ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি পৃথিবী!

স্বকৃত নোমান
| আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ১৮:৪৫ | প্রকাশিত : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ১৮:৩৯

জানি না এই দুর্যোগ প্রাকৃতিক, না মানবসৃষ্ট। প্রথম সত্তা বলে প্রাকৃতিক। মানুষ দ্বারা নিষ্পেষিত প্রকৃতির বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। করোনাকে পাহারায় রেখে প্রকৃতি এখন বিশ্রাম নিচ্ছে, নিজের ক্ষতগুলো সারিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু দ্বিতীয় সত্তা বলে, এই দুর্যোগ মানবসৃষ্ট। হয়ত কোনো পরাশক্তি এই ভাইরাস ছড়িয়ে তার ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছ

হয়ত জুলিয়ান এ্যাসেঞ্জের মতো কোনো প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ একদিন এই তথ্য ফাঁস করে দেবে। এটা আমার দ্বিতীয় সত্তার ধারণা। এই ধারণা সত্যি না হোক, এই কামনা। আমি এখনো মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখতে চাই। আমরা এখনো মানুষের ওপর আস্থা রাখতে চাই।

যে কারণেই হোক আমরা একটি ভয়াবহ দুর্যোগ অতিক্রম করছি। একটি অবরুদ্ধ সময় পার করছি। মানবজাতির জন্য এই অভিজ্ঞতা সম্ভবত প্রথম। পৃথিবীর মানুষ সম্ভবত কখনো একই সঙ্গে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়নি। সম্ভবত, কারণ, প্রাগৈতিহাসিক কালের কথা আমরা জানি না। হয়ত প্রাগৈতিহাসিক কালেও এমন কোনো দুর্যোগ নেমেছিল পৃথিবীতে। মানুষ হয়ে পড়েছিল মানুষের থেকে পৃথক। মানুষের যূথবদ্ধতা ভেঙে দিয়েছিল দুর্যোগ।

কিন্তু ইতিহাসে আমরা এমন দুর্যোগের কথা পাই না, যে দুর্যোগ একই সঙ্গে গোটা পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। শ্রদ্ধেয় কবি নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছিল সকালে। তিনি বললেন, এই যে করোনার মরণছোবলকে থামাতে না পারা, মানবজাতির এই যে অসহায়ত্ব―এর জন্য মানুষের মেধার অভাব নয়, মেধার অপব্যবহার বা মেধার অপচয়। আমি তাঁর সঙ্গে একমত।

করোনার এই দুর্যোগে এগারো দিন ধরে স্বেচ্ছাবন্দি। সংসারের টুকটাক জিনিসপত্র কেনার একান্ত প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বেরুচ্ছি না। অবরুদ্ধ থাকতে আমার খারাপ লাগে না। সাপ্তাহিক ও বাৎসরিক ছুটির দিনগুলোতে বলতে গেলে বাসায় স্বেচ্ছাবন্দি থাকি। পড়ি আর লিখি। এখনো তাই করছি। দেড় বছর ধরে যে পাণ্ডুলিপিটার খসড়া প্রস্তুত করেছিলাম এবার সেটা ফাইনাল করছি।

বেশ দ্রুতই এগুচ্ছে। এই অবরুদ্ধকাল না থাকলে ফাইনাল করতে হয়ত দু-তিন মাস লেগে যেত। এরই মধ্যে দুটি গল্পও লিখেছি। এখনো খসড়া। কদিনের মধ্যেই হয়ত ফাইনাল করে ফেলব। পড়তে ও লিখতে পারার খানিকটা অভ্যাস আছে। নইলে এই অবরুদ্ধকাল দুর্বিসহ হয়ে উঠত। একটা সময় লম্বা চুল রাখতাম। কখনো দাড়ি-গোঁফ রাখিনি। করোনার এই অবরুদ্ধকালে দাড়ি-গোঁফ বেশ লম্বা হয়ে উঠেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খানিকটা অচেনা অচেনা ঠেকছে।

প্রত্যেক মন্দের মধ্যে কিছু না কিছু ভালো লুকিয়ে থাকে। যেমন ঘোর অমাবস্যায় আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র। করোনার এই দুর্যোগে বলতে গেলে গোটা পৃথিবী এখন অবরুদ্ধ। যানবাহন বন্ধ, মিল-কারখানা বন্ধ, কোটি কোটি টন রাসায়নিক বর্জ্য উৎপাদন বন্ধ। এই অবরুদ্ধের কালে প্রকৃতি তার স্বাভাবিক রূপে ফিরছে। প্রাণ ফিরে পেয়েছে নদী, পাহাড় ও জঙ্গল। কয়েক মাস আগেও ধুলোয় ধুসর ছিল ঢাকা, দিল্লি, বেইজিংসহ পৃথিবীর বিস্তর বড় শহরের আকাশ।

মারাত্মক বায়ু দূষণে নাভিশ্বাস উঠেছিল মানুষের। এখন কলকারাখানাগুলো বন্ধ থাকায় বাতাসে ধূলিকণাসহ বিষাক্ত সব পদার্থের উপস্থিতি কমেছে। স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতেও ধরা পড়েছে এই পার্থক্য। চীন একাই ২০ শতাংশ কম গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ করছে।

নিউ ইয়র্কেও কার্বন নিঃসরণ ১৫ শতাংশ কমেছে। স্বচ্ছ হয়েছে ভেনিসের খালগুলো, ফিরে এসেছে মাছ। ইতালির উপকূলে ফিরেছে ডলফিন। তেল আবিব বিমানবন্দরে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে সাদা বক আর পাতিহাঁস। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কাছে খেলে বেড়াচ্ছে ডলফিন, সৈকতে চরে বেড়াচ্ছে লাল কাঁকড়া।

সেদিন টিভির খবরে যখন দেখছিলাম কক্সবাজারে সৈকতের কাছে ডলফিনের উচ্ছ্বসিত লাফালাফি, কাঁকড়ার অবাধ বিচরণ, চোখ দুটো ভিজে উঠেছিল। কেন ভিজে উঠেছিল? হয়ত কোনো এক কালে আমিও ডলফিন ছিলাম, আমিও কাঁকড়া ছিলাম। হয়ত আমি তাদেরই বংশধর। হয়ত কোনো একদিন আবারও তাই হবো। উপনিষদীয় জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস নেই। কিন্তু প্রকৃতির সন্তান হিসেবে আবার একেবারে উড়িয়েও দিতে পারি না। মৃত্যুর পর আমি তো পঞ্চভূতেই মিশে যাব। ডলফিন আর কাঁকড়ারা তো আকাশ থেকে পড়ে না, এই পঞ্চভূত থেকেই তো জন্মায়।

কয়েক শতাব্দী ধরে প্রকৃতির উপর আমরা সীমাহীন অত্যাচার করেছি। আমরা ভুলে গেছি এই পৃথিবী একা মানুষের নয়। গাছ, মাছ, পাখি, বাঘ, সিংহ, বানর, জিরাফ, খরগোশ, শেয়াল, খাটাস, শূকর হায়েনা, সাপ, ইঁদুর কেঁচো, পতঙ্গ, ফড়িং, প্রজাপতি এবং আর আর প্রাণীরাও এই পৃথিবীর অংশীদার। এই পৃথিবীতে আমার যেটুকু অধিকার, সেটুকু তাদেরও।

মানুষ শ্রেষ্ঠ প্রাণী―এই দাবি থেকে আমাদের সরে আসার সময় এসেছে। যে বাঘটাকে আমরা চিড়িয়াখানায় বন্দি করে রেখেছি তার সামনে অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে বলার সময় এসেছে, আমি শ্রেষ্ঠ নই, তুমি শ্রেষ্ঠ। যে সিংহটাকে বন্দি করে রেখেছি তাকে কুর্ণিশ করে বলার সময় এসেছে, আত্ম অহংকারের কারণে আমি তোমার বোবা কান্না এতদিন বুঝিনি। আমাকে ক্ষমা করো। আমি নই, তুমিই শ্রেষ্ঠ। যাও, তুমি তোমার জগত জঙ্গলে ফিরে যাও। জঙ্গলের সামনে দাঁড়িয়ে, পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে, নদীর সামনে দাঁড়িয়ে, সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে করজোড়ে ক্ষমা চাওয়ার সময় বুঝি এসে গেছে।

সেদিন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ঢাকা শহরের কুকুর ও আর কাকগুলোকে খাবার দিচ্ছিল। টিভি সাংবাদিককে এক স্বেচ্ছাসেবী বলছিলেন, ‘এরাও আমাদের মতো প্রাণী। এদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে।’ আমি এতই সংবেদী যে, তার ওই কথায় ভেতরটা ভিজে গিয়েছিল। ওই মানুষটিকে সামনে পেলে দুহাত জোড় করে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাতাম।

আবার ব্যতিক্রম চিত্রও আছে। দুর্যোগে মানুষের মানবতা জেগে ওঠে, মানুষের বুকে দয়ামায়া জেগে ওঠে; দুর্যোগ বিভেদ-বিসম্বাদ ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কখনো কখনো ব্যাপারটা উল্টো। আজ নারায়ণগঞ্জের এক অবৈধ কারাখানা থেকে নকল হ্যান্ড সেনিটাইজার উদ্ধার করেছে পুলিশ। সকালে খবরে দেখলাম কোন এক নেতার বাড়ি থেকে ভিজিএফ-এর চাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। মানুষ কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? মানুষ এত নষ্ট, এত নষ্ট, এত নষ্ট হয় কী করে!

ওদিকে শুক্রবার ছিল আজ। দলে দলে মুসল্লিরা মসজিদে গেছে। তারা জানে না জীবনের জন্য ধর্ম, ধর্মের জন্য জীবন নয়। জীবন বাঁচানো যে ফরজ―তারা ভুলে গেছে শাস্ত্রের এই মহৎ বাণী। নামাজ যেমন ফরজ, জীবন বাঁচানোই তেমনি ফরজ। প্রথম ফরজ জীবন। আর যত ফরজ আছে সব জীবনের পরে।

জানি না ঈশ্বর আছে কিনা। তার থাকা না থাকা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। তবে এটুক জানি, মানুষ আছে বলেই ঈশ্বর আছেন। এই বিশ্বপ্রাণ আছে বলেই তিনি আছেন। এই বিশ্বপ্রাণ ছাড়া তার থাকা-না-থাকা সমান। শাস্ত্র বলেছে, তার ওঙ্কার থেকেই সৃষ্টি হয়েছে এই ব্রহ্মাণ্ড।

তার ‘কুন’ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে এই বিশ্বজগত। সুতরাং এই বিশ্ব, এই বিশ্বপ্রাণ, এই আমি, এই আমরা তারই অংশ। তিনি আমার মধ্যেই বিরাজ করছেন। তিনি আমাদের মধ্যেই বিরাজ করছেন। আমরা যখন জেনেশুনে নিজেদের হত্যা করি, প্রকারান্তরে আমরা তাকেই হত্যা করি।

মহাকালে রেখাপাত।

ঢাকাটাইমস/৪এপ্রিল/এসকেএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :