উন্নয়নশীল দেশ: তুরস্ককে যেমন দেখছি (১)

বাধ্যতামূলক চাকরি বীমা

রহমত উল্লাহ
 | প্রকাশিত : ১৬ মে ২০১৮, ২১:০০

ব্রিটিশ বেনিয়াদের শোষণকাল শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত বঙ্গ অঞ্চল যেমন ছিল সমৃদ্ধ তেমনি ছিল উন্নত। তবে ব্রিটিশদের ১৯০ বছরের অত্যাচার, শোষণ ও বিভাজন এবং পাকিস্তানিদের ২৫ বছরের ডাকাতির পর আমরা যে বাংলাদেশ পেয়েছি তা একদিকে যেমন ছিল তলাবিহীন, অন্যদিকে ভঙ্গুর। ফলে, শোষক পশ্চিমা বিশ্বের তৈরি করা মানদণ্ডে আমাদের একসময়ের সোনার বাংলা অনুন্নত তৃতীয় বিশ্বের তকমা পায়।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর এসে সেই শোষকদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার স্বীকৃতিপত্র দেওয়া হলো।

এখন এই স্বীকৃতিপত্র নিয়ে আমাদের আত্মতৃপ্তিতে ভুগলে চলবে না, বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের পথ খোঁজা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তুরস্কে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে অবস্থানের অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরতে চাই। আশা করি উন্নয়নশীল দেশে হিসেবে তুরস্কের অর্জনগুলো বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা হতে পারে।

চাকরি বীমা

ব্যক্তিগত একটা অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করি। আমার বাবা একটি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ২০১১ সালের শেষ দিকে অবসরে যান। তখন পরিবারে আয়ের অন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। আমিও সদ্য মাস্টার্স শেষ করেছি। সাংবাদিকতার চাকরি নিয়েছি একটা পাক্ষিকে। কিন্তু বাড়ির খরচের যাবতীয় দায়িত্ব এসে পড়ে আমার কাঁধে। উপায়ন্তর না দেখে সাংবাদিকতার পাশাপাশি গবেষণাকে খণ্ডকালীন কাজ হিসেবে নিই। ২০১২-১৩ সালের প্রায় শেষ পর্যন্ত দৈনিক গড়ে ১৬ ঘণ্টা কাজ করেছি পরিবার দেখার জন্য। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে তুরস্কে এসে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বৃত্তির টাকায় পরিবার চালাতে হয়েছে। ২০১৭ সালে বাবা অবসর ভাতা উত্তোলনে সক্ষম হন। এ দীর্ঘ ৫ বছর তিনি যেমন মানসিকভাবে অস্থির ছিলেন তেমনি ছিলাম আমিও। বাবা অবসর ভাতা পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ওই টাকা মাসিক হিসেবে খরচ করলে আমাদের পরিবার চলবে মাত্র চার বছর। এরপর কী হবে?

এবার আসা যাক তুরস্কের অভিজ্ঞতায়

তুরস্কে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের কোনো ব্যক্তিকে কাজে নিতে হলে কর্মদাতা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষ থেকে ওই কর্মচারীর নামে বাধ্যতামূলক একটি বীমা খুলতে হয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কর্মচারীর বীমা বাবদ প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কোষাগারে জমা দিতে হয়। ওই ব্যক্তি যেখানে চাকরি করুন না কেন বা যতগুলো প্রতিষ্ঠানই পরিবর্তন করুন না কেন অবসর নেওয়া পর্যন্ত তার নামে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে (যখন যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন) বীমা অব্যাহত থাকবে। ৫৫-৬০ বছর বয়সে (কর্মক্ষেত্রভেদে) অবসর নেওয়ার পর তার ও স্ত্রীর মৃত্যু পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি বছরের সর্বনিম্ন বেতনের সমপরিমাণ বা তার চেয়েও বেশি (কর্মক্ষেত্র ও পদমর্যাদাভেদে) ভাতা (তুরস্কে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করে দেওয়া হয় এবং প্রতিবছর সমন্বয় করা হয়) দেয়া অব্যাহত থাকবে। তবে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে ৭০-৮০ শতাংশ হারে ভাতা দেয়া হয়।

যে ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির অধীনে নন, তিনিও নিজ উদ্যোগে বীমা করেন এবং উপরোল্লেখিত ভাতার সুযোগ অর্জন করেন।

এই চাকরি বীমা পদ্ধতি সরকারি ও বেসরকারি সব ধরনের কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক। এ ধরনের বীমা পদ্ধতির ফলে তুরস্কে বয়স্ক মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা অনেক বেশি। বর্তমান বাস্তবতায় উন্নয়নশীল বাংলাদেশ গঠনে সর্বস্তরে চাকরি বীমার প্রচলন প্রয়োজন। (কাল দ্বিতীয় কিস্তি)

লেখক: সাংবাদিক ও পিএইচডি শিক্ষার্থী, কারাদেনিজ টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ট্রাবজোন, তুরস্ক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

প্রবাসের খবর বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত