যে কারণে কুমিল্লা বোর্ডে ‘অস্বাভাবিক’ ফল

মাসুদ আলম, কুমিল্লা
| আপডেট : ০৬ মে ২০১৭, ১৭:০৭ | প্রকাশিত : ০৪ মে ২০১৭, ১৯:০২

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলকে বিপর্যয় বললেও কম বলা হবে। গেলবারের চেয়ে পাসের হার এক ধাক্কায় কমে গেছে ২৪.৯৭ শতাংশ। ৮৪ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৫৯.০৩ শতাংশে। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা এই ফলকে বলছেন অস্বাভাবিক খারাপ। গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে খারাপ ফলের পাশাপাশি পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিববর্তন এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে খাতা দেখার ক্ষেত্রে কড়া মনিটরিংকেও এই ফল বিপর্যের জন্য দায়ী করছেন তারা।

ছয়টি জেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে এবারের পাসের হার গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বেশ কয় বছর ধরেই ফল খারাপ করছে এই বোর্ড। গতবার সব বোর্ডের পাসের গড় হারের (৮৮.২৩) চেয়ে ৪ শতাংশ পিছিয়ে ছিল (৮৪ শতাংশ) কুমিল্লা বোর্ড, কিন্তু এবার প্রায় ২১ শতাংশ পেছনে পড়েছে। এবার সব বোর্ডের গড় পাসের হার ৮০.৩৫ শতাংশ।

সর্বনিম্ন পাসের হারের সঙ্গে সঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫।  গতবারের চেয়ে এবার জিপিএ-৫ কম পেয়েছে ২ হাজার ৫০৪ জন।  এবার মোট ৪ হাজার ৪৫০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে, যা গতবার ছিল ৬ হাজার ৯৫৪।
শতভাগ পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও এবার কুমিল্লা বোর্ডে গত ৫ বছরের সর্বনিম্ন। এমনকি গতবার যেখানে শতভাগ পাস করা কুমিল্লা বোর্ডে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ১১৯টি, এবার শতভাগ পাস করেছে মাত্র ১৪টি প্রতিষ্ঠান। এবার  শুধু একটি ক্ষেত্রে এগিয়েছে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড- গতবার একজনও পাস করেনি এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল তিনটি এবার তা কমে হয়েছে দুটি।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কায়সার আহমেদ এবারের ফল বিপর্যয়কে অস্বাভাবিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, গণিত ও ইংরেজি বিশেষ করে গণিতের কারণে এ ফল বিপর্যয়।
গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ফলাফল প্রসঙ্গে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কায়সার আহমেদ বলেন, ‘এর অন্যতম কারণ হলো, আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখনো অঙ্ক ও ইংরেজি ভীতি দূর হয়নি। এবার প্রায় ৩৫ ভাগ পরীক্ষার্থী ফেল করেছে গণিতে, আর প্রায় ৩০ ভাগ পরীক্ষার্থী ফেল করেছে ইংরেজিতে। বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী এই দুই বিষয়ে ফেল করার কারণেই আমাদের গড় ফলাফল পড়ে গেছে। তার ওপর এবার আমরা প্রথমবারের মতো মন্ত্রণালয়ের নির্দেশমতো পরীক্ষক আর প্রধান পরীক্ষকদের কঠোর মনিটরিংয়ে রেখেছিলাম। এটাও ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলেছে।’

ফলাফলের এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণের উপায় কী জানতে চাইলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেন, ‘যেসব স্কুল গণিত ও ইংরেজিতে খারাপ করেছে, তাদের নোটিশ দিতে বলেছেন চেয়ারম্যান মহোদয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকদের আমরা ডেকে কথা বলব। তাদের উত্তর আশাব্যঞ্জক না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। একই সঙ্গে আগামী দিনে যেসব ছাত্রছাত্রী নির্বাচনী পরীক্ষায় খারাপ করবে কোনোভাবেই যাতে তারা মূল পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারে সে জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ আজ (বৃহস্পতিবার) থেকেই তারা এই বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে  বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের গণিত বিষয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।  শিক্ষকদের ভাষ্য, এ বছর গণিতে সৃজনশীল প্রশ্ন সরবরাহ এবং তার উত্তরদান পদ্ধতি গত বছরের তুলনায় ভিন্নতা ছিল। গত বছর সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি অনুসারে প্রথমে শিক্ষার্থীরা সাবজেক্টটিভ ও পরে নৈব্যক্তিক প্রশ্নপত্রের উত্তর দিত। এ বছর আগে নৈর্ব্যক্তিক ও পরে সাবজেক্টিভ উত্তর  করেছে। এ ছাড়া নম্বরে এসেছে পরিবর্তন। গত বছর ৪০ নম্বর ছিল নৈর্ব্যক্তিক, এ বছর ৩০। প্রশ্নপত্রের উত্তরদানে এই পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থীরা খেই হারিয়ে ফেলে।

এ ছাড়া বোর্ডের বেশির ভাগ পরিদর্শন দল বোর্ডের অধীন অন্য পাঁচ জেলায় না গিয়ে কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা তৈরি হয় বলে জানান অনেক শিক্ষক। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্রে। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তাও এ কথা জানান।

এদিকে কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের অন্তত ১০ জন প্রধান শিক্ষকের (যারা মূলত নবম-দশম শ্রেণির গণিত বিষয়ে ক্লাস নেন) সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অতিরিক্ত ভিজিলেন্স টিম, সেই সঙ্গে এ বছর থেকে প্রথমে ৩০ নম্বরে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নে পরীক্ষা গ্রহণ ও পরে সাবজেক্টিভ প্রশ্নে পরীক্ষা গ্রহণ শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ভারসাম্যহীন করে তোলে।

কুমিল্লা জেলার স্বনামধন্য বিদ্যালয়ের অন্তত ১০ জন ইংরেজি শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বছর ইংরেজি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশির ভাগ প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। ইংরেজি গ্রামার চর্চা না করার কারণে তারা রচনা, প্যারাগ্রাফ, আবেদনপত্রসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে শব্দ গঠনজনিত ভুল করেছে। এ ছাড়া উত্তরপত্রে মুখস্থ কিংবা বানানো উত্তর দেয়ার প্রবণতা ছিল লক্ষণীয়।
এমন বিপর্যয় ঠেকাতে শিক্ষকরা জানান, প্রশ্নপত্রের কাঠামো, নম্বর বণ্টন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্খী-অভিভাবকদের সেতুবন্ধ তৈরি করতে হবে। অন্যথায় ফল বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব নয়।  

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের ফল
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীন ছয জেলা থেকে এবার মোট এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৭৯ জন। এর মধ্যে পাস করেছে ১ লাখ ৮ হাজার ১১ জন। পাসের হার শতকরা  ৫৯ দশমিক ০৩ ভাগ। এর মধ্যে ৮৩ হাজার ১০০ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছে ৪৯ হাজার ৪৫৬ জন। পাসের হার ৫৯.৫১ শতাংশ। আর ৯৯ হাজার ৮৭৯ জন ছাত্রীর মধ্যে ৫৮ হাজার ৫৫৫ জন পাস করেছে। পাসের হার ৫৮.৬৩ শতাংশ।  

এবার কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪ হাজার  ৪৫০ জন। এর মধ্যে ছাত্র ২ হাজার ৭৬৪ জন, ছাত্রী ২ হাজার ১৫৩ জন। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পয়েছে মোট ৪ হাজার ৩৩৮ জন;  ছাত্র ২ হাজার ২৮১ ও ছাত্রী ২ হাজার ৫৭ জন। মানবিক  বিভাগে জিপিএ-৫ পাওয়া ৩০ জনের মধ্যে  ছাত্র দুজন, আর ছাত্রী ২৮ জন। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে মোট  ৮২ জন। এর মধ্যে ছাত্র ১৪ জন, আর ছাত্রী ৬৮ জন।

(ঢাকাটাইমস/৪মে/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত