জয়নালের ফাইনাল

অয়েজুল হক
| আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৯, ২১:৫৮ | প্রকাশিত : ১৫ জুলাই ২০১৯, ২১:৫৬
ফাইল ছবি

বিশ্বকাপের ফাইনাল। হেরে হেরে বাদ পড়া দলগুলো টোপলা গুছিয়ে বাড়ি ফিরেছে। বাংলাদেশ বাদ পড়ায় ব্যাথাতুর মারুফ। ব্যাথা নিয়ে কিছুদিন ঘোরাফেরা। বাংলাদেশ বিদায়ের পর প্রথম দিন সাত সকালে একঝাঁক বেদনা বুকে নিয়ে অফিসে আসা। গোলেবাহারের সাথে সবার আগে দেখা হয় মারুফের। দেখার সাথে কথা।

- স্যার ভালো আছেন?

 - না। মন খারাপ। হেরে গেলাম।

গোলেবাহার মুখ বাকিয়ে প্রশ্ন করে, কী হেরে গেলেন স্যার!

-খেলায়। বাংলাদেশ হেরে গেল।

‘আচ্ছা।’ গোলেবাহার মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিতে দেরি করে না। একটু বাদেই বলে, স্যার খেলা ফেলা বাদ দেন। বয়স হয়ে যাচ্ছে, এখন একটা বিয়ে করে ফেলেন। দেখবেন মন একেবারে ফুরফুরে হয়ে গেছে।

মারুফ সায় দেয়, হুম। বয়স হয়ে যাচ্ছে। আমার জন্য একটা ভালো মেয়ে দেখবেন তো।

মারুফের কথা শুনেই ষাটোর্ধ্ব মহিলা মুখখানি ব্যাকাচ্যাকা করে বলে, ভালো মেয়ে কি আর দুনিয়ায় আছে স্যার! ভাবখানা এমন যেন তিনিই দুনিয়ায় একমাত্র ভালো। বয়স একটু বেশি এই যা। মারুফ চুপ করে থাকে। একটু পরেই রফিক সাহেব প্রবেশ করেন। গোলেবাহার প্রফুল্ল গলায় বলে ওঠে, মারুফ স্যারের জন্য একটা ভালো মেয়ে পাওয়া যায় কি না দেখেন তো।

 রফিক সাহেব ফ্যাসফেসে গলায় বলেন, আমি আছি তো।

মারুফ হা হয়ে যায়। বলে কী! ‘ আপনি আছেন?’

-হ্যাঁ। আমি পুরোপুরি রাজি।

 গোলেবাহার হি হি খিলখিল করে হাসতে হাসতে গুটিয়ে লুটিয়ে পড়ে। ‘ দুজন কে দারুণ মানাবে। ’ গোলেবাহারের কথায় রফিক সাহেব বিষয়টা বুঝে লজ্জিত লাল মুখে বলেন, কাল অনেক রাত পর্যন্ত খেলা দেখেছি তো! মন খারাপ। ভাবলাম....

অনেক রাত পর্যন্ত খেলা দেখলে যেন সকাল বেলা ছেলে থেকে মেয়ে হয়ে যেতে হয়? মারুফ বলতে গিয়েও বলে না। একই রকম কাণ্ড ঘটেছিল প্রথম ম্যাচ জেতার পর। আনন্দে আত্মহারা হয়ে জলিল চাচাকে ইনবক্সে লিখে ফেলে-আই লাভ ইউ। জলিল সাহেব রেগে মেগে অস্থির। এই ব্যাটা ছাগল, আমি কি মাইয়া মানুষ আমারে আই লাভ ইউ লেখিস। তাকে কোনোভাবেই বোঝানো যায়নি- সবাইকে আই লাভ ইউ বলা যায়। যতো বোঝাতে যায় ততোই রাগ ক্ষোভ বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশ হেরে যাওয়ায় আনন্দে কিছুটা ভাটা পড়লেও ফাইলানে বেশ জমকালো আয়োজন। সবাই মিলে খেলা দেখা খাওয়া দাওয়া হবে। ছোটখাট পিকনিক। বিশ্বকাপ ফাইনাল বলে কথা। কে জেতে কে হারে! কে হয় বিশ্ব চ্যম্পিয়ন! যে যার মতো  আনন্দ করছে।

অফিস থেকে ফিরে প্রতিদিনের মতো আজও মোড়ে গিয়ে উপস্থিত হয় মারুফ। প্রজেক্টরের বড় পর্দায় খেলা দেখার মজাটা ভিন্ন। অনেক মানুষ। জয়নাল বেশ লাফাচ্ছে। খেলা হলেই বাজি ধরে। সারাদিন রিকশা চালিয়ে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে চার দোকানের মোড়ে তার সরব উপস্থিতি। নুন আনতে পান্তা পুরায়। বউ বেচারি বাড়ি বাড়ি কেঁদে বেড়ায়। ছোট ছেলেটা অসুখ বিসুখে কাহিল হয়ে মরণাপন্ন হলেও জয়নালের বাজি ধরার সাধ মেটে না। আজ সে নিউজিল্যান্ডের পক্ষে। ভারত অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে বাজি ধরে দু’বার হেরেছিল। আজ বড় আশায় আবার বাজি ধরেছে। নিউজল্যান্ড নিউজল্যান্ড করছে। এ জুয়াড়ি গুলোর আসলে খেলার প্রতি প্রেম নেই। এসেই প্রশ্ন করে, বাজির রেট কতো?

- একে সাত। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক টাকা ধরলে জিতলে সাত পাবা। হারলে এক দিবা।

 -ঠিক আছে আজ ইনকাম দুশো জিতলে কতো পাবো?

 -চৌদ্দশো। জয়নালের মুখে হাসির আভা। খেলা চলে রাত বাড়ে। নিউজিল্যান্ডের খেলার শুরুটা ভালো হয় না। ওপেনিং জুটি থেকে শুরু করে মিডিল অর্ডারে খেলতে নামা প্লেয়ারগুলো খেলতে গিয়ে যেন হাঁপিয়ে ওঠে। জয়নালের চিৎকার বাড়ে। আজিজুর বলে ওঠে, শীতে খেলতে পারছে না। দেখেন না প্লেয়ার গুলো কতোগুলো জামা কাপড় গায়ে দিয়ে কাঁপছে। খেলবে কেমনে! জয়নাল বুকের খুশি চেপে রেখে খোশ মেজাজে বলে, আচ্ছা এরা খালি গায়ে আইসক্রিম ফ্যাক্টরির বড় ম্যাশিনের ভেতর প্রতিদিন আধাঘণ্টা বসে থাকলে কি এই শীতে কিছু হইতো! পাশ থেকে একজন বলে ওঠে, সে বুদ্ধি তো থাকতে হবে। কড়ি কড়ি টাকা খরচ করে এরা কী সব কোচ ফোচ রাখে বুঝি না।

সময়ের সাথে খেলাটা জমে ওঠে। একবার জয়নাল লাফ তো একবার আজিজুর। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। জয়নাল নামক মানুষগুলোর হুস, হাস, চিৎকারে অসুস্থ হয়ে ওঠে পরিবেশ। আউট হওয়ার সাথে সাথে লাফ দিয়ে তিন হত উপরে উঠে যাচ্ছে কয়েকজন। চার ছক্কা হাঁকালে ধারাভাষ্যকারের আগেই তারিক চিৎকার করে বলছে, দ্যাটস ফোর। ভেরি ভেরি গুড শট।

রাত এগারটার দিকে খেলার চরম গরম মুহূর্তে জয়নালের মোবাইলটা বেজে ওঠে। অনেক শব্দে কথা শুনতে পারবে না বলে লাউড স্পিকার চালু করে। ওর বউয়ের ক্যাকানো কণ্ঠ শোনা যায়, তোমার ছেলের জ্বর। গা পুড়ে যাচ্ছে। ধুর, রাখোতো। আমারো জ্বর, গা পুড়ে যাচ্ছে।

জয়নাল মোবাইল কেটে দেয়। শেষ দিকে জুয়াড়িদের গলায় ভিন্ন ভিন্ন সুর। কেউ আশাহত, কেউ উৎফুল্ল। দ্বিতীয়ার্ধে সময়ের সাথে সাথে স্নায়ুচাপ বাড়তে থাকে। এই হারে, এই যেতে। সুপার ওভারের শেষ বলে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে জেতার শেষ স্বপ্নটুকু বিনাশ হয়। শেষ হয় খেলা, দুটো হাতে মাথা চেপে ধরে জয়নাল। ভাঙাচোরা মন নিয়ে একটু ফাঁকা জায়গায় এসে দাঁড়ায়। চোখ বেয়ে অশ্রু গড়ায়। মারুফ বেশ আগে থেকেই জয়নালকে ফলো করছিল। বেচারার কান্না দেখে মায়া হয়। মারুফ এগিয়ে যায়, কিরে কাঁদিস কেন? টাকা গেছে?

-না, সেজন্য না।

-তা কী জন্য কাঁদিস?

-মারুফ ভাই, আমার অবস্থাও আমার টিমের মতো। যে টিম নেই সেইডাই হারে। বহুদিন জিতি না। মনের দুঃখে কান্দি।

মারুফের ইচ্ছা করে, ওর দু’ গালে দুটো থাপ্পড় কষে দিতে। পাশে ওষুধের দোকান থেকে একটা জ্বরের সিরাপ কিনে বদটার হাতে দিয়ে বলে, নে ধর। জয়লান অবাক হয়, কাঁপাকাঁপা হাতে ধরে। আপনি আমার ছেলের জন্য!

খেলা শেষ হবার পর মানুষ খাওয়া দাওয়ায় মশগুল। নিউজিল্যান্ডের ভক্তরা আশাহত হয়ে চলে গেছে। তাদের চলে যাবার কারণে ড্যাগভর্তি খাবার অসহায়ের মতো ড্যাগের ভেতর পড়া। সবকিছুতে কেমন দুঃখী দুঃখী ভাব। ভাগ্যিস ভাত কথা বলতে পারে না। মারুফ ড্যাগ থেকে কিছু খাবার জয়নালের হাতে দিয়ে বলে, বাড়ি যা।

জয়নাল ওষুধ আর খাবার হাতে নিয়ে বলে, সামনের টুর্নামেন্ট আবার কবে ভাই? এমনিতেই জয়নালের আচরণে বুকের ভেতর চাপা কষ্ট। মারুফের আর সহ্য হয় না, ফাইনালি জয়নালের মুখের ওপর বিরাট এক থাপ্পড় কষে দেয়। লালু মুখে হাত চেপে তাকাতেই মারুফ চিৎকার করে বলে, যা ভাগ। জয়নাল কথা না বলে চলে যায়।

লেখক: গল্পকার

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :