউলের ছদ্মবেশেও ঘুরেছেন এখান থেকে ওখানে।

মামলার তদন্তের বিবরণ তুলে ধরে এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, ২০০০ সালে জাকির হোসেন মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুরের জিয়নপুরে আবু হানিফের মেয়ে নিপা আক্তারকে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে নগদ অর্থ, গহনা ও আসবাবপত্র দেওয়া হয়। তবে বিয়ের পর আরও যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী নিপাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতে থাকেন জাকির। জাকির-নিপা দম্পতির ঘরে জ্যোতি নামে কন্যা সন্তানের জন্ম হয়।

মেয়ের বয়স যখন তিন বছর তখন পুনরায় গর্ভধারণ করেন স্ত্রী নিপা আক্তার। সে সময় নিপা জানতে পারেন জাকিরের বড় ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে তার পরকীয়া সম্পর্ক চলছে। একদিন জাকিরকে তার ভাবির সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেন, যা ভাসুর জাহাঙ্গীরকে নিপা জানিয়ে দেন। এ নিয়ে মনোমালিন্য-কলহ চরমে উঠে। জাকির নিপাকে তালাকের ভয় দেখানো শুরু করেন। পারিবারিক সম্মানহানি ও প্রতিশোধ পরায়ণ মানসিকতা থেকে জাকির গোপনে স্ত্রী নিপাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে জাকির ঘুমন্ত অবস্থায় নিপা আক্তারকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। মেয়ে জ্যোতি ঘটনা দেখতে পাওয়ায় মেয়েকেও শ্বাসরোধে হত্যা করে পালিয়ে যান জাকির। এই ঘটনায় পরের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি নিহতের বাবা আবু হানিফ বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় জাকির হোসেনসহ তার বাবা নইম উদ্দিন শেখ, মা মালেকা বানু ও ভাবি তাহমিনাসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা করেন। ওই মামলার আসামি জাকির পাঁচ বছর কারাভোগ শেষে জামিনে বেরিয়ে ২০১০ সালে আত্মগোপনে চলে যান।

পরে জাকির হোসেন, তার বাবা নইম উদ্দিন শেখ, মা মালেকা বানু ও ভাবি তাহমিনাসহ জাকিরের বড় ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন, জাকিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমিনুল, জাহাঙ্গীরের শ্যালক স্বপন ও হাসান এবং জাকিরের চাচাতভাই পারভেজ ওরফে রানা ওরফে মিলনসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।

আদালত সাক্ষ্য প্রমাণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে অন্তঃসত্ত্বা নিপা ও মেয়ে জ্যোতি হত্যায় প্রধান আসামি জাকিরকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আর তার ভাবি তাহমিনা, ভাই জাহাঙ্গীর, বন্ধু আমিনুল, চাচাতভাই পারভেজ রানা মিলন, জাহাঙ্গীরের শ্যালক স্বপন ও হাসানসহ প্রত্যেককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। শাশুড়ি মালেকা বানু বেকসুর খালাস পান। শ্বশুর নইম উদ্দিন বিচার চলাকালে মৃত্যুবরণ করেন। ২০১০ সালে জামিনের পর জাকির প্রায় ১২ বছর আত্মগোপনে ছিলেন।

২০১৩ সালে জাকির পুনরায় বিয়ে করেন। স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে তিনি সাভারের জিনজিরা এলাকায় বসবাস করছিলেন। স্ত্রী ও মেয়ে হত্যা মামলায় জামিন নিয়ে আর কোনোদিন মানিকগঞ্জে যাননি জাকির। ঘটনার পর থেকে গ্রেপ্তার এড়াতে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। পেশা পরিবর্তন করেন। বাউলের বেশে জীবিকা নির্বাহ করেন। গ্রেপ্তার জাকিরকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

(ঢাকাটাইমস/০৫আগস্ট/এএইচ/কেএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অপরাধ ও দুর্নীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

অপরাধ ও দুর্নীতি এর সর্বশেষ

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :