ডিসিসির উদাসীনতায় ক্যানসার, হাঁপানিতে মরছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা

রেজা করিম
 | প্রকাশিত : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১০:২৩

১৯৯৬ নাকি ৯৭ সালের কথা, সেটি স্মরণ নেই। সকালে মগবাজার এলাকায় সড়কের পাশে ময়লা-আবর্জনা সরাচ্ছিলেন ইসমাঈল হোসেন। পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায় দ্রুত গতির একটি বাস। ছিটকে পড়েন ফুটপাতে, প্রচ- আঘাতে মাথা ফেটে বের হতে থাকে রক্ত। আঘাত লাগে শরীরের আরও অনেক জায়গায়। প্রাণে বেঁচে গেলেও স্বাভাবিক চলার শক্তি হারিয়েছেন। এর মধ্যেই সংসার চালাতে আবর্জনা সরানোর কাজে নামতে হয় বর্তমানে ৫০ পার হওয়া মানুষটিকে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন তিনি।

নগর কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কেবল দুর্ঘটনা নয়, বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি তাদের বেশি। তবে এই তথ্যটি সেভাবে জানেন না যারা কাজ করতে আসেন তারা। আর ঝুঁকি ভাতা দূরের কথা, তাদের মজুরিও বেশ কম।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে নগরীতে প্রায় নয় হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকাতেই আছেন বেশি। সব মিলিয়ে সংখ্যাটি পাঁচ হাজার ২১৭। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে এদের সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের কিছু বেশি।

দুই নগর কর্তৃপক্ষ ছাড়াও সরকারি বিভিন্ন সংস্থা এবং হাসপাতাল মিলিয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যা এক লাখের বেশি বলে গবেষণায় দেখা গেছে। সারা দেশে এই সংখ্যা সাড়ে চার লাখের মতো।

সম্প্রতি পরিচ্ছন্নতাকর্র্মীদের স্বাস্থ্যগত দিক পর্যালোচনায় স্ক্যানিং প্রোগ্রামের আয়োজন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। সেখানে বের হয়ে আসে উদ্বেগজনক তথ্য। জানানো হয় ৭০ শতাংশ পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মৃত্যু হয় রোগে। এদের মধ্যে ২০ শতাংশের মৃত্যুর কারণ ক্যানসার, ২৩ শতাংশের হাঁপানি, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে ১০.৭৫ শতাংশ আর হৃদ্রোগে মৃত্যু হচ্ছে ১৮.৪৬ শতাংশের। স্বাভাবিক মৃত্যুর হার মাত্র ২৭.৭৬ শতাংশ।

নগর কর্তৃপক্ষের তথ্যই বলছে যথাযথ সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা না থাকাই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের এভাবে রোগে ভোগে মৃত্যুর জন্য দায়ী। বাসাবাড়ি থেকে গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনার শেষ ধাপ পর্যন্ত প্রতিটা ধাপেই যে ধরনের পোশাক, দস্তানা আর মুখোশ পরার কথা, সেটি তারা পরেন না। হ্যান্ডগ্লাভস বা দস্তানা এবং বুট জুতার মতো অতি অপরিহার্য সুরক্ষাব্যবস্থা নিতেও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দেখা যায় না। খালি হাত ও পায়েই দিন-রাত কাজ করছেন তারা।

আবার সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে (এসটিএস) আসার পরে ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব হলে বর্জ্য গলে একধরনের তরল বের হয়, যার কারণে হচ্ছে ক্যানসারের মতো রোগ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গৃহস্থালি বর্জ্যরে পাশাপাশি ইলেকট্রনিক, মেডিকেলসহ নানাবিধ বর্জ্যরে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা হয় না, এটাও নানা রোগের কারণ। ইলেকট্রনিক বর্জ্যরে মধ্যেই এক হাজারেরও বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে, যেগুলো ক্যানসার উৎপাদনের পাশাপাশি লিভার ও কিডনির রোগ সৃষ্টি করে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়টা হচ্ছে, এই এক হাজারের বেশি রাসায়নিক উপাদানের মধ্যে মাত্র ২০টির ধর্ম জানা সম্ভব হয়েছে। বাকিগুলো কতটুকু বা কী ক্ষতি করতে পারে, তা নিয়ে এখনো গবেষণাই হয়নি। ফলে সেগুলোর ক্ষতির ভয়াবহতা এখনো অজানাই রয়ে গেছে। অথচ এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে গিয়ে যতটুকু সুরক্ষা ও সতর্কতা দরকার, সেটা করা হচ্ছে না।

পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা গ্রাম-বাংলা উন্নয়ন কমিটির নির্বাহী পরিচালক এ কে এম মাকসুদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘যেকোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শ্রমিক নিয়োজিত করার ক্ষেত্রে তাদের পরিপূর্ণ সুরক্ষার জন্য সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো ঢাকার পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ন্যূনতম স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই। খালি হাত ও পায়ে সারা দিনমান কাজ করে তারা। এভাবে দায়িত্ব পালনকালে তারা যে কতটা স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তাও ঠিকভাবে তারা জানে না। তাদের দেখভালের দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদের এ বিষয়গুলোতে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।’

ঢাকা উত্তরের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ইসমাঈল হোসেন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘কামডা করতে ভালা লাগে। হেইডা কইরা নিজের প্যাট চালাই আবার মাইনষেরও উপকার হয়। হের লাইগা কামডা ভালোবাইসা করি।’

কাজে নিয়োগ করার সময় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জানানো হয় কি না, জানতে চাইলে ঢাকা উত্তরের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর আব্দুর রাজ্জাক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘কেকোনো রোগের ঝুঁকিতে পড়বে, এটা বলা যায় না। তারা সব জেনেবুঝেই এ কাজে আসে। আমরা তাদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার সুবিধাগুলো নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।’

ঢাকা দক্ষিণের অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যেভাবে কাজ করে, তাতে তাদের অসুস্থ হওয়াটাই স্বাভাবিক। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার দিকে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করা হয়। দায়িত্ব পালনকালে স্বাস্থ্য সুরক্ষার নানা সরঞ্জামও সরবরাহ করা হয়। ওদের স্বাস্থ্যের দিকে যথেষ্ট নজর দেওয়া হয়।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত