এরশাদের জাপায় সেই একনায়কতন্ত্রই

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ স্বৈরাচারী শাসক ও একনায়ক হিসেবে পরিচিত। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে একেবারে ১৯৯০ সালে পতন পর্যন্ত এরশাদের ‘বৈধতার সংকট’ লেগেই ছিল। অর্থাৎ এরশাদের ক্ষমতারোহণ সাংবিধানিকভাবে ছিল অবৈধ। তাই দেশের অন্য রাজনৈতিক দলগুলো তার ক্ষমতাসীন হওয়াকে মেনে নিতে পারেনি। এরশাদ এখন ক্ষমতায় নেই। বর্তমানে সংসদীয় বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (সংক্ষেপে জাপা এরশাদ) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু একটি প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে, ক্ষমতাহীন হওয়ার এত বছর পরও কী এরশাদের স্বৈরাচারিত্ব ও একনায়কত্ব ঘুচেছে?
রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতে এরশাদ জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি। সেই থেকে তিনি এ দলের চেয়ারম্যানও। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি দলের ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ব্যাপক শোডাউন করতে চাচ্ছেন তিনি। সেদিন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রায় ১০ লাখ লোকের সমাবেশ ঘটানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার। পার্টির মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার জানিয়েছেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে দলের এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশকে সর্বকালের ইতিহাস করতে চাচ্ছেন। এরশাদ একদিকে বিরোধী দলে রয়েছেন, আবার তার দলের কয়েকজন সরকারের মন্ত্রিপরিষদেও আছেন। তিনি নিজেও মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। ক্ষমতার পক্ষপুটে থেকে ঢাকায় ১০ লাখ লোকের সমাবেশ ঘটানো তার জন্য মোটেও অসম্ভব নয়। তবে মোদ্দা কথা হচ্ছে, জাতীয় পার্টির মতো ৩০ বছরের একটি রাজনৈতিক দলে এখনো অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নেই বললেই চলে। তিনি যে একক সিদ্ধান্তে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন, এখন দলও তার সেই একক সিদ্ধান্তেই চালাচ্ছেন। পার্টিটি হয়ে পড়েছে তার খেয়াল-খুশির এবং পারিবারিক এক পুতুল। ‘দম’ দিয়ে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই চালাতে চান তিনি। আসলে তার ‘একনায়কতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারমূলক’ স্বভাব এখনো পুরোদস্তুর বিরাজমান।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহানের বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলসমূহের ওপর লিখিত গবেষণামূলক এক গ্রন্থ ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ ইন বাংলাদেশ’। এতে তিনি দেখিয়েছেন যে, স্বাধীনতা লাভের পর গত ৪৩ বছর ধরে দেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা নেই বললেই চলে। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তুলনায় জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রে তাদের চেয়ারম্যানকে পার্টির জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের নির্বাচিত করার ক্ষমতা বেশি দিয়েছে। ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র দুইবার বাদে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আছেন। ১৯৯১-৯৭ সালে মিজানুর রহমান চৌধুরী এবং ২০০৭-২০০৯ সালে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই ৭ম জাতীয় কাউন্সিলের উদ্বোধনী অধিবেশনে এরশাদ পার্টিকে জানিয়েছিলেন যে, তিনি যেহেতু আবার দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসার জন্য তৈরি, সেহেতু আর কোনো ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের প্রয়োজন নেই। তিনি এ পদে আমৃত্যু থাকতে চান। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতোই জাতীয় পার্টির অন্য পদগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষমতা পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে দিয়ে দেওয়া হয়।
চলতি বছরের (২০১৬) কোনো ফোরামে আলোচনা না করেই পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার ভাই জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান ও রুহুল আমিন হাওলাদারকে মহাসচিব নিয়োগ দিলে তা নিয়ে পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। দলীয় ফোরামে আলোচনা ব্যতিরেকে একক ক্ষমতাবলে চেয়ারম্যানের এ রকম নিয়োগকে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুমোদন করে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠলে এরশাদ এর থোরাই কেয়ার করেছেন বলে মনে হয়। কেননা কো-চেয়ারম্যান পদটি যেখানে গঠনতন্ত্রেই নেই, সেখানে কী করে এ ধরনের একটি পদে নিয়োগ দেওয়া হয় এমন বৈধতার প্রশ্ন ওঠলে উত্তরে এরশাদ বলেছিলেন, পরবর্তী কাউন্সিলে সংশোধন করে গঠনতন্ত্রে পদটি অ্যাকমোডেট করে নেওয়া হবে। অবশ্য চলতি বছরে জাতীয় পার্টির যে কাউন্সিল অধিবেশন হয়, তাতে কো-চেয়ারম্যানের নতুন পদ অনুমোদন করা হয়।
এছাড়া জাতীয় পার্টির কাউন্সিল উপলক্ষে গঠিত প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে করা হলে তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু। এর পাল্টা হিসেবে এরশাদকে বাদ দিয়ে তার স্ত্রী রওশনকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন ঘোষণা দিলে সংগঠনের মহাসচিব পদ থেকে বাদ পড়েন বাবলু। এটা এরশাদ নিজেই বলেছেন। সুতরাং কাউন্সিলের আগেই দলের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগ-নির্বাচন যাই বলি না কেন এটি হলে তাতে কাউন্সিলের গুরুত্ব আর থাকে না। আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাউন্সিল বা কনভেনশনের এমন অবস্থাই ওঠে এসেছে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক গবেষণায়। ‘ইনস্টিটিউলাইজেশন অব ডেমোক্রেসি ইন দ্য পলিটিক্যাল পার্টিজ ইন বাংলাদেশ : ডাজ কালচার মেটার?’ শীর্ষক ওই গবেষণায় মন্তব্য করা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টি কোনো দলেরই নিয়মিতভাবে কাউন্সিল কিংবা কনভেনশন হয় না। এমনকি যদি কাউন্সিল কিংবা কনভেনশন হয়, তাহলেও দলের বিভিন্ন পদে নেতৃত্ব বাছাইয়ের জন্য নির্বাচন হয় না। দলের নেতারা দলীয় নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য কোনো সুশৃঙ্খল পদ্ধতি অনুসরণ করেন না। বরং এ ক্ষমতা তারা দলীয় প্রধানের কাছে হস্তান্তর করেন। এখন দলের নেতৃত্ব এরশাদের হাতেই রয়েছে এবং এই নেতৃত্ব পাকাপোক্তভাবে তার হাতে থাকার জন্য যা করা দরকার এরশাদ তাই করে যাচ্ছেন। তার সহোদর জি এম কাদেরকে গঠনতন্ত্রের বাইরে গিয়ে কো-চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
এরশাদ যেন ইতালীয় রাষ্ট্রদার্শনিক মেকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থের সেই আরাধ্য রাজার চরিত্র ‘সাহসী সিংহের মতো’ না হলেও ‘শৃগালের মতো’ই ধূর্ত। এক সময়ে তারই সহযোগী বর্তমানে বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তার ‘চলমান ইতিহাস’ গ্রন্থে এরশাদকে চিত্রিত করেছেন ‘প্রকৃতভাবে নম্র, ভদ্র, মার্জিত এবং চতুর’ বলে। বলেছেন, ‘তিনি যেকোনো সিদ্ধান্ত এক লহমার মধ্যে পরিবর্তন করতে পারতেন।... যদিও সংস্কার, আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে এরশাদের অবদান ছিল বিশালতর, কিন্তু জনগণের বিশ্বাস এবং আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই এরশাদ একজন নেতা হিসেবে বৈধতা অর্জন করতে সক্ষম হননি।’ তবে এটা ঠিক, চালাক-চতুরতার আশ্রয় নিয়ে এরশাদ নিজেকে ও তার দলকে অনেকটা ক্ষমতায় যাওয়ার মইয়ে পরিণত করেছেন। এজন্য নির্বাচন এগিয়ে এলে তাকে নিয়ে দুই বৃহৎ দলের নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে টানাহেঁচড়া শুরু হয়ে যায়। তিনি এসব করে নিজের দলকে সংসদের প্রধান বিরোধী দলে পরিণত করতে পেরেছেন। 
নিজের স্ত্রী রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতার আসনে বসাতে পেরেছেন। একই সঙ্গে তার দলের কয়েকজন নেতাকে সরকারের মন্ত্রিপরিষদেও স্থান দিতে পেরেছেন। আর নিজে? তিনি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন বিরোধী দল বোধহয় আর দেখা যায়নি। প্রবাদে আছে, ‘গাছেরটাও খাব, নিচেরটাও কুড়োব।’ অর্থাৎ সবই আমার। এরশাদ বর্তমান সরকারের আমলে ওই প্রবাদকে বাস্তবে পরিণত করেছেন। তিনি মেকিয়াভেলির সেই বহুল রাজনৈতিক তত্ত্ব ‘রাজনীতিতে ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু নেই’-এ উদ্বুদ্ধ হয়ে এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আবার অধিষ্ঠিত হওয়ার সুখ-স্বপ্ন দেখছেন। এরশাদ ৯ বছরের দোর্দ- প্রতাপে দেশ শাসন করেছিলেন জেলখানায়। আর এখন ক্ষমতালিপ্সুদের আশকারায় ক্ষমতার চৌহদ্দিতেই বসবাস তার। রাজনীতিক হিসেবে এরশাদ যে কতটা শঠ হতে পারেন, তা তার সাবেক স্ত্রী বিদিশা তার ‘শত্রুর সঙ্গে বসবাস’ গ্রন্থে কিছুটা দিয়েছেন।
মোট কথা এরশাদ দোর্দ- প্রতাপে যেমন দেশ শাসন করতেন, এখন দলও চালাচ্ছেন সেভাবে। দলের গঠনতন্ত্র আছে বটে, তবে এরশাদের ইচ্ছাই গঠনতন্ত্রের ঊর্ধ্বে স্থান পায়। তার মর্জিই দল পরিচালনার ভিত্তি। তিনি কখন কাকে দলের নেতৃত্বে আনবেন তা তারই মর্জির ওপর নির্ভর করে। তার এসব সিদ্ধান্তকে দলের কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারেন না। আসল কথা এরশাদ তার দলে ক্ষমতায় থাকাকালীন একনায়কত্বই চালাচ্ছেন।
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































