প্রকাশনায় সম্পাদনার গুরুত্ব

কামরুল হাসান শায়ক
 | প্রকাশিত : ০৬ জুন ২০১৯, ০৯:৩৮

‘সম্পাদনা’ ও ‘প্রকাশনা’ শব্দ দুটি একটি অপরটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রকাশিতব্য কন্টেন্টকে (পাণ্ডুলিপি) ত্রুটিমুক্ত ও পাঠযোগ্য করতে এবং এর নান্দনিকতা বাড়াতে সম্পাদনার বিকল্প নেই। তাই সম্পাদনার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ত্রুটিমুক্ত  লেখার প্রতি মানুষের আগ্রহ স্বভাবজাত। লেখা যত ত্রুটিমুক্ত হয়, তত পাঠযোগ্য হয়ে ওঠে এবং পাঠকপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।

 ‘প্রকাশনা’ শব্দটির পরিসর অনেক বড়। সেদিক থেকে সম্পাদনার পরিসরও অনেক বড়। এই প্রবন্ধে প্রকাশনা ও সম্পাদনাকে সংজ্ঞায়নের পাশাপাশি সম্পাদনায় কী কী সংশোধন করা যায়, সম্পাদকের কর্মপরিধি, কাজের বৈশিষ্ট্য এবং সম্পাদনা করার উপায় নিয়ে ছোট পরিসরে আলোচনা করা হবে।

প্রথমেই আসা যাক প্রকাশনার প্রসঙ্গে। ‘প্রকাশনা’ (Publication) শব্দটি এসেছে প্রকাশ (Publish) থেকে। এর ব্যুৎপত্তি হলো প্র + √কাশ্ + অচ্ = প্রকাশ + অন = প্রকাশন + আ = প্রকাশনা। ‘প্রকাশনা’ শব্দের অর্থ প্রকাশ করা, প্রকাশিত হওয়া, ব্যক্ত হওয়া, প্রস্ফুটিত হওয়া। অর্থাৎ প্রকাশনা বলতে পাঠ উপযোগী যেকোনো কিছু প্রকাশ করাকে বোঝায়। মূলত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে বই আর সংবাদ পরিবেশনাকে প্রকাশনা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও চলচ্চিত্র, নাটক, গান, পণ্যের বিজ্ঞাপন, পোস্টার, পণ্যের মোড়ক, লিফলেট, ফেস্টুন, ব্যানার সবকিছুই প্রকাশনার অন্তর্ভুক্ত। এগুলা প্রকাশের আগে, অর্থাৎ চূড়ান্তভাবে প্রকাশের আগেই নির্ভুল বা বিশুদ্ধতা যাচাই করে নিতে হয়।

সম্পাদনা (Editing) শব্দটি এসেছে সম্পাদন থেকে। ‘সম্পাদনা’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি এমন সম্ + √পদ্ + অনট্>অন = সম্পাদন + আ = সম্পাদনা। অর্থাৎ সংস্কৃত পদ্ ধাতুর আগে সংস্কৃত উপসর্গ সম্ ও পরে সংস্কৃত অনট্ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে হয়েছে সম্পাদন, যার অর্থ নির্বাহ, নিষ্পাদন, সম্পূর্ণকরণ এবং সম্পাদন শব্দের সঙ্গে আ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে হয়েছে সম্পাদনা, যার অর্থ সম্পাদকের কাজ, সম্পাদন করা, পরিমার্জন করা, সম্পূর্ণ করা, নির্বাহ করা। অর্থাৎ  সম্পাদনা মূলত যেকোনো বিষয়কে ত্রুটিমুক্ত, সৌন্দর্যমণ্ডিত ও পাঠকপ্রিয় করে প্রকাশ করা। লেখার বানান ও বাক্যগঠনের ভুল, ব্যবহৃত প্রচলিত কিন্তু ভুল বা অপ্রচলিত শব্দের সংশোধন, যতিচিহ্নের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাসহ চিত্র ও টেবিল বিন্যাস বা চিত্র ও ইলাস্ট্রেশনে সংশোধনীও সম্পাদনার অংশ।

সম্পাদনায় সাধারণত যেসব বিষয়ে কাজ করা হয় সেগুলো তালিকাভুক্ত করে নিম্নরূপে দেখানো যায়:

ভাষাগত ত্রুটি, ব্যাকরণগত ত্রুটি, বানান ও যতিচিহ্নের ত্রুটি এবং দ্ব্যর্থবোধকতা দূর করা;

নন-ফিকশনের ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল অসংগতি ও তথ্যগত ত্রুটি দূর করা; পাঠযোগ্যতা বৃদ্ধি করা;

কপিরাইট আইন লঙ্ঘিত হয় এমন কোনো বাক্য, শব্দ বা অনুচ্ছেদ লেখা হয়েছে কি না, যাচাই করে সংশোধন করা; বিষয়বস্তু ও স্টাইলে সাযুজ্য নিরূপণ করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংশোধন করা; লেখক ও প্রকাশকের অনুমতি সাপেক্ষে পাণ্ডুলিপির নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ বা বাক্য বাদ দেওয়া কিংবা পাণ্ডুলিপির কোনো অংশ একস্থান থেকে অন্যস্থানে স্থানান্তরিত করা; লেখক ও প্রকাশকের অনুমতি সাপেক্ষে পাণ্ডুলিপিতে প্রয়োজনীয় তথ্য সংযোজন করা; লেখার ক্রমনির্ধারণ করা এবং ক্রমে ভুল থাকলে তা সংশোধন করা; প্রিলিমস (বইয়ের প্রাথমিক পৃষ্ঠাসমূহ যেমন: শিরোনাম, লেখক ও প্রকাশকের নাম, প্রিন্টারস লাইন, উৎসর্গ, সূচিপত্র ইত্যাদিকে একত্রে প্রিলিমস বলে) ও কভারের খসড়া প্রস্তুত করা এবং নন-ফিকশন বইয়ের ক্ষেত্রে লেখককে এন্ড ম্যাটার (মেইন টেক্সটের পর বইয়ের অবশিষ্টাংশ যেমন: পরিশিষ্ট, প্রান্তটীকা, শব্দসংক্ষেপ, ফটোগ্রাফার ও ইলাস্ট্রেশনের জন্য কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন, টীকা, গ্রন্থপঞ্জি, নির্ঘণ্ট, মুদ্রণসংক্রান্ত তথ্য বা কলোফোন ইত্যাদিকে একত্রে এন্ড ম্যাটার বলে)  প্রস্তুতে সাহায্য করা; ডিজাইনার, ইলাস্ট্রেটর, টাইপসেটার এবং প্রিন্টারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া; লেখক কর্তৃক প্রদত্ত ইলাস্ট্রেশন, ছবি, টেবিল এবং চিত্র বাছাই করে নির্ধারিত স্থানে বিন্যাস করা কিংবা এ ব্যাপারে লেখককে সাহায্য করা;

প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ইলাস্ট্রেশন কোথায় বিন্যাস করতে হবে, তা খুঁজে বের করা এবং কীভাবে বা কার কাছ থেকে সংগ্রহ করা যাবে, সে ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া।

সুতরাং উপর্যুক্ত বিষয় থেকে স্পষ্ট যে, শুধু বানান বিশুদ্ধ করা এবং যতিচিহ্নের শুদ্ধ ব্যবহার নিশ্চিত করাই সম্পাদনার একমাত্র কাজ নয়, বরং পুরো বইয়ের, সার্বিক অর্থে প্রতিটা প্রকাশনায় নান্দনিকতা এবং শুদ্ধতা রক্ষায় সম্পাদনার বিকল্প নেই। তবে মজার ব্যাপার হলেও সত্য, ভিক্টর গোলাঞ্জ নামক এক ইংরেজ প্রকাশক সম্পাদনার ব্যাপারে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সম্পাদনা তুলনামূলক নতুন একটা বিষয় আর এটা শুধু গদ্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।’ এরপর তিনি লিখেছেন, ‘একজন গীতিকারের সম্পাদিত গীতির কথা চিন্তা করেন কিংবা এমন একজন চিত্রব্যবসায়ী যিনি সম্পাদনা করে চিত্রকর দিয়ে আঁকিয়ে নিলেন, এমন চিত্রের কথা ভাবেন!... আমি যদি লেখক হতাম, আমি আমার লেখায় অন্যকে হাত দিতে দেওয়ার চেয়ে মরে যাওয়া শ্রেয় মনে করতাম।’ ভিক্টর গোলাঞ্জ একেবারে ভুল বলেননি। তিনি সম্পাদনার বিপক্ষে না, তবে অতিসম্পাদনার পক্ষেও নন। তিনি সুন্দরভাবে সম্পাদনা সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, সম্পাদনা কখনো কখনো শিল্পকর্মের শৈল্পিক গুণকে নষ্ট করে দেয়। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বিখ্যাত ইংরেজ কবি টি এস এলিয়ট তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’ লেখার পর সম্পাদনার জন্য অগ্রজ কবি, সমালোচক ও সম্পাদক এজরা পাউন্ডের কাছে পাঠিয়েছিলেন। এজরা পাউন্ড কবিতাটির একটা বড় অংশ ফেলে দিয়েছিলেন। পরে এলিয়ট মনঃক্ষুণ্ন হলেও এই সম্পাদিত কবিতাটি বিশ্বপাঠক ও নোবেল প্রাইজ কমিটির নজর কেড়েছিল, এমনকি ১৯৪৮ সালে এই কবিতা রচনার জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান এবং এখনো এটি আধুনিককালের অন্যতম কবিতা হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই কবিতা থেকে শুরু করে সব ধরনের লেখাই সম্পাদিত হলে সেটা বস্তুনিষ্ঠ হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে পাঠযোগ্য।

এখন কম্পিউটারের যুগ, ডিজিটাল যুগ। এখন আর আগের মতো কাগজে-কলমে সম্পাদনা খুব একটা করা হয়ে ওঠে না, যদিও কাগজে-কলমে সম্পাদনার প্রচলন একেবারে উঠে যায়নি। তবে কাগজে সম্পাদনা করলেও সেটার ডিজিটাল ভার্সনে কম্পিউটারে ইনপুট দিতে হয়। এজন্য সম্পাদনা কাজকে সুন্দর ও সার্থকভাবে সম্পন্ন করতে একজন সম্পাদকের যেসব দক্ষতা থাকা প্রয়োজন সেগুলো হলো:

ক. কম্পিউটারে কাজ করতে পারা; খ. ভাষার ওপর দখল; গ. সময়সীমার মধ্যে সম্পাদনার কাজ সম্পন্ন করতে পারা; ঘ. যুক্তিনির্ভর মন-মানসিকতার অধিকারী; ঙ.    প্রিন্ট, উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখা; চ.  ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় দক্ষ।

সম্পাদনার বিভিন্ন দিক ও উপায় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বলা যায়, মূলত ইলেকট্রনিক উপায়ে এবং কাগজে সম্পাদনার নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। ইলেকট্রনিক সম্পাদনার ক্ষেত্রে সম্পাদনায় হাত দেওয়ার আগে প্রতিটি স্তরের উল্লেখযোগ্য সংস্করণের আলাদা আলাদা কপি সংরক্ষণ করে রাখতে হয়। লেখকের মূল বা অসম্পাদিত পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ তো করতেই হয়, সেই সঙ্গে সম্পাদনা প্রক্রিয়ার প্রতিটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যাক-আপ ফাইল হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। কাগজে সম্পাদনা করলেও যতবার সম্পাদনা করা হয়, ততবারই আগের কপি সংরক্ষণ করতে হয় এবং চূড়ান্ত কপি ইলেকট্র্রনিক ফাইলে ইনপুট দিয়ে প্রকাশের জন্য আউটপুট দিতে হয়। সম্পাদনার ক্ষেত্রে বইয়ের প্রিলিমস বা প্রারম্ভিক অংশ থেকে শুরু করে পাণ্ডুলিপির প্রতিটি অধ্যায় বা শিরোনাম, উপশিরোনাম, অনুচ্ছেদ, ক্রস রেফারেন্স, উদ্ধৃতি, নোট বা টীকা, টেবিল, গ্রন্থপঞ্জি, চিত্রকর্ম, সূচিপত্র প্রতিটি অংশ ধরে ধরে যাচাই করে সম্পাদনা করতে হয়। সম্পাদনার সময় তথ্যে কোনো অসংগতি পেলে তা লিখিত আকারে বা মৌখিকভাবে লেখককে জানাতে হয়। লেখক যদি লিখিত বাক্য বা বক্তব্যের সুষ্ঠু ব্যাখ্যা দিতে পারেন, তবে সেটাই বহাল রাখতে হয় এবং যদি সে ভুল বা সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন, তবে তাঁর অনুমতি সাপেক্ষে সংশোধন করতে হয়। চূড়ান্ত কপি লেখকের অনুমতির জন্য পাঠানো হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়াটার একমাত্র লক্ষ্য হলো ত্রুটিমুক্ত একটি গ্রন্থ কিংবা প্রকাশনা পাঠককে উপহার দেওয়া, পাঠকের সামনে হাজির করা। প্রকাশনায় সময় অত্যন্ত মূল্যবান। প্রকাশক একটি বই সম্পাদনার জন্য যে সময় নির্ধারণ করে দেবেন সম্পাদককে সে সময়ের মধ্যেই বইটির সম্পাদনাকর্ম সম্পন্ন করতে হবে। বিশেষ করে একাডেমিক বই প্রকাশের সঙ্গে সময়ের যোগ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কোনোভাবে সময় পার হয়ে গেলে প্রকাশককে লোকসান গুনতে হয়। তাই এ ক্ষেত্রে সম্পাদককে যেকোনোভাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তাঁর কাজ শেষ করতে হবে। পত্রপত্রিকার লেখাতেও এ ধরনের সম্পাদনা করা হয়ে থাকে। আর পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার, পণ্যের বিজ্ঞাপন এবং মোড়কে যেহেতু কম লেখা থাকে, সেখানে সম্পাদনায় কম সময় ব্যয় হয়। অবশ্য এসব ক্ষেত্রে শিল্প-সম্পাদনার গুরুত্ব বেশি। এছাড়া নাটক, চলচ্চিত্র, মিউজিক ভিডিওসহ ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অন্যান্য বিষয়ে দর্শকনন্দিত, নান্দনিক এবং শিল্পসফল করার ক্ষেত্রে সম্পাদনার যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।

এ কথা সন্দিহানভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশের প্রকাশনা জগৎ আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে, অনেক এগিয়েছে। মানসম্মত বিশুদ্ধ প্রকাশনার প্রতি প্রকাশক-পাঠক উভয়ের সচতেনতা এবং আগ্রহ বেড়েছে। প্রায় সব বড় প্রকাশনা সংস্থাই ক্রমান্বয়ে নিজস্ব সম্পাদনা পর্ষদ গড়ে তুলছে। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোও পেশাজীবী সম্পাদকদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ভালো মানের বই প্রকাশ করছে। সংখ্যায় অপ্রতুল হলেও এ দেশে পেশাজীবী সম্পাদক রয়েছেন, যারা শুধু সম্পাদনার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুদ্রণ ও প্রকাশনার ওপর বিভাগ খোলা হয়েছে, এখান থেকেও অনেক দক্ষ সম্পাদক বেরিয়ে আসবেন। সর্বোপরি, সম্পাদনার গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এই বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।

লেখক: প্রকাশনা বিশেষজ্ঞ ও প্রকাশক, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড

সংবাদটি শেয়ার করুন

গণমাধ্যম বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :