ব্যবসায়ীদের কম সুদে ঋণ দিতে সরকারি তহবিল প্রয়োজন: ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি

অনলাইন ডেস্ক
| আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২০, ১৪:১১ | প্রকাশিত : ২৬ এপ্রিল ২০২০, ১১:৫৫

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে মন্দার আভাস বিশ্ব অর্থনীতিতে। এ থেকে মুক্ত নয় বাংলাদেশেও। উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্প থমকে গেছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের ঘাটতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে ব্যাংকিংখাতকেও। এই সংকট সহসা কাটার সম্ভাবনাও দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক মঈনউদ্দীন। ঢাকা টাইমসের সঙ্গে একান্ত আলাপে তিনি বলেন, ‘করোনার ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যবসায়ীদের কম সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য সরকার তরফে যে নির্দেশনা এসেছে তা ব্যাংকিংখাতের জন্য ভাবনার কারণ হবে। ব্যাংকিংখাতের অবস্থা আগে থেকেই ভালো যাচ্ছিলো না। তবে ব্যাংকগুলোর তহবিল যদি এখানে ব্যবহার করতে বাধ্য করা না হয়, সরকারের তরফ থেকে যদি এই তহবিলের যোগান দেওয়া হয়, তাহলে ব্যাংকগুলো হয়তো পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেকটাই সক্ষম হবে।’

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- হাবিবুল্লাহ ফাহাদ

ঢাকা টাইমস: করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দেশের উৎপাদনশীল ও রপ্তানিশিল্পখাতকে সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতও এর বাইরে নয়। এভাবে চলতে থাকলে সামনে আরও কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে বলে মনে করেন?

ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি: আমাদের চ্যালেঞ্জের তো শেষ নেই। প্রথম কথা হচ্ছে করোনাভাইরাসের কারণে যে একটা মহামন্দার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে আমরা তার বাইরে নই। আমাদের চ্যালেঞ্জটা আরো গভীর হবে। করোনাভাইরাসের কারণে পুরো বিশ্বই যেখানে আক্রান্ত। অতীতে দেখা গেছে, বিভিন্ন ধরনের বৈশ্বিক ব্যবসা খারাপ কিংবা হতাশার মধ্য দিয়ে গেছে। এগুলো হয়তো পৃথিবীর বিশেষ বিশেষ কোনো দেশকে আক্রান্ত করেছে কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কিন্তু করোনার কারণে পৃথিবীর সবগুলো দেশই ক্ষতিগ্রস্ত। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির প্রায়। সুতরাং এটার যে প্রভাব সামনে আসবে সেটার পরিমাপ এই মুহূর্তেই করা যাচ্ছে না, তবে এটা যে খুব ব্যাপক আকারে আসবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

ঢাকা টাইমস: অনেকে এটাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের মহামন্দার সঙ্গে তুলনা করেন। আপনি কী মনে করেন?

ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি: হ্যাঁ, আমরা এটাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের যে পরিস্থিতি অর্থাৎ ১৯৩০ সালের যে মহামন্দা সেটার সাথে তুলনা করি। বরং ওটার চেয়েও খারাপ হতে পারে। কারণ এবারের যে মন্দাটা আসবে সেটার সাথে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্যখাত, আগেরটাতে এই উপাদানটা ছিল না। আমেরিকার মতো একটা মহাশক্তিশালী দেশ যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে করোনা মোকাবিলা করতে, সেটা কখনোই আশা করিনি। আমরা সবসময়ই ভাবতাম আমেরিকার শক্তিমত্তা সবদিক দিয়েই বেশি। কিন্তু এবার প্রমাণ হয়েছে তারা তা নয়।

ঢাকা টাইমস: আমাদের ক্ষেত্রে কী ধরনের মন্দা অপেক্ষা করছে বলে মনে করেন?

ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি: আমরা বিভিন্ন দুর্যোগে উন্নত দেশের সাহায্য নিতাম। এখন সমস্যাটা হবে, আমরা যাদের কাছে চাইতাম তারাই এখন বিপর্যস্ত। তারা আমাদের কতটা সাহায্য করতে পারবে সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আর ব্যাংকিং খাতের কথা যে বলছিলেন, সেদিকে যদি নজর দেই তাহলে বলতে হবে এমনিতেই আমাদের ব্যাংকিংখাত খুব ভালো যাচ্ছিল না। আমাদের ব্যাংকিং খাতে সীমাহীন সমস্যা ছিল। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল খেলাপি ঋণ। এটাই ব্যাংকিংখাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ও চ্যালেঞ্জ। এখন যে আরেকটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে, সেটা হলো ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ডের কথা বিবেচনা না করে কম সুদের হারে ব্যবসায়ীদেরকে ঋণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা। এতে খেলাপিরা হয়তো সরাসরি ঋণ পাবে না, কিন্তু অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময়ের জন্য রিশিডিউলিংয়ের মাধ্যমে তারা অন্যভাবে সুবিধা পেয়ে গেছে। অথচ তাদের কারণেই আজকে ব্যাংকগুলোর এই দুরবস্থা। ব্যাংকগুলোকে এখন ক্ষমতার বাইরে গিয়ে তাদের ঋণের সুদ কমিয়ে দিতে হচ্ছে।

ঢাকা টাইমস: ঋণের সুদের হার অনেক সময় খেলাপির জন্য দায়ী বলে বলা হয়। এটি কতটা সঠিক?

ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি: ঋণের সুদ কিন্তু খেলাপি ঋণের জন্য দায়ী নয়। বলা হচ্ছে, সুদের হার বেশি বলে ঋণখেলাপি হয়েছে, এটা ঠিক নয়। যখন করোনাভাইরাসের বিন্দুমাত্র আভাস বা পূর্বাভাস কোনো কিছু ছিল না, তখনই কিন্তু ঋণের সুদের হার নাইন পার্সেন্টের কথা এসেছিল। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চলে যাওয়ার পরে যখন সবকিছু স্বাভাবিক হবে, মানুষের অর্থনেতিক কর্মকাণ্ড, শিল্প কিংবা ব্যবসায়ীদের সবকিছু যখন গতি পাবে তখন নতুন দাবি কিংবা আবদার আসতে পারে যে, নাইন পার্সেন্টও যথেষ্ট নয়, আরও কমাতে হবে। তখন ব্যাংকগুলো কোথায় যাবে? এ বিষয়গুলো আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুবই ভাবাচ্ছে, ব্যাংকিংখাতের লোক হিসেবে। কারণ এই দাবিটা আসা খুব স্বাভাবিক। তার একটা সমাধান হতে পারে এরকম যে, ব্যাংকগুলোর তহবিল যদি এখানে ব্যবহার করতে বাধ্য করা না হয়, সরকারের তরফ থেকে যদি এই তহবিলের যোগান দেওয়া হয়, তখন হয়তো ব্যাংকগুলোর পক্ষে তাদের দাবি বা আরও সুদ কমানোর দাবি কিছু মাত্রায় রক্ষা করা যেতে পারে।

তার সাথে আরো যুক্ত হতে পারে, ব্যাংকগুলো যেসব ঋণ নামমাত্র ডাউন পেমেন্ট নিয়ে রিশিডিউল করে দিয়েছিল, সেগুলোর সময় আরও লম্বা করার জন্য দাবি আসতে পারে। কারণ তাদের এমন দাবি করোনাপরবর্তী সময়ে খুবই স্বাভাবিক বলে প্রতিভাত হবে। তারা এমনিতে হয়তো স্বাভাবিক অবস্থাতেই দিতো না। তখন করোনা একটা নতুন অজুহাত হিসেবে যুক্ত হবে। এই জায়গায় একটা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমরা হবো। এগুলো হচ্ছে মোটামুটি আপাতত বড় চ্যালেঞ্জ।

ঢাকা টাইমস: করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর এই চ্যালেঞ্জ কতটা দীর্ঘ হতে পারে বলে মনে করেন?

ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি: আপনি একটা জিনিস দেখেন, যখন করোনার কোনো ঝুঁকি ছিল না, তখনো কিন্তু বড় খেলাপি ঋণগুলো ১০ বছরের জন্য রিসিডিউল করতে বলা হয়েছিল। তখনই যদি ১০ বছর চায় করোনা ঝুঁকির কারণে সেটা তো আরও বাড়বে বলে ধারনা করতে পারি। এখানে একটা অজুহাত আসবে। আবার এই আবদারও আসতে পারে যে, এই ১০ বছর যথেষ্ট নয়, বা ৯ শতাংশ সুদ হারও যথেষ্ট নয়, আরো সময় বাড়াতে হবে, আরো সুদ হার কমাতে হবে, তাহলে কত বছরে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা যাবে, তা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড কতটা গতিশীল হবে তার ওপরে।

ঢাকা টাইমস: এই মন্দাবস্থা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা কীভাবে সম্ভব?

ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি: এটা সত্য যে যখন কোনো মন্দাবস্থা বিরাজ করে তখন মানুষের কর্মসংস্থান একটা বড় ধরনের সমাধান হতে পারে। অর্থনৈতিক মডেল কিন্তু তাই বলে। মন্দার সময় কর্মহীন মানুষের জন্য যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায় তাহলে তাদের আয় বাড়ে। আয় বাড়লে তাদের ভোগও বাড়বে। ভোগ বাড়লে বাজার এবং শিল্পপণ্যের উৎপাদন বাড়বে। উৎপাদন বাড়লে আবার কিছু কর্মসংস্থান হবে। মডেলটা এভাবেই কাজ করে। কিন্তু কর্মসংস্থানের মাধ্যমে প্রাথমিক যে ইনজেকশন অব ফান্ড, সেটা কিন্তু সরকারকেই করতে হয়।

ঢাকা টাইমস: সরকার কীভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে কাজ করতে পারে?

ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি: সরকারি উন্নয়ন কাজ যদি বাড়ানো হয় এবং যারা সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষ, মজুরশ্রেণির মানুষ, যে কোনো অর্থনৈতিক অভিঘাতে যারা প্রথমেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের কাজ দিতে হবে। সুতরাং এটা নিশ্চিত করতে হবে সরকারের পক্ষ থেকে। আমাদের এখন শ্রমঘন উন্নয়ন কাজগুলো বাড়াতে হবে। এই কাজগুলো বাড়লে সাধারণ লোকজনের আয় বাড়বে। আর আয় বাড়লেই তাদের ব্যয় করার সক্ষমতা এবং ভোগ বাড়বে। তাই মন্দা কাটাতে হলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সেটি হলে অনেকটাই কাজ সহজ হয়ে যাবে আমাদের জন্য।

ঢাকা টাইমস: করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে উন্নত বিশ্বেও কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়ে গেছে। কর্ম হারানোর ঝুঁকিতেও আছেন অনেকে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এটিকে কীভাবে দেখছেন?

ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি: প্রথম কথা হচ্ছে আমরা তো কর্মী ছাঁটাইয়ের কথা ভাবতেই পারছি না। আমাদের আরও কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রাখা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খাত হচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্প। উন্নত বিশ্বে লোকজন ছাঁটাই হলে, তাদের ভোগ্যপণ্যের পেছনে ব্যয় কমে যায়- তখন কিন্তু আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে কর্মহীন হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার এর আরেকটি দিকও আছে। আমরা তৈরি পোশাক শিল্প নির্ভর বলে, আমরা কিন্তু খুব বেশি উচ্চমূল্যের বিলাসি পোশাক উৎপাদন বা রপ্তানি করি না। আমরা যেসব পণ্য উৎপাদন করি সেগুলো যেসব দেশে যায় সেসব দেশের মধ্যম বা নিম্ন আয়ের মানুষই ব্যবহার করে। এই দিক থেকে আমাদের খুব বেশি হতাশ না হলেও চলে। যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে যদি মানুষের আয় কমে যায়, তাহলে কিছুটা শঙ্কা থাকে। কিন্তু এটাও ঠিক যে পোশাক কিন্তু মানুষের মৌলিক চাহিদার একটি। তাই এটা একেবারে কমে হয়তো যাবে না। কিছুটা কমতে পারে।

আবার দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ফলে তাদের চাহিদাটাও জাম্প করতে পারে। এটাও দেখার বিষয়। এটা অবশ্য আমাদের পক্ষে বলা সহজ নয়। কারণ আমাদের দেশে সবকিছু ঠিকভাবে চলে না। সবকিছু যেভাবে চাই সেভাবে হয় না। এর পেছনে নানান রকমের সমস্যা আছে। বিভিন্ন মহলের বিভিন্ন ধরনের কাজ কারবার। আমরা তত্ত্বের ভাষায় যেভাবে বলে থাকি সেভাবে সবকিছু হয় না। অর্থনীতিতে একটা টার্ম আছে এমন যে, ‘এই তত্ত্বটি কার্যকর যদি সবকিছু ঠিক থাকে।’ আমি যে কথাগুলো বললাম সেগুলো যদি সবকিছু ঠিক থাকে তাহলেই কার্যকর হবে। অর্থনীতির তত্ত্বগুলো যদি আপনি বিশ্লেষণ করে সমাধান খুঁজতে চান, আপনাকে কিন্তু প্রথমেই এই শর্তটা মেনে নিতে হবে।

ঢাকা টাইমস: বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক খোলা রাখতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী। আপনারা কর্মীদের সুরক্ষায় কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছেন এবং কিভাবে খোলা রাখছেন?

ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি: ব্যাংক খোলার বিষয়ে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব বিবেচনায় যেভাবে সম্ভব খোলা রেখেছে। আমরা প্রথমে চাইছিলাম, মানুষ কম আসুক ব্যাংকে। শুধু করোনাভাইরাসের কারণেই নয়, ব্যাংকিংয়ের বিকল্প সেবা চ্যানেলগুলো ব্যবহার করা নিশ্চিত করলেই ব্যাংকে গ্রাহকদের সশরীরে আসার প্রয়োজন কমে যায়। উন্নত বিশ্বের লোকজন কিন্তু ব্যাংকে যায় না। তারা কিন্তু বিকল্প মাধ্যম ব্যবহার করে। এটিএম ব্যবহার করে। এখনো আমরা এসব ব্যবহারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পুরোপুরি সক্ষম হইনি। তার একটা বড় কারণ হচ্ছে, লোকজনের মধ্যে ভার্চুয়াল লেনদেনে এখনো খুব একটা বিশ্বাস নেই।

আমরা যেটা চেষ্টা করেছিলাম এখনকার পরিস্থিতিতে সেটার যদি কিছুটা উন্নতি হয়। কেবল যেসব ক্ষেত্রে ডকুমেন্টস বা অন্য কাগজপত্রের কাজ থাকে সেসব ক্ষেত্রেই মানুষের সশরীরে ব্যাংকে যাওয়া সমর্থন করা যেতে পারে। কিন্তু নগদ লেনদেনের জন্য ব্যাংকে যাওয়ার দরকার নেই। নগদ লেনদেন কমিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন উৎসাহিত কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে বাধ্য করা গেলে মানুষের ব্যাংকে যাওয়ার প্রবণতা কমানো যেতে পারে। এটিএম বুথে যাতায়াত বাড়াতে ব্যাংকগুলোও তখন বিকল্প ডেলিভারি চ্যানেল আরও বাড়ানোর চেষ্টা করবে।

ঢাকা টাইমস: এখন কি লোকজনের ব্যাংকে যাওয়ার প্রবণতা কমেছে?

ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি: মূল বিষয়টা হচ্ছে মানুষজনের ব্যাংকে আসা এখনো বন্ধ করা যায়নি। লোকজন এখনো ব্রাঞ্চ খুললে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। ব্যাংকগুলো নিজস্ব চেষ্টায় ভেতরে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। আমরা মার্ক করে দিয়েছি কে কোথায় দাঁড়াবে। কিন্তু ব্যাংকের বাইরে যারা থাকে তাদের ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনারা দেখেছেন লোকজন টিসিবির পণ্য বা যে কোনো কিছু কিনতে যাক আর যেখানেই যাক, গাদাগাদি করে লাইনে দাঁড়ায়। সামাজিক দূরত্বটা মানে না। তবে আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করছি। বাকিটা নির্ভর করবে মানুষের সচেতনতার ওপর। আপনি দেখেন, সেনাবাহিনী বা পুলিশ দিয়েও কাউকেই মানানো যাচ্ছে না। সুতরাং এখানে আমাদেরও একটা সচেতনতার বিষয় আছে। শুধু সরকার করলে হবে না। আমরা যদি সুনাগরিক না হই, কোন সরকারেরই ক্ষমতা নাই এগুলোকে ঠিক করা। এগুলো আমাদের সচেতনতার ব্যাপার।

তবে আমাদের এটাও বুঝতে হবে, কিছু কিছু মানুষ নিতান্ত বাধ্য হয়ে বাইরে আসে, কারণ তা নাহলে তাদের খাবার জুটবে না। এবিষয়ে অমর্ত্য সেনের একটা কথা খুবই প্রণিধানযোগ্য, ‘সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়াকে রোধ করতে পারে, কিন্তু এটা প্রয়োগ করতে হলে পরিপূরক ব্যবস্থা প্রয়োজন। লকডাউনের ফলে বিপর্যস্ত মানুষের আয়, খাদ্য, চিকিৎসা ইত্যদি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

ঢাকা টাইমস: আপনি পেশায় একজন ব্যাংকার। দেশের স্বনামধন্য ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের শীর্ষ পদে কর্মরত। এর বাইরে আপনার বড় পরিচয় আপনি সৃজনশীল সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত ও সুপরিচিতি লেখক। সম্প্রতি বাংলা একাডেমি পুরস্কারের স্বীকৃতি পেয়েছেন। ভ্রমণ সাহিত্যে অন্যতম সেরা লেখক হিসেবে আপনি পাঠকপ্রিয়। লেখকের সংবেদনশীল একটি মন থাকে। যদি জানতে চাই বর্তমান পরিস্থিতিতে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা সবাই বলছেন। কিন্তু যতটুকু হচ্ছে তা কি পর্যাপ্ত বলে মনে করেন?

ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি: আপনি চমৎকার প্রশ্ন করেছেন। আসলে যারা প্রকৃত অভাবী তাদের জন্য আমরা তেমন কিছু করতে পেরেছি বলে মনে হয় না। আমরা তো আর পথে বেরোতে পারি না। টেলিভিশনের নিউজগুলোতে যেটা দেখি তাতে বুঝতে পারি যে, যাদের এই মুহূর্তে সহায়তা প্রয়োজন তাদের কাছে আমরা পৌঁছতে পারিনি। চেষ্টা করা হচ্ছে সীমিত আকারে। এই পরিস্থিতিতে প্রকৃত ব্যক্তির কাছে সহায়তা পৌঁছানোর জন্য যা করা প্রয়োজন বলে ভাবি বা স্বপ্ন দেখি সেটি বলতে পারি। এজন্য আপনাকে একেবারে তৃণমূলে নামতে হবে। গ্রামে বলেন কিংবা শহরে, প্রতিটি ওয়ার্ডের কমিশনার বা ইউপি সদস্য যারা আছেন, তারা যদি নিজ নিজ মহল্লা বা এলাকায় খুব সতর্কতার সঙ্গে কোনোভাবে প্রভাবিত না হয়ে তালিকা তৈরি করতেন, তাহলে কিন্তু ওইসব অভাবী মানুষের কাছে বেছে বেছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া যেতো।

ঢাকা টাইমস: কিন্তু সরকার তরফে বা জনপ্রতিনিধিরা তো বলছেন তারা ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন।

ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি: হয়তো দিচ্ছেন। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। আরও দেওয়া যেতো, যদি এসবের নয়ছয় না হতো, পরিমাণে পর্যাপ্ত হতো এবং সর্বোপরি আন্তরিকভাবে তালিকাগুলো করা হতো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের যারা জনপ্রতিনিধি আছেন, তাদের বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড দেখি। দেশের মানুষের মানসিকতায় এটা নেই। আমার লেখক সত্ত্বার সংবেদনশীল মনকেও খুব পীড়িত করে। কেন আমরা এটা করতে পারি না? এই পরিস্থিতিতেও কেন আমাদের ত্রাণ নয়ছয় করতে হবে? এই যে দুস্থ ছেলেপেলেরা পথে পথে খাবার খোঁজে, আমাদের পক্ষে কতটুকু সাধ্য আছে তাদেরকে সাহায্য করার? অনেকে সীমিতাকারে করছে। কিন্তু সেটা খুবই অপ্রতুল। এ জন্য সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন। জনপ্রতিনিধিদের উচিত প্রকৃত অভাবী মানুষের তালিকা করে তাদের মধ্যে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

একটা সাধারণ বিষয়ই দেখেন। আমরা বলি, স্টে হোম। এই হোম কজনের আছে? বস্তি এলাকায় যদি যান, তাদের কি আসলে হোম আছে? তাদের শোয়ার জন্য একটা আশ্রয় আছে, মাথার ওপর একটা চালা আছে। আমরা যেটাকে বৈঠকখানা বলি, ফুটপাতই হচ্ছে তাদের বৈঠকখানা। ঘুমোনোর সময়টা ছাড়া বাকি সময়টা তাদের বাইরেই মানে রাস্তায় কাটাতে হয়। তারা কীভাবে ঘরে থাকবে? এটাও আমাদের ভাবতে হবে। আমরা তো আর তাদের পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুভব করতে পারবো না। কিন্তু এটা ভাবায় যে, একটা ছোট্ট ঘরে এতগুলো লোক কী করে থাকেন? এটার কোনো সমাধান হয়তো আমরা দিতে পারবো না। কিন্তু সবজি বিক্রেতা, রিকশা চালক তারা তো পেশার কারণে বাইরে আসে। তাই তাদের যদি কোনোভাবে সাহায্য করা যেতো, তাহলে তাদের অবাধে পথে নেমে আসা বন্ধ করা যেতো। এজন্য সমাজের একেবারে তৃণমূলে যে প্রতিনিধি আছেন তাদের ভূমিকাটা যথাযথভাবে পালন করতে হবে। তারা যদি দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেন, তাহলে হয়ত আমরা কিছু মাত্রায় অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারব।

ঢাকা টাইমস: অফিস, লেখালেখি, পরিবার-সবমিলিয়ে সব সময়ই ব্যস্ত থাকতে হয় আপনাকে। এখন সেই ব্যস্ততার অনেকটাই নেই। কীভাবে কাটছে সময়?

ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি: এখন মাঝে-মধ্যে অফিসে যেতে হয়। সারাদিন ফোনকলগুলোতে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত দিতে হয়। কারণ আমাদের অনেকেই নিয়মিত অফিসে যাচ্ছেন। ব্রাঞ্চগুলোর বিভিন্ন সমস্যা শুনতে হয়। কখনো কনফারেন্স কল হয়। দেশের বাইরের সঙ্গেও দু-চারবার কনফারেন্স কল করতে হয়েছে। এভাবেই সময়গুলো মোটামুটি কাটে। আর বাকি সময়ে একটু লেখালেখির চেষ্টা করছি। কিন্তু মানসিক স্থিরতা না থাকলে আসলে লেখালেখি হয় না। যতই অবসর থাকুক। একটু লিখেই আবার টেলিভিশন দেখতে ইচ্ছে হয়। ভালো কোনো খবর আছে কিনা। কিংবা খারাপ কিছু হচ্ছে কিনা। এভাবেই আসলে সময় কাটছে।

ঢাকা টাইমস: সময় দেওয়ার আপনাকে ধন্যবাদ।

ট্রাস্ট ব্যাংক এমডি: ঢাকা টাইমসকে এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।

(ঢাকাটাইমস/২৬এপ্রিল/এইচএফ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :