আস্থাহীনতার প্রাচীরে বন্দি বাংলাদেশের  স্বাস্থ্যব্যবস্থা

মোঃসাইফুল ইসলাম মাসুম
  প্রকাশিত : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:১৭
অ- অ+

রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। আর সেই দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে স্বাস্থ্যব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা আজ ধীরে ধীরে মৌলিক অধিকার থেকে সরে গিয়ে অনেকের জন্য বিলাসপণ্যে পরিণত হচ্ছে। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও চিকিৎসা—এই চারটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে চিকিৎসাই আজ সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং নাগালের বাইরে চলে যাওয়া একটি খাত।

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশে স্বাস্থ্যসেবায় মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশই মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যেখানে বৈশ্বিক মান প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ। এই বিপুল ব্যক্তিগত ব্যয় শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেই নয়, মধ্যবিত্তকেও ধীরে ধীরে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। একদিকে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুখ বাড়ছে, অন্যদিকে চিকিৎসার ব্যয়ও লাগামছাড়া। ফলে অসুস্থতা এখন শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়—এটি একটি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সূচনা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৫২ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসেবার খরচ বহন করতে গিয়ে দরিদ্র হয়ে পড়ে এবং প্রায় ২ কোটিরও বেশি মানুষ বড় ধরনের আকস্মিক স্বাস্থ্য ব্যয়ের মুখোমুখি হয়। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়—এগুলো প্রতিটি পরিবারের ভাঙনের গল্প, দারিদ্র্যের পুনরুৎপাদনের নির্মম চিত্র।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে অর্জনও কম নয়। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি, কমিউনিটি ক্লিনিকের বিস্তার—এসবই প্রশংসনীয় অগ্রগতি। সারা দেশে প্রায় ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক ও শত শত সরকারি হাসপাতাল বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সেবা দিচ্ছে। কিন্তু এই অর্জনের বিপরীতে বাস্তবতার একটি কঠিন চিত্রও রয়েছে—ওষুধের ঘাটতি, চিকিৎসকের অভাব, যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা।

বিশেষ করে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দিনমজুর, হিজড়া সম্প্রদায়, জেলে, মুচি, আদিবাসী কিংবা যৌনকর্মীদের মতো জনগোষ্ঠী সামাজিক বৈষম্য ও মানসিকতার কারণে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়। ফলে স্বাস্থ্যসেবা একটি অধিকার নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক শ্রেণিভিত্তিক সুবিধায় পরিণত হচ্ছে।

অন্যদিকে, স্বাস্থ্যখাতে সাম্প্রতিক সংকটগুলো আরও উদ্বেগজনক। যক্ষ্মার ওষুধের ঘাটতি, ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের বিঘ্ন, জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের অভাব কিংবা সাপের কামড়ের প্রতিষেধকের সংকট—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি বৃহত্তর ব্যবস্থাগত দুর্বলতার প্রতিফলন। একটি রোগের চিকিৎসা মাঝপথে থেমে গেলে তা আরও ভয়ংকর রূপ নেয়—ওষুধ-প্রতিরোধী রোগে পরিণত হয়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই দুর্বলতা শুধু সেবার ঘাটতি নয়—এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ঘাটতি, অগ্রাধিকার নির্ধারণে ব্যর্থতা এবং জবাবদিহিতার সংকটের বহিঃপ্রকাশ। স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের বড় অংশ অবকাঠামো, বেতন ও প্রশাসনিক ব্যয়ে খরচ হলেও সরাসরি সেবাদানে তা যথেষ্ট প্রভাব ফেলছে না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এদিকে বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত, যা সরকারি ব্যবস্থার ঘাটতি পূরণের কথা ছিল, তা অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিকীকরণের চরম উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোগী এখানে ‘সেবা গ্রহীতা’ নয়, বরং ‘গ্রাহক’। অতিরিক্ত ফি, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, কমিশনভিত্তিক প্রেসক্রিপশন—এসব অভিযোগ এখন প্রায় স্বাভাবিক চিত্র। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সঙ্গে চিকিৎসকদের অস্বচ্ছ সম্পর্ক রোগীর ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই পুরো ব্যবস্থায় জবাবদিহিতার ঘাটতি প্রকট। সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণহীনতাও সমানভাবে দায়ী। ফলে সাধারণ মানুষ এক ধরনের দ্বিমুখী সংকটে পড়ে—সরকারি ব্যবস্থায় সেবা নেই, আর বেসরকারি ব্যবস্থায় সামর্থ্য নেই।

এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্যকে একটি বলবৎযোগ্য মৌলিক অধিকার হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে। সংবিধানে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের কথা বলা থাকলেও তা সরাসরি মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ নেই। ফলে নাগরিকেরা এটি আইনি অধিকার হিসেবে দাবি করতে পারেন না। অথচ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বের পাশাপাশি একটি আইনি বাধ্যবাধকতাও হওয়া উচিত।

তবে সমাধান কেবল বাজেট বাড়ানো নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি—যেখানে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সচেতনতা, স্থানীয় সরকারের অংশগ্রহণ এবং একটি কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলা হবে। রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়ার চেয়ে রোগ প্রতিরোধে জোর দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর এবং ব্যয় সাশ্রয়ী।

একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। চিকিৎসক, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার—সব পর্যায়ে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। রোগীর অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং সেবা প্রদানকারীদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্যখাতের সংকট নিঃশব্দে তৈরি হয়, কিন্তু এর প্রভাব গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি। একটি শিশু যখন পুষ্টিহীনতায় ভোগে, একটি রোগী যখন চিকিৎসার অভাবে মারা যায়, কিংবা একটি পরিবার যখন চিকিৎসা খরচে সর্বস্বান্ত হয়—তখন সেই ক্ষত সমাজের ভেতরে জমা হতে থাকে।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সময় যদি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা না যায়, তবে উন্নয়নের গল্প অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। কারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রতিফলিত হয়।

অতএব, এখনই সময় স্বাস্থ্যখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার। কারণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা কোনো পরিসংখ্যানের ব্যর্থতা নয়—এটি মানুষের জীবনের ব্যর্থতা। আর সেই ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়।

লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
নালিতাবাড়ীতে গলায় বাদাম আটকে ৩ বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু
আগামীকাল থেকে বাধ্যতামূলক হচ্ছে বাংলা কিউআর
পতেঙ্গায় কোস্ট গার্ডের অভিযানে বিপুল বিদেশি মদ, বিয়ার ও সিগারেট জব্দ
ই-অরেঞ্জের প্রধান উপদেষ্টা মাসুকুর রহমান গ্রেপ্তার
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা