`বেগম খালেদা জিয়া' যিনি শুধু দিয়েই গেলেন, চলে গেলেন নিঃশব্দে

নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশের আকাশ–বাতাসে ভেসে বেড়াত একটি গান—
“এই দিন দিন না, আরও দিন আছে।”
গানটি শুধু সুর বা কথায় সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির সামাজিক জাগরণের ডাক। প্রাথমিক শিক্ষাকে জনপ্রিয় করা, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের স্কুলমুখী করার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গানটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। গানটির কথাকার ছিলেন হুমায়ুন আহমদ। তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি এমন একজন কণ্ঠ খুঁজছিলেন—যিনি কখনো স্কুলে যাননি, যাঁর বুকের গভীরে না-পড়তে-পারার দীর্ঘশ্বাস জমে আছে। সেই খোঁজ থেকেই উঠে এল কুদ্দুস বয়াতির নাম। তাঁর কণ্ঠে গানটি হয়ে উঠল অমর—একটি প্রজন্মের অনুভব, একটি জাতির আত্মকথা।
এই গানকে কেন্দ্র করেই যেন সূচনা হয়েছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীশিক্ষার প্রথম বড় সামাজিক অভিযাত্রা। বাংলাদেশ জন্মের পর মেয়েদের শিক্ষার প্রশ্নে সরকারিভাবে এটিই ছিল সবচেয়ে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি। মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি চালু হলো। বাল্যবিবাহ রোধে মাঠে নামানো হলো স্থানীয় প্রশাসন, আরোপ করা হলো শাস্তির বিধান। ন্যূনতম অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হলো। এসব সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক নয়—এগুলো ছিল সমাজের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে একেকটি সাহসী ঘোষণা।
যৌতুক যে অপরাধ—এ ধারণাও একসময় আমাদের সমাজে স্পষ্ট ছিল না। পারিবারিক বিষয় হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে যৌতুককে অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন বেগম খালেদা জিয়া। এটি ছিল নারীর মর্যাদা রক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
আজকের প্রজন্ম হয়তো জানেই না—একসময় প্রেমে ব্যর্থতা কিংবা দাম্পত্য কলহের ‘শাস্তি’ হিসেবে নারীর গায়ে প্রকাশ্যে এসিড নিক্ষেপ করা হতো। তখন খোলাবাজারেই বিক্রি হতো এসিড। এই নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া সরকার গ্রহণ করেছিল জিরো টলারেন্স নীতি। এসিড নিক্ষেপকে করা হলো গুরুতর অপরাধ, নির্ধারণ করা হলো সর্বোচ্চ শাস্তি। সেই সিদ্ধান্ত হাজারো নারীর জীবনে ফিরিয়ে এনেছিল নিরাপত্তার অনুভব।
নব্বইয়ের দশকের কিছু বিজ্ঞাপন আজও স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে। স্বামী স্ত্রীর ওপর নির্যাতন করছে—হঠাৎ কেউ প্রতিবাদ করে উঠছে। বলা হচ্ছে, “এটা করা যাবে না—এটা অপরাধ।”
একটি ছোট শিশু হোটেলে কাজ করছে—ডাকা হচ্ছে ‘পিচ্চি’ বলে। সে মাথা তুলে বলে, “আমার নাম আছে।”
কাজের মেয়েটি থালা–বাসন ধুতে ধুতে পানি না পেয়ে ছাই দিয়ে ছবি আঁকছে—গৃহিণী তার জন্য রংপেন্সিল কিনে আনছেন। পেছনে বাজছে—
“সুযোগ চাই মানুষ হবো, লেখাপড়া শেখা আমার অধিকার।”
এগুলো ছিল শিশুশ্রম বন্ধ ও শিশুদের মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রথম রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা।
এই সবকিছু ঘটেছে এমন একজন নারীর শাসনামলে, যাঁকে সারাজীবন বিদ্রূপ করা হয়েছে ‘ম্যাট্রিক পাস’ বলে। অথচ সেই নারীই নিজের শিক্ষাগত সীমাবদ্ধতার অপমান বুকে নিয়ে বাংলাদেশের সব মেয়ের জন্য শিক্ষার দরজা খুলে দিয়েছিলেন।
আজ আমরা অন্য দেশ নিয়ে হাসাহাসি করি—খোলা জায়গায় মলত্যাগ নিয়ে। কিন্তু একসময় আমরাও ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। এরশাদের Sanitation for All কর্মসূচিকে পূর্ণতা দেন খালেদা জিয়া। শিশুদের মাঝে স্বাস্থ্যবিধি জনপ্রিয় করতে প্রচার করা হয় মিনা কার্টুন। ফলাফল—খোলা জায়গায় মলত্যাগ কমে আসে, জনস্বাস্থ্যে পরিবর্তন দেখা দেয়।
মা ও শিশুস্বাস্থ্য কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয় ডায়রিয়া প্রতিরোধে ওরাল রিহাইড্রেশন সল্যুশন (ORS) প্রচার। ওরস্যালাইন হয়ে ওঠে সহজলভ্য। হাজার হাজার শিশুর প্রাণ রক্ষা পায়—নীরবে, নিঃশব্দে।
নব্বইয়ের দশকে পরীক্ষা মানেই ছিল নকলের উৎসব। বই খুলে পরীক্ষা দেওয়ার মতো অবস্থা। সেই সময় এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাকে নকলমুক্ত করার যে কঠোর উদ্যোগ, সেটিও নেওয়া হয় তাঁর সরকারের আমলেই।
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কথাও ভুলে গেলে চলবে না। জিয়াউর রহমান যে বীজ বপন করেছিলেন, খালেদা জিয়ার সময়ে তা বাস্তব ফল দেয়। উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছ কাটার বিপরীতে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের চিন্তা তখনই রাষ্ট্রীয় আলোচনায় আসে।
মূল্য সংযোজন কর (VAT) চালু, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, দুর্গম এলাকার স্কুলগুলোকে সাইক্লোন সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলা—এসব উন্নয়ন চোখে পড়ে না, কিন্তু জাতির ভিত শক্ত করে।
আমরা উন্নয়ন বলতে যা দেখি, সেটাকেই বুঝি। কিন্তু যা দেখা যায় না—সামাজিক নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা, নারীর অধিকার—সেগুলিই আসল উন্নয়ন। এই জায়গায় খালেদা জিয়া ছিলেন নিঃসন্দেহে সফল।
ব্যক্তিজীবনে তাঁর গল্প আরও বেদনাবিধুর। বিশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে, যৌবনের শুরুতেই বিধবা হওয়া, আর জীবনের শেষপ্রান্তে সন্তানের মৃত্যু। ক্ষমতায় থাকাকালীন সময় কেটেছে বিরোধী রাজনীতির লাগাতার সংঘাতে। শেষ জীবন কেটেছে নিঃসঙ্গতায়—কারাগারের বন্দির মতো।
প্রায় সতেরো বছর একা থাকার কষ্ট সহজ নয়। হয়তো তিনি সময় কাটিয়েছেন নামাজে, কোরআনে, নীরব আত্মসংলাপে। কখনো মনে হয়—এই দীর্ঘ নিঃসঙ্গতাই হয়তো তাঁকে আরও পরিশুদ্ধ করে দিয়েছে।
আজকের প্রজন্ম অন্ধ অনুসরণ করে না। তারা পড়ে, খোঁজে, যাচাই করে। তাই হয়তো আজ তারা নতুন করে খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানকে সম্মান করছে।
আমার আকাঙ্ক্ষা—এই সম্মানকে কোনো দলীয় সম্পদ না বানানো হোক। বলা হোক—বাংলাদেশের জিয়াউর রহমান, বাংলাদেশের খালেদা জিয়া।
আমি বিশ্বাস করি, বেগম জিয়ার জানাজায় মানুষের ঢল হবে—যা হয়তো সমসাময়িক কোনো নারী নেত্রীর ক্ষেত্রে পৃথিবীতে বিরল। হয়তো আল্লাহ দুনিয়াতেই তাঁকে এক শেষ সম্মান দিতে যাচ্ছেন।
চুয়াল্লিশ বছরের সংগ্রামের পর, একজন সাধারণ গৃহিণী থেকে জাতির অভিভাবক হয়ে ওঠা মানুষটি আজ অবশেষে বিশ্রামে যাবেন। যে ঘুম তিনি দীর্ঘ চার দশক ঘুমাতে পারেননি—আজ হয়তো সেই শান্ত ঘুম আসবে।
মহান আল্লাহর কাছে দোয়া—তিনি যেন তাঁর এই ঘুমকে শান্তিময় করেন, তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন, আর তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন।লেখক : ব্যাংকার ও রাজনীতি বিশ্লেষক
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































