ঘোষণার বাস্তবায়ন নেই, নিত্য ভোগান্তিতে যাত্রীরা

কাজী রফিক
 | প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১৪:১৫

রাজধানীর কলাবাগান মাঠের পাশে লেখা ‘বাসস্টপ’। অথচ যাত্রীর দেখা নেই। বাসে ওঠার ভিড় তখন রাসেল স্কয়ার মোড়ে।
নির্ধারিত জায়গার বদলে এখানে কেন? অপেক্ষমাণ যাত্রী আরমান বলেন, ‘ওই জায়গায় ফাউ দাঁড়ায়া থাইকা লাভ কী? সবাই জানে ওই জাগায় বাস থামে না। এইখানে থামে, তাই এইখানে দাঁড়াইছি।’
আরমানের কথার সত্যতা পাওয়া গেল। আধা ঘণ্টার বেশি সময় কলাবাগানের এই বাসস্টপে অপেক্ষা করেও নির্ধারিত স্থানে বাস থামতে দেখা যায়নি।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের মুখে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, যেখানে-সেখানে বাস থামবে না। ১২১টি স্থান নির্ধারণ করা হবে। এর বাইরে কোনো যাত্রী উঠবে না, নামবেও না।

এ ধরনের ঘোষণা আগেও এসেছে, কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি। তবে গত আগস্টে ছাত্রদের তোলপাড় করা আন্দোলনের কারণে ভাবা হচ্ছিল, এবার বুঝি পরিস্থিতি পাল্টাবে। কিন্তু এবারও হয়নি।
নিয়মের ধার ধারছেন না গণপরিবহনের চালক, শ্রমিকেরা। পুলিশেরও নেই তৎপরতা। সার্জেন্টদের সামনেই রাস্তা আটকে দেন শ্রমিকরা। দায় নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

নগর পরিবহন মানেই এক হতাশার চিত্র। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায়, নোংরা পরিবেশ, যেখানে-সেখানে বাস দাঁড়ানো, সিটিং সার্ভিসেও দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলাসহ যত অব্যবস্থাপনা ছিল, তার বলতে গেলে কিছুই পাল্টায়নি গত আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের পরও। অথচ আন্দোলন থেমে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আর পুলিশের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছিল।

গত বছরের ৩১ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর চালকের শাস্তির দাবিতে রাস্তায় নামে শিক্ষার্থীরা। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলনের সময় উঠে আসে পরিবহনে বিশৃঙ্খলার নানা বিষয়। আর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৭ আগস্ট ১৭টি নির্দেশনা দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সংবাদ সম্মেলন করে নির্ধারিত স্থানে যাত্রী ওঠানামা, স্টপেজ ছাড়া বাকি সময় বাসের দরজা বন্ধ রাখা, লেন মেনে গাড়ি চালানোসহ নানা নির্দেশনা দেন।

যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়, তার মধ্যে মোটরসাইকেলে একজনের বেশি আরোহী না তোলা, হেলমেট ছাড়া জ্বালানি তেল না দেওয়ার মতো কিছু বিষয়ের বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে বাকিগুলোর ক্ষেত্রে আগের সেই হতাশাই বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে বাসে দৃশ্যমান জায়গায় বিআরটিএর ভাড়ার তালিকা টানিয়ে রাখার কথা। কিন্তু এর কোনোটাই মানা হচ্ছে না বাসে। সিটিং সার্ভিসের নামে পকেট কাটা চলছেই। পুরো বিষয়টি নিয়ে যারপরনাই হতাশ যাত্রীরা। পরিবহন বিশেষজ্ঞরাও দায়ী করছেন সরকারকে।

জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আসবে কীভাবে? এটা তো এনফোর্সমেন্টের বিষয়, তারাই গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনবে। কিন্তু সেই এনফোর্সমেন্টের ভেতরেই রয়েছে সমস্যা, তাহলে সমস্যা সমাধান হবে কীভাবে?’

‘এই যে সিটিং সার্ভিসের নীতিমালার বিষয়ে কমিটি করা হলো, সেখানে মালিকদের প্রতিনিধিই ছিল। আমাদের যাত্রীদের অধিকারের বিষয়ে কথা বলার মতো কোনো প্রতিনিধি ছিল না।’
নতুন সরকার গঠন করা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর ঘোষণা আছে উল্লেখ করে মোজাম্মেল বলেন, ‘আমরা আশা করছি, এই সরকার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়ে সারা দেশে গণপরিবহনে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিরসন করবে।’

এসব নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর কোনো বক্তব্যও নেই। সংস্থাটির মহাপরিচালক ও একাধিক পরিচালক এবং বিআরটিএর সচিবকে বারবার ফোন করলেও তারা কেউ ফোন ধরেননি।
যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা
পুলিশ যাত্রী ওঠানামার জন্য যে স্থানগুলো বেঁধে দিয়েছে তার ৪৬টি ঢাকা দক্ষিণ ট্রাফিক বিভাগের আওতায়। পশ্চিম বিভাগের অধীনে ৩২টি এবং উত্তর এবং পূর্ব ট্রাফিক বিভাগের আওতায় রয়েছে আরও ৪৩টি।
এর মধ্যে মতিঝিল, বাংলামোটর, শাহবাগ, পল্টন, কাকরাইল, ফার্মগেট, মালিবাগ, মগবাজার, রামপুরা, মুগদা, বাড্ডা, কমলাপুর, গুলিস্তান, মৌচাক, শান্তিনগর, সায়েন্স ল্যাব এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও নির্ধারিত স্থানে বাস থামছে না। আর ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছেন না।

বাংলামোটর মোড়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখা গেছে, শাহবাগ থেকে কারওয়ান বাজারমুখী বাসগুলো নির্দিষ্ট স্থানে থামছে না। তাই যাত্রীদের বাসে উঠতে হয় বাংলামোটর সিগন্যালে বাস থেমে থাকা অবস্থায়। আবার কোনো কোনো যাত্রীকে ওঠা-নামা করতে দেখা গেছে চলন্ত বাসে।

কারণ জানতে চাইলে দেলোয়ার নামের এক যাত্রী বলেন, ‘বাস তো থামে না। ওদের যখন দরকার হয় তখন যাত্রী তোলে। তাই আমাদের বাধ্য হয়ে চলন্ত বাসেই উঠতে হয়।’
পরিবহন-সংশ্লিষ্টদেরও আছে পাল্টা অভিযোগ। লাব্বাইক পরিবহনের চালকের সহকারী শরীফ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা বাসস্ট্যান্ডে থামি। যহন দেহি বাসে যাত্রী আছে, তহন মাঝেমধ্যে থামি না।’

নির্ধারিত স্থানে বাস না থামলেও সিগন্যাল এবং যেখানে যাত্রী বেশি এমন স্থানে হরহামেশা যাত্রী তুলতে দেখা যায় এই গণপরিবহনটিকে।
এমন একই চিত্র দেখা গেছে মিরপুর রোড, ধানমন্ডি, কলাবাগান, শাহবাগ, উত্তরাসহ রাজধানীজুড়ে। ফলে নির্ধারিত বাসস্টপ তৈরি কোনো কাজেই আসেনি বলে মন্তব্য করেছেন সাধারণ যাত্রীরা।

জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ ট্রাফিক পুলিশের উপকমিশনার এস এম মুরাদ আলী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘কিছু নির্ধারিত স্থানে বাস থামছে, সব জায়গায় নিয়ম মানছে এমনটা বলব না।...আমরা আগামীকাল (আজ) থেকে ১৫ দিনব্যাপী নতুন কর্মসূচি শুরু করছি। আমরা চেষ্টা করছি মানুষ যেন আইন মেনে রাস্তায় চলাচল করে। কিন্তু মানুষ তা মানতে চায় না।’

জানতে চাইলে নিজেদের দায় অস্বীকার করে যাত্রীদেরই দোষ দিলেন এয়ারপোর্ট থেকে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে চলাচলকারী পরিবহনের মালিক সমিতির নেতা বাবুল শেখ। তিনি বলেন, ‘যাত্রীদের মধ্যে যত্রতত্র বাসে ওঠা ও নামার প্রবণতা অনেক বেশি। যাত্রীরাই পরিবহন শ্রমিকদের নিয়ম ভাঙতে বাধ্য করেন।’
‘শতকরা ৯০ ভাগ যাত্রী চায় বাসায় গিয়ে নামতে। তারা বাসস্টপে নামবে না। যার যেখানে দরকার, সে সেখানে নামবে। বাস না থামালে ড্রাইভার-হেলপারদের গালাগাল করে। তাই ওরা বাধ্য হয়ে যাত্রী তোলে।’

ঢাকা পশ্চিমের ট্রাফিক পুলিশের উপকমিশনার লিটন কুমর সাহা বলেন, ‘আমরা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছি। তবে পুরোপুরি শৃঙ্খলায় এসেছে বলছি না। তবে আমরা একটি স্টপেজ থেকে অন্য স্টপেজ পর্যন্ত কোনো বাসের দরজা খোলা পেলেই মামলা দিচ্ছি। দরজা খোলা থাকলেই এরা যেখানে-সেখানে বাস দাঁড় করাচ্ছে, এই বিষয়টি আমরা দেখছি।’
যাত্রীদের পকেট কাটা চলছেই
সিটিং সার্ভিস, কম স্টপেজ সার্ভিস, ওয়েবিলসহ অভিনব সব কৌশলে যাত্রীদের পকেট কাটার পদ্ধতির চালু রয়েছে। কয়েকটি বাসে ভাড়ার তালিকা দেখা গেলেও সেটি চালকের সামনে এমন জায়গায় সাঁটানো আছে, যেটি যাত্রীদের চোখে পড়ার কথা নয়।

বড় বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া সাত টাকা আর ছোট বাসে পাঁচ টাকা হলেও রাজধানীতে ১০ টাকার নিচে ভাড়া নেই বললেই চলে। এ ক্ষেত্রে নতুন কৌশল চালু হয়েছে ওয়েবিল নামে। একটি ওয়েবিল থেকে আরেকটি ওয়েবিল পর্যন্ত কখনো কখনো ভাড়া হয় ২০ বা ৩০ টাকা। বলা হয়, এর মধ্যে অন্য কোথাও যাত্রী উঠবে না। কিন্তু কার্যত প্রতিটি স্টপেজেই দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা হয়। প্রায়ই ঠেসে, ফলে সিটিং সার্ভিস নামে প্রতারণাটি সামনে চলে আসে।

বাসে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য নয়টি সংরক্ষিত আসন থাকার কথা থাকলেও নগর পরিবহনে এসব আসন দেখা গেছে কমই। কেবল বড় বাসে থাকে আসনগুলো। মিনিবাসে চালকের সামনে দমবদ্ধ পরিবেশে চারটি আসনের ওপর ‘মহিলাদের বসার স্থান’ লেখা দেখা গেছে।
মেশকাত, স্বাধীন পরিবহন, লাব্বাইক, রজনীগন্ধা, মিডলাইনসহ প্রায় বাসেই দেখা গেছে, নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকা আসনে পুরুষ বসে আছেন এবং নারী যাত্রীরা দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করছেন।

রজনীগন্ধা পরিবহনের একজন বাসমালিক কাদির হোসেন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনে পুরুষ বসে থাকে। বললেও ওঠে না। যাত্রীদেরও এদিকে তাকাতে হবে। অনেক সময় হেলপাররাও একটু ঝামেলা করে। ওরা তো শিক্ষিত না।’
আরও যত বিশৃঙ্খলা
ফিটনেসহীন বাস চলবে না এমন ঘোষণা বারবার দেওয়া হলেও খালি চোখেই দেখা যায় লক্কড়ঝক্কড় বহু বাস চলছে শহরে।
আবার ছাত্র আন্দোলনের মুখে ঘোষণা ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে রাস্তা পারাপারের জন্য ট্রাফিক পুলিশ থাকবে। কিন্তু সেই পুলিশ সদস্যদের আর দেখা যায়নি।
অটোরিকশা মিটারে চলবে এই আশা কার্যত বাদ দিয়েছে নগরবাসী। অ্যাপভিত্তিক যাত্রী পরিবহন সেবা চালু হওয়ার পর অটোচালকরা কিছুটা চাপে থাকলেও তারা মিটারে আর যাত্রীর ইচ্ছামতো গন্তব্যে যান না।

হাতের সিগন্যালিংয়ের বদলে অটোমেটিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়ে বছর দুয়েক আগে পিছু হটা পুলিশ আর সেই পথে এগোয়নি।
পথচারীদেরও দায় আছে। ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও যেখান-সেখান দিয়ে রাস্তা পারাপারের প্রবণতার অবসান হয়নি। জিজ্ঞেস করলে পথচারীরা দেন ব্যস্ততার অজুহাত।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :