আপোসহীনার ব্যাটন নিয়ে নতুন যাত্রায় তারেক রহমান

মো. আব্দুল মান্নান
  প্রকাশিত : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:২৩| আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:৪৮
অ- অ+

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু অধ্যায় আছে, যেগুলো সময়ের সীমানা অতিক্রম করে স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে যায়। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে এসে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিরপ্রস্থান তেমনই একটি অধ্যায়। শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি ছিলেন একটি যুগ, একটি সংগ্রাম, একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রতিরোধের নাম। তার গণতন্ত্রের পথযাত্রার বাটন এখন ছেলে তারেক রহমানের হাতে, যিনি তার সন্তানের চেয়েও নিজের রাজনৈতিক দর্শনের জন্য আলোচিত হচ্ছেন বেশি। তাকে বলা হচ্ছে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী মা খালেদা জিয়া ও বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের যোগ্য উত্তরসূরি।

আপোষহীনার প্রয়াণে রাজনীতির ময়দানে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু ইতিহাস কখনো থেমে থাকে না। নেতৃত্বের উত্তরাধিকার চলমান থাকে সময়ের প্রয়োজনে, প্রজন্মের প্রয়োজনে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের বৃহত্তম দল বিএনপির চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হলেন তারেক রহমান।

১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আসা তারেক রহমানকে ঘিরে উচ্চারিত একটি বাক্য নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে— ‘সদ্যপ্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যেখানে শেষ করেছেন, তারেক রহমান সেখান থেকেই শুরু করবেন।” এই বক্তব্য কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক দর্শন, একটি ধারাবাহিকতার ঘোষণা এবং একটি ভবিষ্যৎ রূপরেখার ইঙ্গিত।

মহীয়সীর বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল উত্থান-পতনের দীর্ঘ এক মহাকাব্য। সামরিক শাসনের অন্ধকার সময় পেরিয়ে তিনি গণতন্ত্রের পতাকা হাতে নিয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বহুদলীয় রাজনীতির পুনর্জাগরণ—এসব অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি ইতিহাসে নিজের স্থান পাকা করেন। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল সবচেয়ে কঠিন। বারবার কারাবরণ, অসুস্থ শরীর, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মামলা, চিকিৎসাবঞ্চনা—সবকিছু সত্ত্বেও তিনি আপসহীন থেকেছেন। রাজনীতি থেকে অবসর নেননি, আদর্শ থেকে সরে দাঁড়াননি। শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও রাজনৈতিকভাবে ছিলেন দৃঢ়তম।

বেগম খালেদা জিয়া যেখানে থেমেছেন, সেখানে কোনো পরাজয় নেই; আছে অসমাপ্ত স্বপ্ন, অপূর্ণ লড়াই আর অসম্পন্ন দায়বদ্ধতা।

তারেক রহমান ‘উত্তরাধিকার’ না ‘উত্তরসূরি’? তারেক রহমানকে অনেকেই শুধু ‘খালেদা জিয়ার পুত্র’ হিসেবে দেখার চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। গত দেড় দশকে বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্গঠন, আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন তাঁকে দুর্বল করেনি; বরং সময় দিয়েছে রাজনৈতিক চিন্তার গভীরতা অর্জনের। তিনি রাজনীতি শিখেছেন শুধু ক্ষমতার কাছ থেকে নয়, বরং বঞ্চনা, দমন-পীড়ন আর পরাজয়ের ভেতর দিয়ে। এই কারণে বলা হচ্ছে—তিনি নতুন করে শুরু করবেন না; তিনি সেখান থেকেই শুরু করবেন, যেখানে তাঁর মা থেমে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এই বক্তব্যের ভেতরে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা লুকিয়ে আছে— এক. ধারাবাহিকতা। বিএনপির রাজনীতি কোনো বিচ্ছিন্ন অধ্যায় নয়। খালেদা জিয়ার আদর্শ, দর্শন ও সংগ্রামের ধারাই বহন করবেন তারেক রহমান।

দুই. দায়বদ্ধতা। এটি কেবল নেতৃত্ব গ্রহণ নয়; এটি একটি অসমাপ্ত লড়াই শেষ করার অঙ্গীকার। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দায় তাঁর (তারেক রহমান) কাঁধে বর্তেছে। তিন. নতুন বাস্তবতায় নতুন কৌশল। যদিও শুরু হবে একই জায়গা থেকে, কিন্তু পথচলা হবে সময়োপযোগী কৌশলে। ডিজিটাল রাজনীতি, তরুণ প্রজন্মের সম্পৃক্ততা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি—সবই এতে যুক্ত হবে।

খালেদা জিয়ার রাজনীতি ছিল সরাসরি জনসংযোগনির্ভর, মাঠভিত্তিক ও আবেগঘন। আর তারেক রহমানের রাজনীতিতে দেখা যায় কৌশলগত পরিকল্পনা, নেটওয়ার্কভিত্তিক সংগঠন ও দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা।

এটি কোনো বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং সময়ের সঙ্গে নেতৃত্বের স্বাভাবিক বিবর্তন। যে রাজনীতি নব্বইয়ের দশকে কার্যকর ছিল, তা আজ হুবহু প্রয়োগ করলে সফলতা আসবে না—এই বাস্তবতা তারেক রহমান অনুধাবন করেন।

তবে পথটি সহজ নয়। তারেক রহমানকে মোকাবিলা করতে হবে—একটি ভেঙে পড়া গণতান্ত্রিক কাঠামো মেরামত, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলের সাংগঠনিক ক্লান্তি, তরুণদের রাজনীতিবিমুখতা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠন। এগুলো কোনো ব্যক্তির একার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু নেতৃত্বের কাজই হলো—দলকে ঐক্যবদ্ধ করা, দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং আশার আলো জ্বালানো।

খালেদা জিয়ার রাজনীতির মূল দর্শন ছিল—“মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকার, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা।”

এই স্বপ্ন নানা প্রতিকূলতার কারণে বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য পূরণ দেখে যেতে পারেননি। তাই বলা হচ্ছে—তারেক রহমানের শুরুটা আসলে একটি উত্তরাধিকার নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন। আবেগ নয়, বাস্তবতার রাজনীতি।

অনেকে আশঙ্কা করেন—এই বক্তব্য কি কেবল আবেগনির্ভর? না কি এটি বাস্তবসম্মত? বাস্তবতা হলো, বিএনপির রাজনীতি এখন আর আবেগে চলবে না। সময় এসেছে কাঠামোগত সংস্কার, দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন এবং জাতীয় ঐক্যের। তারেক রহমান যদি সত্যিই ‘সেখান থেকেই শুরু করেন’, তবে তাঁকে হতে হবে গভীরভাবে সংযত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কৌশলী।

বেগম খালেদা জিয়ার জীবনাবসান একটি যুগের সমাপ্তি হলেও তাঁর আদর্শের সমাপ্তি নয়। ইতিহাসে অনেক সময়ই দেখা যায়—একজন থেমে গেলে আরেকজন এগিয়ে আসে, কিন্তু পথ বদলায় না।

সদ্যপ্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যেখানে শেষ করেছেন, তারেক রহমান যদি সত্যিই সেখান থেকেই শুরু করেন—তবে তা হবে শুধু একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়; হবে একটি জাতির গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার চলমানতা এবং বাটন নিয়ে নতুন যাত্রা। সময়ই বলে দেবে, এই শুরু কতটা সফল হবে। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত—এটি আর শূন্য থেকে শুরু নয়; এটি ইতিহাসের ভার কাঁধে নিয়ে এগিয়ে চলার অঙ্গীকার। লেখক: সংবাদকর্মী।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
কালকিনিতে মহিলা মাদ্রাসায় হাতবোমা বিস্ফোরণে আহত ৪ শিক্ষার্থী
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের আংশিক কমিটিতে যারা পেলেন দায়িত্ব
বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, সব সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত
ডিএমপির অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৫৯ জন গ্রেপ্তার, মামলা ৪৪
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা