বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও দেশে ফেরার নেপথ্য কথা

সোহেল সানি
| আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২০, ১০:০৩ | প্রকাশিত : ০৯ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৩২

বিজয়ের আগেই ব্রিটেনের নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকায় সম্পাদক কিংসলি মার্টিন নিজেই লিখলেন- “রক্ত দিয়েই যদি স্বাধীনতার মূল্য নিরূপণ করা হয় তবে, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে এমন স্বাধীনতা অর্জন পৃথিবীর কটা জাতি ও দেশ দিতে পেরেছে আমার জানা নেই, যাঁর মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। রমনার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে পূর্ব দিগন্তে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। যে ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধু মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।’

লাল-সবুজের পতাকায় দেশ হাসছে। কিন্তু জাতির সেই হাসির মাঝেও উৎকণ্ঠা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। তিনি তখনো পাকিস্তানে কারাগারে। তাঁকে নিয়ে ঘরে-বাইরে চারদিকে নানা গুজব। ছাত্রলীগ ও মুজিব বাহিনী ঘোষণা করল বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে ৭ মার্চ রেসকোর্সে সমাবেশ  করেব তারা। বিভিন্ন মহল গুজব রটাল- প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে আন্তরিক নন। এ রকম গুজবের মুখে তাজউদ্দীন ছুটে গেলেন বেগম মুজিবের কাছে। তখন ধানমন্ডির ১৮ নম্বর বাসায় থাকেন তাঁরা। অথচ, বিভিন্নভাবে তাজউদ্দীন তৎপরতা চালাচ্ছিলেন। জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপের অধিকাংশ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধুর মুক্তি দাবি করলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলল- শেখ মুজিবের যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে তার ফলাফল হবে ভয়াবহ। এতে কাজ হলো। ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি করাচির জনসভায় পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবের মুক্তিদানের সরকারি সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন।

১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর অস্থায়ী সরকার রাজধানী স্থানান্তর করে ঢাকায় আসে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান গভর্নর হাউসে (বঙ্গভবন)। কিন্তু শুধু পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ গিয়ে উঠলেন তার আগামসি লেনের বাসভবনে। তাজউদ্দীন মন্ত্রিসভা স¤প্রসারণ করে মোশতাককে বাদ দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেন আব্দুস সামাদ আজাদকে।

মোশতাক পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে কনফেডারেশন গঠনের প্রয়াস চালাচ্ছিল। এ রকম অভিযোগে জাতিসংঘে প্রতিনিধিদলের নেতা হিসাবে মোশতাককে বাদ দিয়ে লন্ডনে দায়িত্বরত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে পাঠানো হয়। আইনমন্ত্রী করা হলেও মোশতাক শপথ না নিয়ে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি হন।

 

সব গুজবের অবসান ঘটে ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে একটি চার্টার্ড বিমানে করে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনের পথে পাঠিয়ে দিয়েছে মর্মে বিবিসির খবরে। এ খবরে আনন্দের বন্যা বয়ে গেলেও তখনো দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারেনি দেশের মানুষ। বিবিসি দ্বিতীয় খবরে জানায় বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমানটি সকাল সাড়ে ছয়টায় লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছেছে। সকাল দশটায় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবকে বিরল অভিবাদন জানিয়েছেন। ওদিন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন।

৯ জানুয়ারি তাজউদ্দীন আহমদ বাসায় গিয়ে বেগম মুজিবকে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশে ফেরার সময়সূচি অবহিত করেন। ৯ জানুয়ারি রাতে লন্ডন ত্যাগ করে পরদিন দিল্লিতে পৌঁছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন বঙ্গবন্ধু। এরপর ভারতীয় একটি বিমানে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দিয়ে কলকাতায় এক ঘণ্টা যাত্রাবিরতি করে বিকাল চারটার দিকে ঢাকা পৌঁছবেন।

এমন কর্মসূচির কথা শুনে বেগম মুজিব প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে অনুরোধ করেন, দিল্লিতে বিমানে পরিবর্তন করলে ব্রিটেন মন”ক্ষুণ্ন্ন হতে পারে। তাঁর ব্রিটিশ বিমানেই ঢাকা আসা উচিত। ততক্ষণে তাজউদ্দীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডি পি ধরকে ফোন করে বেগম মুজিবের পরামর্শ অবহিত করেন। সেই মতে ১০ জানুয়ারি দুপুরের দিকে ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান ‘কমেট’ দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর মন্ত্রিসভা বিশাল অভ্যর্থনা জানান বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

সেখানে ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এক বিরাট সংকল্প নিয়ে আমি ফিরে যাচ্ছি আমার দেশে-স্বপ্নের বাংলাদেশে। সামনে যে পথ আমরা রচনা করবো তা হবে শান্তির এবং প্রগতির পথ। কারও জন্য কোনো ঘৃণা বুকে নিয়ে আমি ফিরছি না। মিথ্যার ওপরে সত্যের জয়, অশুচিতার ওপরে শুচিতার জয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয় এবং সর্বোপরি অশুভ ও অসত্যের ওপরে সর্বজনীন সত্যের বিজয়ের প্রেক্ষাপটে আমি ফিরে যাচ্ছি আমার নিজের দেশে- রক্তস্নাত ও শুচিতায় উদ্ভাসিত স্বাধীন বাংলাদেশে।’

ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর একটি ‘সাদা কমেট’ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করলো। বিমান থেকে অবতরণের সিঁড়ির মুখে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে প্রিয় নেতাকে অভিবাদন জানানোর জন্য মন্তিসভার সদস্যরা আগেই উন্মুখ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, মুজিব বাহিনী ও ছাত্রলীগ তথা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারাও ছিলেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন, অর্থমন্ত্রী মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, রাষ্ট্রমন্ত্রী এইচ এম কামারুজ্জামান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ প্রমুখ।

সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুকে মাল্যভূষিত করেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন। একটি ডজ ট্রাকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাত্রা করে রেসকোর্স ময়দান অভিমুখে। ছাত্রনেতাদের নিয়ন্ত্রণবেষ্টিত ট্রাকটিতে গাদাগাঁদি করে দণ্ডায়মান ছিলেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। বিকাল তিনটায় অবতরণ করে বিমানটি।

 

ট্র কে করে দুই ঘন্টার বেশি সময় লাগে রমনার ময়দানে পৌঁছতে। ছাত্রলীগ নেতারা ব্যুহের মতো করে মঞ্চের কাছে নিয়ে যান বঙ্গবন্ধুকে। লাখ লাখ মানুষের উপচে পড়া ভিড় ঠেলে যখন বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠলেন, ‘জয় বাংলা‘র গগণবিদারি  স্লোগানে মুখর ময়দানের জনস্রোত। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদের কণ্ঠ মাইকে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে গর্জে শোনাল শেখ মুজিবের উপস্থিতি বার্তা। তোফায়েল আহমেদ ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ২৩ ফেব্রুয়ারি যে বঙ্গবন্ধু খেতাব দিয়েছিলেন, সেই অভিধায় শেখ মুজিবকে অভিষিক্ত করে জনসমুদ্রে বললেন, ‘ভাই সব বঙ্গবন্ধু মঞ্চের দিকে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তিঁনি ভাষণ দেবেন। কিন্তু তার আগে বঙ্গবন্ধু এবং আমাদের নিরাপত্তার জন্য দয়া করে সবাই বসে পড়ুন। হাত  দুটোকে মাটির ওপর রাখুন। সঙ্গে সঙ্গে নজর রাখুন আশপাশের প্রত্যেকের ওপর। খুনির হাত যেকোনো জায়গা থেকে উঠে আসতে পারে। কড়া নজর রাখবেন।’

চোখের পলকে বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠলেন। দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিথর নীরব হয়ে রইলেন। ময়দানে উত্তেজনার উদ্বেল আনন্দধ্বনি।

বঙ্গবন্ধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘১৯৭১ সালের ৭ মার্চ আমি বলেছিলাম ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলন। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আপনারা বাংলাদেশের মানুষ সেই স্বাধীনতা জয় করে এনেছেন।

‘ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়নি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। একজন বাঙালির প্রাণ থাকতে এ স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেবে না।’

পাকিস্তানি জেলখানায় নিজের বন্দিদশার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার ফাঁসির হুকুম হয়েছিল। আমার সেলের পাশে আমার কবর খোঁড়া হয়েছিল। আমি মুসলমান। আমি জানি মুসলমান একবারই মরে। তাই আমি ঠিক করেছিলাম, আমি তাদের কাছে নতিস্বীকার করব না। ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময়ও আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’

ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনার কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি যখন চাইব, ভারত সরকার বাংলাদেশ থেকে তার সৈন্যবাহিনী তখনই প্রত্যাহার করে নেবেন।’

ভাষণের একপর্যায়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি’ উদ্ধৃত করে বলেন, ‘এবার নিশ্চয়ই বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি বাঙালি পুড়ে সোনার মানুষ হয়ে উঠেছে। আপনাদের মুজিব ভাই আহ্বান জানিয়েছিলেন, আর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আপনারা যুদ্ধ করেছেন। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন। বাঙালি বীরের জাতি।

 

‘পৃথিবীর কোনো শক্তি আমাদের পদানত করতে পারবে না। বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে জুলফিকার আলী ভুট্টো আমাকে অনুরোধ করে বলেছেন, সম্ভব হলে আমি যেন ফেডারেশন গঠনের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে শিথিল সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করি। তাকে বলেছিলাম আমার জনসাধারণের নিকট আমি ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত আমি আপনাকে এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না।

‘এখন আমি বলতে চাই, ভুট্টো সাহেব, আপনারা সুখে-শান্তিতে থাকুন। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এখন যদি কেউ সেই স্বাধীনতা নস্যাৎ করতে চায়, তাহলে এই স্বাধীনতা রক্ষার করার জন্য শেখ মুজিব সর্বপ্রথম প্রাণ দেবে।‘

জনসভা শেষ করে বঙ্গবন্ধু সদলবলে ছঁটে যান শেরে বাংলা ও সোহরাওয়ার্দীর মাজারে। ওখান থেকে শহীদ মিনারে। সন্ধ্যার পর ধানমন্ডির বাসায় যান বাবা-মা ভাই-বোন, স্ত্রী-পুত্র- কন্যাদের মাঝে।

এরপর ওই দিন ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলাপে বসেন। অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের কর্মকাণ্ড এবং মুজিব বাহিনীর মধ্যে বৈরী সম্পর্কের নেপথ্য ঘটনা বলেন। ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধু বঙ্গভবনে যান শেখ মনি, রাজ্জাক ও তোফায়েলকে নিয়ে। এরপর ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি পদে ইস্তফা দিয়ে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা জারি করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি পদে শপথ নেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :