তাবেলা সিজার হত্যাকাণ্ড

বিচারক না থাকায় থেমে আছে বিচারকাজ

রুদ্র রাসেল, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১১ আগস্ট ২০২২, ১২:৩৯

রাজধানীর গুলশানে ইতালীয় নাগরিক তাবেলা সিজার হত্যাকাণ্ডের সাত বছর হতে চলল। অগ্রাধিকার তালিকার এই মামলার বিচারকাজ এখনো শেষ হয়নি। ইতিমধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরার কাজ শেষ পর্যায়ে। তবে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকের আসন শূন্য থাকায় বন্ধ রয়েছে এর বিচারকাজ।

এদিকে মামলার চার্জশিটভুক্ত সাত আসামির প্রধান দুজন- ঢাকা উত্তর বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুম এবং তার সহযোগী সোহেল ওরফে ভাঙারি সোহেলকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তারা বিদেশে পলাতক বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অন্য আসামিদের মধ্যে একজন জামিনে এবং অপর চারজন কারাগারে আছেন।

পলাতক কাইয়ুম ও সোহেলকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপুলে রেড নোটিশ জারি ও তাদের মালামাল ক্রোকের বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হবে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।

নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কোকোয়া অরগানাইজেশন (আইসিসিও) বাংলাদেশ-এর প্রফিটেবল অপরচুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি (প্রুফ) কর্মসূচির প্রকল্প ব্যবস্থাপক তাবেলা ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গুলশানের ৯০ নম্বর সড়কে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন এই মামলার বিচারকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর তাপস কুমার পাল ঢাকা টাইমসকে বলেন, মামলাটি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশের আদালতে বিচারাধীন ছিল। কিন্তু তিনি (ইমরুল কায়েশ) বিচারপতি হিসেবে হাইকোর্টে নিয়োগ পাওয়ায় মামলার বিচারকাজ বন্ধ হয়ে যায়।

শূন্যপদে এখনো কোনো বিচারক নিয়োগ না দেওয়ায় মামলার বিচারকাজ বিলম্বিত হচ্ছে জানিয়ে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর বলেন, এ ছাড়া করোনা ভাইরাসের কারণে দীর্ঘ দিন আদালতের কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। মামলার বিচারকাজ শেষ না হওয়ার এটিও কারণ। মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর বলেন, ‘মামলার দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ। তাকে আসামিপক্ষের জেরার সময় গত ৩১ জুলাই দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। নতুন বিচারক না আসা পর্যন্ত এই জেরা শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।’

তবে নতুন বিচারক নিয়োগ পেলে মামলার কার্যক্রম আবার শুরু হবে এবং চলতি বছরের মধ্যেই বিচারকাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর।

জানা যায়, মামলাটি কয়েক ধাপে চারজন তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত করেন। এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ। প্রথমজনকে আসামিপক্ষ জেরা করেছে। দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তার জেরা চলছে।

অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর বলেন, এরপর মামলার সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ ও তাকে জেরা শেষ হলে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হবে। সেখানে বাদী ও আসামি- উভয়পক্ষের আইনজীবী ৩০৪ ধারায় তাদের যুক্তি উপস্থাপন করবেন। এরপর মামলার সর্বশেষ ধাপ- রায় ঘোষণা।’ পলাতক আসামিদের বিষয়ে আদালত ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। আসামিরা বিদেশে পলাতক হলে তাদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপুলে রেড নোটিশ জারির কোনো নির্দেশনা এখনো আদালতের কাছে চাওয়া হয়নি বলে জানান অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর।

তাপস কুমার পাল বলেন, ‘পরিস্থিতি সে রকম হলে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের কাছে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপুলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশনা চাওয়া হবে।’

তবে মামলার পলাতক দুই আসামি গ্রেপ্তার না হলেও রায় ঘোষণায় কোনো বাধা সৃষ্টি হবে না বলে জানান অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর। প্রয়োজনে তাদের অনুপস্থিতিতেই আদালত রায় ঘোষণা করবেন, এতে আইনি কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। মামলার পলাতক আসামি আসামি এম এ কাইউম ও সোহেল ওরফে ভাঙারি সোহেলকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে ডিসি রহমান মশিউর বলেন, কাইয়ুম আরও কয়েকটি মামলার আসামি। তাকে গ্রেপ্তারে একাধিক অভিযান চালানো হয়েছে।

তবে গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, কমিশনার কাইয়ুম দেশে নেই। তিনি মালয়েশিয়ায় পলাতক। সেখান থেকে বিএনপির এক শীর্ষ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে প্রায়ই লন্ডনে যান তিনি। বিদেশে বসেই তিনি দেশে তার রাজনৈতিক সতীর্থ ও সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আসামিরা বিদেশে পলাতক থাকলে তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কী পদক্ষেপ নেবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আদালত যদি মনে করেন আসামিরা বিদেশে পলাতক এবং তাদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপুলে রেড নোটিশ জারি করা দরকার, তাহলে আদালত সেই নির্দেশনা দিলে পুলিশ আইনি প্রক্রিয়ায় তা সম্পন্ন করবে।

গোল বৃত্তে এম এ কাইয়ুম, ডানে খুন হওয়া ইতালিয়ান নাগরিক তাবেলা সিজার

পলাতক কাইয়ুম এখন কোথায়

তাবেলা হত্যার প্রধান আসামি এম এ কাইয়ুমের অবস্থান নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশায় আছে গোয়েন্দারা। কেউ বলছেন তিনি দেশেই লুকিয়ে আছেন। অনেকে বলছেন তিনি এখন মালয়েশিয়া ও লন্ডনে যাতায়াত করেন। নাশকতা ও দুর্নীতির দুই ডজনের বেশি মামলার আসামি কাইয়ুম বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে রাতারাতি আলোচনায় উঠে আসেন। জানা গেছে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ই মালয়েশিয়াকে সেকেন্ড হোম বানিয়ে নেন কাইয়ুম। সেখানে তিনি বিনিয়োগ করেছেন অঢেল টাকা। আবাসন ব্যবসা ছাড়াও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে তার বিপুল অর্থ।

সূত্রমতে, প্রবাস জীবনের বেশির ভাগ সময় কাইয়ুম মালয়েশিয়াতেই অবস্থান করেন। তাবেলা হত্যা মামলা থেকে তার নাম কাটাতে কাইয়ুম লন্ডনে থেকে বিএনপির এক সিনিয়র নেতাকে দিয়ে তদবির করিয়েছিলেন।

কী বলা হয়েছে অভিযোগপত্রে

মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, একটি স্বার্থান্বেষী মহল অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ইতালির নাগরিক তাবেলা সিজারকে হত্যা করে। এম এ মতিনকে অর্থের জোগানদাতা এবং এম এ কাইয়ুম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য ব্যক্তি।

চার্জশিটে আরো বলা হয়, আসামি সোহেলের কাছ থেকে পিস্তল ভাড়া নিয়ে খুনিরা তাবেলা সিজারকে হত্যা করে।

চার্জশিটে আরো বলা হয়, হামলাকারীদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল একজন শ্বেতাঙ্গকে হত্যা করে দেশ-বিদেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়া। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষণ্ন করতে এই পরিকল্পনা করা হয়।

‘নিখুত পরিকল্পনায়’ খুন

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ‘নিখুঁত পরিকল্পনা করে তাবেলাকে হত্যা করা হয়।’ আসামিদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, ঘটনার দিন শ্যুটার রুবেল চাকতি রাসেলকে নিয়ে গুলশানের ৯০ নম্বর রোডে অপেক্ষা করতে থাকে। সেখানে মোটরসাইকেলযোগে ভাগ্নে রাসেল যায়। এ সময় তাবেলা সিজারকে দেখতে পেয়ে মোটরসাইকেলযোগে ভাগ্নে রাসেল ও শ্যুটার রুবেল ৯০ নম্বর রোড ধরে কিছুদূর গিয়ে ইউটার্ন নেয়। পরে তাবেলা সিজারের কাছাকাছি পৌঁছে শ্যুটার রুবেল তাকে গুলি করে। এরপর তারা ৮৩ নম্বর রোড হয়ে পালিয়ে যায়।

মামলা সূত্রে জানা যায়, তাবেলা হত্যার ঘটনায় আইসিসিওবিডির পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ হেলেন ভেন ডার বিক গুলশান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

২০১৬ সালের ২২ জুন ত’কালীন ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার কাইয়ুমসহ সাতজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক গোলাম রব্বানি। এখন তার সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা বাকি রয়েছে।

২০১৬ সালের ২৫ অক্টোবর সাত আসামির বিরুদ্ধে চার্জগঠন করেন আদালত। ওই বছরের ১১ নভেম্বর মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। মামলাটিতে ৭১ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। আর জেরা শেষ হয়েছে ৩৯ জনের।

কাইউম ছাড়া অভিযোগপত্রে থাকা অন্য আসামিরা হলেন- কাইয়ুমের ভাই আবদুল মতিন, তামজিদ আহমেদ ওরফে রুবেল, রাসেল চৌধুরী, মিনহাজুল আরেফিন ওরফে ভাগনে রাসেল, শাখাওয়াত হোসেন ও সোহেল আহম্মেদ ওরফে ভাঙাড়ি সোহেল। আসামিদের মধ্যে সোহেল ছাড়া অন্য সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

পুলিশ জানায়, জামিনে আছেন কাইয়ুমের ভাই আবদুল মতিন। কারাগারে থাকা তামজিদ, রাসেল, মিনহাজুল ও শাখাওয়াত আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

(ঢাকাটাইমস/১১আগস্ট/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :