বিশ্ব নদী দিবস ও বাংলাদেশের চিত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:১৩ | প্রকাশিত : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:১৪
বাংলাদেশে নদীদূষণের একটি চিত্র।

আজ ‘বিশ্ব নদী দিবস’। নদী রক্ষায় সচেতনতা বাড়তে প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের চতুর্থ রবিবার বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো- ‘নদী একটি জীবন্ত সত্তা, এর আইনি অধিকার নিশ্চিত করুন।’

‘বিশ্ব নদী দিবস’ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো প্রতিবারের মতো এবারও নদীর দিকে পদযাত্রা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

বাংলাদেশ পরিবেশবাদী আন্দোলন (বাপা) জানায়, দিবসটি উদযাপনের অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের পাশ থেকে বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা পদযাত্রা কর্মসূচি রয়েছে। ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার, বেলুন, ফুল প্রভৃতি নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় সদরঘাট টার্মিনালে গিয়ে এই পদযাত্রা শেষ হবে।

১৯৮০ সালে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া রাজ্যে শিক্ষক ও নদীপ্রেমিক মার্ক অ্যাঞ্জেলোর উদ্যোগে সেপ্টেম্বর মাসের চতুর্থ রবিবার দিবসটি পালনের সূচনা হয়। পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় তা ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৫ সালে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে দিবসটি সমর্থন করা হয়। বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে নদী দিবস পালন শুরু করা হয়।

নদীর পারেই তো একসময় গড়ে উঠেছে পৃথিবীর বড় বড় শহর, গড়ে উঠেছে মানুষের নানা সভ্যতা আর সংস্কৃতি। নদী ও মানুষের জীবন যেন অবিচ্ছেদ্য। বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটু বেশিই সম্পর্কিত। আমাদের মৃতপ্রায় নদী নিয়ে তাই প্রায়ই পরিবেশবাদীসহ সাধারণ মানুষের যত উদ্বেগ। অথচ ঢাকাসহ দেশের বেশিরভাগ নদ-নদী এখন দখলদারদের কবলে। ভয়ানক দূষণের শিকার প্রতিটি নদী। নানা কারণে মরতে বসেছে দেশের নদ-নদী। পাথর ও বালু উত্তোলনের কারণে অনেক নদী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সরকারি হিসাবে নদী দখলের সঙ্গে প্রায় ৪৭ হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জড়িত। যদিও বাস্তবে এ সংখ্যা লক্ষাধিক।

দখলবাজরা পানি প্রবাহে বাধা দিয়ে করছে মাছ চাষ। তারা দখল করেছে নদীর দুই পাড়। এমনকি প্রবহমান নদীর পানিতে বাঁশ-কাঠের মাচা তুলে বানিয়েছে ঘরবাড়ি-দোকানপাট।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার টঙ্গী থেকে সদরঘাট হয়ে ডেমরার সুলতানা কামাল ব্রিজ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদ দূষণে জড়িত ১২০ প্রতিষ্ঠান। নারায়ণগঞ্জে নদী দূষণের তালিকায় রয়েছে ৭৪টি প্রতিষ্ঠান।

এদিকে দূষণকারীদের মধ্যে একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা ওয়াসা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন নদীতে ২২৫ কোটি লিটার পয়ঃবর্জ্য ফেলছে ঢাকা ওয়াসা।

নদী ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা বলেছেন, বাস্তবে ঢাকার চারপাশের চার নদী এবং নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর অবস্থা আরও করুণ। আর সারা দেশে দূষণের চিত্র ভয়ঙ্কর ও চরম উদ্বেগজনক।

১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের হালনাগাদ করা তথ্য অনুযায়ী- ৬২ জেলায় নদী দখলবাজের সংখ্যা ৪৬ হাজার ৮৩৯ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দখলবাজ কুমিল্লা জেলায়। এর সংখ্যা ৫৯০৬ জন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে নোয়াখালী ও কুষ্টিয়া। এর সংখ্যা যথাক্রমে ৪৪৯৯ ও ৩১৩৪ জন। ঢাকায় এ সংখ্যা ৯৫৯ জন।

এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার নদীর সীমানা নির্ধারণের পাশাপাশি সারা দেশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান জোরদার করেছে। একই সঙ্গে আবহমান বাংলার চিরায়ত নদীকে স্বরূপে ফেরানোর লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সে লক্ষ্যে গত ২৯ জানুয়ারি থেকে বুড়িগঙ্গার তীরে সরকারের উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। চিহ্নিত করা ৯০৬টি অবৈধ স্থাপনার বেশির ভাগই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযান চলবে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এবারের অভিযানের চরিত্র আগের অভিযানগুলো থেকে আলাদা। অনেক হোমরাচোমরা ব্যক্তির স্থাপনা, এমনকি সরকারি স্থাপনাও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। স্থাপনার ভাঙা অংশ, রাবিশ ইত্যাদি একই সঙ্গে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। একইভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে কর্ণফুলী নদীর দুই তীরেও। ফলে এবারের অভিযানকে নদী দখলের বিরুদ্ধে একটি কঠোর বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দখলমুক্ত করার পরপরই নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, ওয়াকওয়ে নির্মাণ, বনায়নসহ নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে আবার নদী দখলের সুযোগ না থাকে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের দুই পাশে ১৬ হাজার ২২৫টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এর মধ্যে পাকা ২ হাজার ৫৭৭টি, আধাপাকা ১ হাজার ৬৯৬টি ও অন্যসব স্থাপনা ১১ হাজার ৯৫২টি। উদ্ধার হওয়া তীরভূমি ও জায়গার পরিমাণ ৬০১ দশমিক ৩২ একর। উচ্ছেদ চালানোর সময়ে ঢাকা নদী বন্দরে ৪১ লাখ ২৪ হাজার ৫০০ টাকা এবং নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরে ২১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে চলতি বছরে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে ৩ হাজার ২০০ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও ৯১ একর ভূমি উদ্ধার করা হয়।

এদিকে নৌ পরিবহরন মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে নদীকে স্বরূপে ফেরাতে কর্মপরিকল্পনার মধ্যে আট ধরনের পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সারা দেশের পানিসম্পদের সদ্ব্যবহার, নদ-নদী দূষণরোধে ও রক্ষায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত এবং পাঠ্যপুস্তকে নির্দিষ্ট কারিকুলাম সংযোজন করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর ভবিষ্যতে নদীর জায়গা বেদখল হওয়া বন্ধে জনগণকে সম্পৃক্ত করা, জমি ক্রয়ের আগে কোনো নদীর অংশ কি না তা উল্লেখ করতে আইনের ধারা সংযুক্ত করা, আবর্জনা যথাস্থানে ফেলতে বাক্স বা ঝুড়ি সংরক্ষণ এবং নদীতে বিষাক্ত বর্জ্য, নির্গত আবর্জনা ও ময়লা ফেলা বন্ধে প্রচারপত্র বিলির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নদীর বর্জ্য উত্তোলনের জন্য বর্জ্য উত্তোলন উপযোগী জাহাজ কেনার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, সারা দেশের নদ-নদী দখলমুক্ত করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এ তালিকা ধরে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।

ঢাকাটাইমস/২২সেপ্টেম্বর/ইএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :