বরখাস্তের আদেশ বাতিল
চাকরিতে ফিরলেন ডিএমপির সাবেক ডিসি কোহিনূর মিয়া, তবে কি কমিশনার হচ্ছেন তিনি?

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ—ডিএমপির সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি, পশ্চিম) মো. কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া ‘চাকরি হতে বরখাস্ত’ গুরুদণ্ড বাতিল করা হয়েছে।
একই সঙ্গে তাঁর বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে তিনি বিধি অনুযায়ী বকেয়া বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা পাবেন।
সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ (শৃঙ্খলা-১ শাখা) থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে রুজু করা দুটি বিভাগীয় মামলায় তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তবে একই অভিযোগে দায়ের করা দুটি ফৌজদারি মামলায় আদালত তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস দেন। পরে তাঁর গুরুদণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মঞ্জুর করলে বরখাস্তের আদেশটি বাতিল করা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা বরখাস্তসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে।
কোহিনূর মিয়া চাকরিতে পুনর্বহালের খবরে পুলিশের মধ্যে গুঞ্জন উঠেছে পরবর্তী ডিএমপি কমিশনার হিসেবে তিনিই নিয়োগ পাচ্ছেন। কারণ, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কোহিনূর মিয়া তৎকালীন সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আর একারণে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তাকে কোণঠাসা করে। একপর্যায়ে সরকারের চাপে জীবনের নিরাপত্তায় তিনি আত্মগোপনে চলে যান।
বিসিএসের ১২তম ব্যাচের এই কর্মকর্তার বাড়ি ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায়। তবে তাঁর স্কুলজীবন কেটেছে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায়, সেখানেই তিনি মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।
যেসব অভিযোগ থেকে মুক্ত কোহিনূর মিয়া
এদিকে একজন পথচারীকে নির্যাতনের অভিযোগে প্রায় কুড়ি বছর আগে দায়ের করা একটি মামলা থেকে তৎকালীন প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়াসহ তিনজনকে খালাস দেয় আদালত। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার ভারপ্রাপ্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবুল হকের আদালত এ রায় দেন।
খালাস পাওয়া অন্য দুজন হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের তৎকালীন উপ–পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মাজহারুল হক ও কনস্টেবল রুহুল আমীন।
মামলার সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালের ১২ মার্চ ধানমন্ডির রাপা প্লাজার সামনে শাহিন সুলতানা শান্তা নামের এক নারী পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। সেদিন তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নির্বাচন কমিশন ঘেরাও কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ ও দলটির নেতা–কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ওই সময় নিজের ছেলেকে বিদ্যালয় থেকে নিয়ে বাসায় ফেরার পথে শান্তা ভয়ে পাশের একটি ক্লিনিকে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশের সদস্যরা তাকে ও তার ছেলেকে টেনে–হিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে তোলেন এবং মারধর করেন বলে অভিযোগ করা হয়।
ঘটনার দুই দিন পর ২০০৬ সালের ১৪ মার্চ শান্তা ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দুই উপ–পুলিশ কমিশনার ও এক কনস্টেবলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদন দেয়। এতে আপত্তি জানিয়ে শান্তা বিচার বিভাগীয় তদন্তের আবেদন করেন।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০০৯ সালে মামলাটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেয় আদালত। তবে মামলার অভিযোগপত্র জমা দিতে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময় লাগে এবং ২০২৩ সালে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। সম্প্রতি তিনজন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিলেও তারা ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান। এর পরই আদালত কোহিনূরসহ তিনজনকে খালাস দেন।
অন্যদিকে ২০২৪ সালে ১২ নভেম্বর ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক সাবরিনা আলী নান্দাইলের ডাবল মার্ডার মামলায় বেকসুর খালাস দেন তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) কোহিনূর মিয়াকে। সেসময় আসামিপক্ষের আইনজীবী এম. এ হান্নান খান জানান, প্রায় ২০ বছর ৬ মাস ৩ দিন পর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ ২২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত এ রায় দিয়েছেন।
মামলার সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালের ৫ মে পৌরসভা নির্বাচনের সময় নান্দাইল উপজেলার আচারগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই পক্ষের সংঘর্ষে সুজন ও আবু তাহের নামে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এ ঘটনায় শুরুতে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলেও তদন্তে আসামি শনাক্ত না হওয়ায় একাধিকবার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
পরে ২০০৭ সালে আওয়ামী লীগ নেতা রফিক উদ্দিন ভূইয়া সাবেক এমপি খুররম খান চৌধুরী, তৎকালীন এসপি কোহিনূর মিয়া ও পৌর মেয়র আব্দুস ছাত্তার ভুইয়া উজ্জ্বলসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশে সিআইডি তদন্ত করে ২০১১ সালে কোহিনূর মিয়া ও উজ্জ্বলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেন।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














































