রাজধানীতে সৌন্দর্য্যহানির ‘প্রতিযোগিতা’

সৈয়দ অদিত ও আউয়াল খাঁন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৬ মার্চ ২০১৭, ১৭:৩১ | প্রকাশিত : ০৬ মার্চ ২০১৭, ০৮:১২

রাজধানীর সড়কের পাশের দেয়াল আর পিলারগুলো ছেয়ে আছে নানা প্রচার উপকরণে। পোস্টার, ফেস্টুন আর দেয়াল লিখন পুরোপুরি শ্রীহীন করে তুলেছে এলাকাকে। এই প্রচার উপকরণগুলো সরিয়ে না নিলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে সিটি করপোরেশনের হুঁশিয়ারি গায়েও মাখেনি প্রচার উপকরণ সাঁটানো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলো।   

রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ করে সিনেমা ও বিনোদন সংক্রান্ত পোস্টারই বেশি চোখে পড়ে বিভিন্ন স্থাপনায়। আরও আছে ধর্মীয় পীরদের নানা লেখনি ও পোস্টার। সব মিলিয়ে যেন সৌন্দর্যহানির প্রতিযোগিতা।

আইনে এভাবে প্রচার চালানো অবৈধ। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ব্যবস্থা নেয় না কেউ, তাই বেড়েই চলেছে এই প্রবণতা। তবে সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, যারা দেয়াল বা অন্য কোনো স্থাপনায় পোস্টার তুলে ফেলতে হবে, মুছে দিতে হবে দেয়াল লিখন। নইলে যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে এসব প্রচার চালানো হচ্ছে ব্যবস্থা নেয়া হবে তাদের বিরুদ্ধে।

সিটি করপোরেশনের এই বেঁধে দেয়া সময়সীমা পার হয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু নগর কর্তৃপক্ষের হুঁশিয়ারি কেউ গায়ে মেখেছে এমন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। আগের মতই সাঁটানো আছে পোস্টার, দেয়ালে নানা বিজ্ঞাপন আর লেখা রয়ে গেছে আগের মতই।

রাজধানীর বেইলি রোড, মগবাজার ও ইস্কাটন এলাকা ঘুরে সৌন্দর্যহানির এই চিত্র দেখা গেছে। সবগুলো এলাকাতেই দেয়াল, বৈদ্যতিক খুঁটি আর উড়াল সড়কের পিলার ছেয়ে আছে পোস্টারে। যতটা উঁচুতে উঠা যায়, ততটা উঁচুতেই লাগানো হয়েছে পোস্টার। দেয়ালগুলোতেও আছে লিখন  আর পোস্টার। একটির ওপর সাঁটানো হয়েছে আরেকটি। এক পর্যায়ে দেয়ালের আস্তরণের চেয়ে কোথাও কোথাও মোটা হয়ে গেছে পোস্টারের আস্তরণ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এম কে বখতিয়ার ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘পোস্টার লাগানো আর দেয়াল লিখন আমাদের দৈনন্দিন কাজের তালিকায় রয়েছে। প্রতিদিন পোস্টার লাগানো হয় আর আমরা প্রতিদিন আমরা সেগুলো খুলি।’

তাহলে যারা পোস্টার লাগাচ্ছে বা দেয়ালে লিখছে তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না-জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আমরা কীভাবে করবো বলেন? বুঝেন ইতো!’

উত্তর সিটি নির্দেশনা মানা হয়নি

সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ছাপিয়ে দেয়াল লিখন মুছে ফেলার পাশাপাশি পোস্টার তুলে ফেলার নির্দেশ দেয়। এতে বলা হয়, এই নির্দেশনা না মানলে জরিমানার পাশাপাশি শাস্তিমূলক অন্যান্য ব্যবস্থাও নেয়া হবে।  বেসরকারি টেলিভিশনের স্ক্রলেও এই নির্দেশনা প্রচার করা হয়েছে।

সময়সীমা পার হওয়ার পর কী চিত্র? রামপুরার বাড়িওয়ালা আনোয়ান হোসেন তার দেয়ালে আপত্তিকর নানা পোস্টারের কারণে বিব্রত। নিজের সন্তান আর পরিচিতজনদের কাছে এসব পোস্টারের জন্য লজ্জায় পড়তে হয় কখনও কখনও। কিন্তু এ থেকে মুক্তির উপায় জানেন না তিনি। পরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিজ্ঞপ্তির কথা জানালে তিনি কিছুটা সস্তি পান। বলেন, ‘আশা করি তারা এবার সফল হবে।’
তেজগাঁওয়ের ঢাকা পলিটেকনিক ইনসটিটিউট (ডিপিআই) এর সীমানা দেয়াল জুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেয়াল লিখন ও পোস্টার সাঁটানো দেখা গেল। ডিপিআইয়ের অধ্যক্ষ শাহ্জাহান খান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘যতবারই পরিষ্কার করি ততবারই কে বা কারা রাতের অন্ধকারে এসে বিজ্ঞাপন দিয়ে পুরোটা দেয়াল নষ্ট করে রাখে।’ তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের এ ধরণের বিজ্ঞপনের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সৌন্দর্য্য ধরে রাখা সম্ভব নয়। সিটি করপোরেশনকে এসব বিষয়ে কঠোর হতে হবে।’

কথা হলো একজন বিজ্ঞাপনদাতা সেলিম রেজার সাথে। তিনি পেশায় একজন কাজী। বিয়ে ও তালাক সংক্রান্ত বিষয়ে তার কাছে যেতে তিনি তার কাজী অফিসের বিজ্ঞাপন দিয়েছেন মগবাজর সংলগ্ন হাতিরঝিলের সীমানাপ্রাচীরে।  সেলিম বিজ্ঞাপনটি মানবসেবার জন্য দিয়েছেন দাবি করে সেলিম রেজা বলেন, ‘সিটি করপোরেশন আসলে আসুক, প্রয়োজনে জরিমানা দিব। তারপর আমার বিজ্ঞাপন দেয়াল থেকে মুছবো না।’

অভিযানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

সময় সীমা পার হওয়ার পর পর দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। ২ মার্চ থেকেই এই কার্যক্রম শুরু হয় তাদের। ওই দিন রাজধানীর ফার্মগেটে সাতটি কোচিং সেন্টারকে দেয়াল লিখন ও পোস্টার সাঁটানোর দায়ে তিন লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এর মধ্যে উদ্ভাস, উন্মেষ, প্যারাগন ও ওরাকল কোচিং সেন্টারকে ৫০ হাজার কওে এবং সাইফুরস ও ইউসিসিকে ৪০ হাজার করে এবং এবং নাসির স্যার নামের কোচিং সেন্টারকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়েছে ইনডিকেটর কোচিং সেন্টারকে।
এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক। এসব প্রতিষ্ঠানকে ১০ দিনের মধ্যে পোস্টার ও দেয়াল লিখন অপসারণ করে দেয়ালে রঙ করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আবদুর রাজ্জাক ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘২০১২ সালের দেয়াল লিখন ও পোস্টার নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় দেয়াল লিখন ও পোস্টারিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই আইনের প্রয়োগ করার বিষয়ে আমরা এখন মনযোগী।

এই কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য সিটি করপোরেশন নির্ধারিত এলাকায় পোস্টার লাগানোর ব্যবস্থা করবে। এ জন্য জায়গা নির্দিষ্ট করার চেষ্টা চলছে। তবে এতে সময় লাগবে।

(ঢাকাটাইমস/০৫মার্চ/এএকে/এসও/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত