সাংবাদিককে
হুমকির মামলায় পাঁচ অধ্যক্ষ-সুপারের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে পুলিশ

ভুয়া শিক্ষক সনদ ও নিয়োগের বিষয়ে অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার জেরে সাংবাদিক কাজী শরিফুল ইসলামকে হুমকি ও মানহানি করার অভিযোগে করা মামলায় পাঁচ অধ্যক্ষ ও সুপারের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। দণ্ডবিধির ৫০০ ও ৫০৬ ধারায় করা মামলাটির তদন্তে সাক্ষ্য-প্রমাণ, কাগজপত্র ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা পর্যালোচনা করে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গত ১৯ আগস্ট ঢাকার চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আদালত নং-৯-এ তদন্ত প্রতিবেদনটি দাখিল করেন রমনা মডেল থানার সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) নাজমুল হোসেন। মামলাটি সিআর মামলা নং-৩০৬/২০১৬ (রমনা)।
রমনা মডেল থানার সাব-ইন্সপেক্টর নাজমুল হোসেন বলেন, আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত পাঁচজন হলেন— মনতলা ফাজিল মাদ্রাসা অধ্যক্ষ বাকিউল ইসলাম, কোচের চর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ওরফে কামাল উদ্দিন, টিকিউ বালিকা মাদ্রাসার সুপার এমারত হোসাইন, শেখেরগাঁও জে ইউ ফাজিল মাদ্রাসার সুপার এখলাছ উদ্দিন এবং চন্দনবাড়ি কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. আবু রায়হান ভূঁইয়া।
মামলার বাদী কাজী শরিফুল ইসলাম মনোহরদী উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি। তিনি পেশায় সাংবাদিক। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও ভুয়া শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে অনুসন্ধান করে সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে আবেদন করেন তিনি।
এর ধারাবাহিকতায় ভুয়া এনটিআরসিএ সনদের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন কাজী শরিফুল ইসলাম।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই শেষে বিভিন্ন সময়ে ২৬ জন ভুয়া এনটিআরসিএ সনদধারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাদের ইনডেক্স কর্তন ও বেতন বন্ধের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ২৬ জনের মধ্যে মনতলা ফাজিল মাদ্রাসার ৮ জন, কোচের চর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার ৮ জন, শেখেরগাঁও জে ইউ ফাজিল মাদ্রাসার ২ জন এবং টিকিউ বালিকা মাদ্রাসার ৮ জন শিক্ষক রয়েছেন।
বাদীর অভিযোগ, এসব বিষয়ে অনুসন্ধান ও অভিযোগ করার পর আসামিরা তার ওপর ক্ষুব্ধ হন। এরপর বিভিন্ন সময়ে তাকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে মনোহরদী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের গেটের সামনে কাজী শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করা হয় এবং অপপ্রচার চালানো হয়।
বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, ওই মানববন্ধনের ব্যানার ও বক্তব্যে তাকে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তার বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগও তোলা হয়। পরে মানববন্ধনের ভিডিও ও বক্তব্য বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে তার সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করেন তিনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১৬ মার্চ সকাল ১০টার দিকে ঢাকার রমনা থানাধীন বেইলী রোডে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এলাকায় আসামিরা তাদের সঙ্গে থাকা লোকজন নিয়ে বাদীর ছবি ব্যবহার করে একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন। সেখানে বাদীর বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া হয়। পরে এসব বক্তব্য ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে জানান, তদন্তভার গ্রহণের পর ১৫ মে সকাল ১০টার দিকে বাদীর দেখানো মতে ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়। পরে বাদী ও ঘটনার বিষয়ে অবগত সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনে ঘটনাস্থল এলাকায় বিশ্বস্ত সোর্স নিয়োগ করে প্রকাশ্য ও গোপনীয়ভাবেও তদন্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মামলায় বাদীপক্ষের সাক্ষী হিসেবে অঞ্জনা বেগম, রাজীব হোসেন ও মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের নাম রয়েছে। নিরপেক্ষ সাক্ষী হিসেবে সেলিম রেজাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থল ও আশপাশে তল্লাশি চালিয়েও জব্দ করার মতো কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। বাদীর কাছ থেকেও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
তদন্তের শেষ পর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মামলার সার্বিক তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ, কাগজপত্র পর্যালোচনা এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৫০০ ও ৫০৬ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
তারা হলেন— বাকিউল ইসলাম, মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ওরফে কামাল উদ্দিন, এমারত হোসাইন, এখলাছ উদ্দিন এবং আবু রায়হান ভূঁইয়া।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যথাযথ নিয়মে বাদীকে তদন্তের ফলাফল জানানো হয়েছে। মামলার বিচারকালে বাদী ও সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করবেন।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































