প্রস্তুতি ছাড়াই আইন নিয়ে সড়কে

নজরুল ইসলাম, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০৩ নভেম্বর ২০১৯, ১১:১০

পাস হওয়ার প্রায় ১৪ মাস পর বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন ১ নভেম্বর চালু করেছে সরকার। কিন্তু এটি কার্যকর করার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মাঝে কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়নি। যাদের বিরুদ্ধে এই আইনের বিধান কার্যকর হবে তাদের কেউ অবগত নয় শাস্তি সম্পর্কে। অর্থাৎ প্রয়োগের আগে এক রকম প্রস্তুতি ছাড়াই আইনটি সরাসরি মাঠে নিয়ে আসা হয়েছে।

এমনকি যারা আইনটি প্রয়োগ করবেন, ট্রাফিক পুলিশের অনেকেই এখনো আইনটি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। এই আইনের বিধি-বিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই বেশির ভাগ চালক-পথচারীরও।

আইন কার্যকরের প্রথম দিনের মতো গতকাল দ্বিতীয় দিনেও সড়কে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। আগের মতো নানা অনিয়ম চোখে পড়েছে। এ অবস্থায় আইনের পূর্ণ বাস্তবায়নে আরও সময় নেওয়ার কথা বলছে ট্রাফিক পুলিশ।

নতুন আইনে দেখা যায়, জেল-জরিমানার পরিমাণ বেড়েছে আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। বৃদ্ধির পরিমাণটা কত- যত্রতত্র রাস্তা পারাপারের জন্য জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে ১০ হাজার টাকা। বাসের সংরক্ষিত আসনে বসা নিয়েও আছে বড় দ-। চালকের লাইসেন্স থেকে শুরু করে, গাড়ির গতিসীমার ওপরও বাড়ানো হয়েছে সাজা ও দণ্ডের পরিমাণ। কিন্তু এসব দণ্ডের বিষয়ে এখনো জানে না পথচারী, যাত্রী কিংবা বাসের চালক ও সহকারীরা।

এ ব্যাপারে আগামী সাত দিন প্রচারণা চালানো হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আইন কার্যকরে দ্বিতীয় শনিবার নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের জানান, নতুন আইনে প্রথম সাত দিন কোনো মামলা না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আইন কার্যকরের প্রথম দুই দিন সরেজমিনে দেখা গেছে, হেলমেট ছাড়া বাইক চালানো, বাস-সিএনজির সামনে দিয়ে রাস্তা পারাপার, পুলিশ সদস্যের উল্টো পথে বাইক চালানো, পথচারীদের জেব্রা ক্রসিং বাদ দিয়ে এলোমেলোভাবে রাস্তা পারাপার, ড্রাইভিং অবস্থায় মোবাইলে কথা বলা- এ ধরনের দণ্ডযোগ্য দৃশ্য দেখা গেছে। কিন্তু সড়কে পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ থাকলেও এগুলোর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ চোখে পড়েনি।

এদিকে নতুন সড়ক পরিবহন আইনকে স্বাগত জানালেও আইনটির কয়েকটি ধারা সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন পরিবহন মালিকরা।

নতুন আইন নিয়ে চালক ও যাত্রীদের বক্তব্যে মিলেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। শাস্তি কমানোর দাবি করছেন চালকরা।

কারওয়ান বাজার ও সার্ক ফোয়ারা মোড়ের পুলিশ বক্সের সামনে বাসের অপেক্ষায় থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নাজমুল হাসান বলেন, ‘নতুন করে যে সড়ক আইন কার্যকর করা হয়েছে, এটা খুব ভালো উদ্যোগ। তবে এটা কার্যকর করার আগে যাদের জন্য এটা তাদের সচেতন না করে এটা কার্যকর করা ঠিক হয়নি।’

সেখানে কথা হয় এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। নাঈম নামের এই শিক্ষার্থীর ভাষ্য, নতুন আইন বাস্তবায়নের আগে সচেতনতাও তৈরি করা জরুরি। যেন আইনের শাস্তির পরিমাণটা কী সেটা সবাই জানতে পারে।

তবে মিনহাজুল আবেদিনের ভাষ্য, আইন সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত গণমাধ্যমে পড়েছেন। উচ্চ জরিমানার কারণে আইনটি মানা বা সরকারের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন তিনি। 

কারওয়ান বাজার সার্ক ফোয়ারা মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট জলিল আহমেদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘নতুন করে কোনো কিছু বাস্তবায়ন করতে গেলে একটু সময় তো লাগবেই। বললেই সেটা কার্যকর করা সম্ভব না। আইনটি সম্পর্কে এখনও অনেকেই অবগত নন। আগে সবাইকে এটা জানাতে হবে।’

আইন কার্যকর হওয়ার আগে সেটার প্রচার না হওয়ার বিষয়ে আপত্তি থাকলেও পরিবহন চালক ও তাদের সহকারীরা বলছেন, আইনের ধারায় আরও পরিবর্তন আনতে হবে। অন্যথায় পরিবহন চালক সঙ্কট বাড়িয়ে তুলবে।

নতুন সড়ক পরিবহন আইন সম্পর্কে মিরপুর-গুলিস্তানগামী বাসের চালক রহমত উল্লাহ জানেন না কিছু। ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এমন কিছু শুনিনি।’ তবে তার দাবি- ‘আইন হলে মানতে আমরা রাজি আছি। সেটা লেন হোক আর লাইসেন্সের বিষয়ে হোক। কিন্তু সড়কে যখন সাধারণ মানুষ পার হয় কেউ জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করে না। ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে পার হয় না। মোবাইল ফোন কানে নিয়ে, বাজারের ব্যাগ নিয়ে পার হবে। তখন দুর্ঘটনা ঘটলে চালকের দোষ হবে এটা মানতে পারি না।’

শিকড় পরিবহনের একজন চালক বলেন, ‘সরকার অবশ্যই ভালো মনে করছে বলে আইন করছে, ভালো হইছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাতারাতি কোনো কিছুরই পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই আইন বাস্তবায়নের জন্য আরও প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। কারণ সড়ক-মহাসড়কের অনিয়ম বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এই আইনের সার্থকতাটা তখনই হবে যখন আমার ভয় দেখানোর দরকার হবে না। আইনটা যুগোপযোগী করা হয়েছে কি না সেটা দেখতে হবে। প্রয়োগের আগে একটু প্রচার প্রচারণার দরকার আছে।’

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে প্রচলিত আইনকে আরও কঠোর করে গত বছর সড়ক পরিবহন আইন পাস হয়। ১ নভেম্বর থেকে আইনটি কার্যকরের জন্য গত ২৮ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এর ধারা ১ এর উপ-ধারা (২) এ দেওয়া ক্ষমতাবলে সরকার ১ নভেম্বর তারিখকে আইন কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করল।

গত বছরের ৮ অক্টোবর ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ এর গেজেট জারি করা হলেও তার কার্যকারিতা ঝুলে ছিল।

এই আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদ- ও অর্থদ-ের বিধান রয়েছে।

গত বছর আগস্টে আইনের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সরকার। জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর গত বছরের ৮ অক্টোবর ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ এর গেজেট প্রকাশ হয়।

কিন্তু গেজেট প্রকাশের পরও আইনটি কার্যকর না হওয়ায় আদালতে রিট আবেদনও হয়েছিল। আইনটি প্রণয়নের পর থেকে তার প্রবল বিরোধিতা করে আসছিল পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনার মামলায় নতুন আইনে শাস্তির মাত্রা ‘অযৌক্তিক’ বেশি।

 (ঢাকাটাইমস/০৩নভেম্বর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :