হাজারও তরুণীকে দুবাইয়ে অনৈতিক কাজে জড়ানোর স্বীকারোক্তি

আদালত প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১৩ জুলাই ২০২০, ২১:৪৮
পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার আজম খান ও তার সহযোগী মো. আলামিন হোসেন ওরফে ডায়মন্ড

চাকরির নামে দেশের হাজারেরও বেশি তরুণীকে দুবাইয়ে পাচার এবং তাদের অনৈতিক কাজে জড়াতে বাধ্য করার দায় স্বীকার করেছেন আন্তর্জাতিক নারী পাচার চক্রের মূলহোতা আজম খান ও তার সহযোগী মো. আলামিন হোসেন ওরফে ডায়মন্ড।

সোমবার তাদের ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে সিআইডি। লালবাগ থানার মানবপাচার আইনে করা মামলায় ঘটনার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় তা রেকর্ড করার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।

আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর হাকিম শাহিনুর রহমান তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

অপরদিকে মামলার আরেক আসামি আনোয়ার হোসেন ময়নাকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর হাকিম শাহিনুর রহমান তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

লালবাগ থানার আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক স্বপন এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

এর আগে রবিবার সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম প্রধান ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, মানবপাচার একটি ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম। দুবাইতে এই চক্রের গডফাদার আজমের বিলাসবহুল হোটেলের সন্ধান পেয়েছি। সে ফরচুন পার্ল হোটেল অ্যান্ড ড্যান্স ক্লাব, হোটেল রয়েল ফরচুন, হোটেল ফরচুন গ্রান্ড ও হোটেল সিটি টাওয়ারের অন্যতম মালিক। এরমধ্যে তিনটি হচ্ছে ফোর স্টার, একটি থ্রি স্টার মানের। সে বাংলাদেশে অর্ধশত দালালের মাধ্যমে কিশোরী অথবা ২০-২২ বছরের মেয়েদের উচ্চ বেতনে কাজ দেয়ার কথা বলে প্রলুব্ধ করতো। পরে নির্ধারিত দুটি বিদেশি এয়ারলাইন্স এজন্সির মাধ্যমে দুবাই পাঠাত।

সিআইডির এই কর্মকর্তা জানান, দুবাই যাওয়ার পর তাদের প্রথমে ছোটখাটো কাজ দেয়া হতো। এরপর জোরপূর্বক ড্যান্স ক্লাবে নাচতে বাধ্য করা হতো। আটকে রাখা হতো, খাবার দেয়া হতো না, শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হতো। বৈদ্যুতিক শক পর্যন্ত দেয়া হতো। তাদের অনৈতিককাজে বাধ্য করা হতো।

এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুবাই সরকার দূতাবাসকে জানিয়ে চক্রের গডফাদার আজমের পাসপোর্ট জব্দ করে দেশে ফেরত পাঠায়। দেশে ফেরার পর আজম আত্মগোপনে চলে যান। বারবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন। নতুন পাসপোর্ট করে তিনি সীমান্ত দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে তার আগেই দুই সহযোগীসহ সিআইডির চৌকস দল তাকে আটক করে। এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ১৫টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ছয়টি হত্যা মামলা।

জিজ্ঞাসাবাদে আজম স্বীকার করেছেন যে, গত আট বছরে তিনি হাজারেরও বেশি তরুণীকে দুবাই পাচার করেছেন। এ বিষয়ে সিআইডি বাদী হয়ে গত ২ জুলাই রাজধানীর লালবাগ থানায় একটি মামলা করেছে, যা সিআইডি তদন্ত করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মানবপাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া আজম খানের অর্থনৈতিক অবস্থা এক সময় খুব খারাপ থাকলেও, আমিরাতের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হিসেবে তার পরিচিতি তৈরি হয়েছে কয়েক বছর আগে। এখন তাকে সবাই আজম খান নামে চিনলেও তিনি খান বংশের কেউ নন। বিদেশে মানবপাচার শুরু করার পর নিজেই নামের শেষে খান উপাধী যুক্ত করেন। গ্রেপ্তার হওয়া আজমের অন্তত তিনটি নামের হদিস পাওয়া গেছে। এলাকার লোকে তাকে আজম ছাড়াও মোজাহের ওরফে আজিম উদ্দিন ওরফে ডন আজিম নামে চেনে। তার পিতার নাম মাহবুল আলম ও মায়ের নাম সবিল খাতুন। গ্রামের বাড়ি ফটিকছড়ি পৌরসভার খেরু মুহুরীর বাড়িতে। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া আজম খান লেখাপড়ায় প্রাইমারির গি পেরোতে পারেননি। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।

তার রাজনীতির হাতেখড়ি হয় ছাত্রশিবিরের মাধ্যমে। ফটিকছড়িতে যখন শিবিরের রাজত্ব চলত, তখন ওই এলাকার দুর্ধর্ষ ক্যাডার হিসেবে পরিচিতি ছিল তার। ছাত্রলীগ ও প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অনেকে তার হাতে খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০১০ সালের শুরুর দিকে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর অভিযানের মুখে এলাকাছাড়া হন আজম। পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচের দেশ আবর আমিরাতে। সেখানে থাকা জামায়াত-শিবির ও বিএনপির ক্যাডারদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নেমে পড়েন নারী পাচারে। অল্প সময়ের মধ্যেই কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক বনে যান হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান আজম। নামের সঙ্গে যুক্ত করেন খান উপাধি।

তার সিন্ডিকেট সংযুক্ত আরব আমিরাতে দেরা দুবাই, ফজিরা এবং রাস আল খাইমায় গড়ে তোলে কমপক্ষে ১০টি ডান্সবার ও হোটেল।

মানবপাচারের এই সিন্ডিকেট ভালো বেতনের টোপ দিয়ে বাংলাদেশি নারীদের আমিরাতে নিয়ে যেত। এরপর তাদের পাসপোর্ট ও অন্যান্য ডকুমেন্ট কেড়ে নিয়ে বাধ্য করা হতো ডান্সবারে চাকরি করতে। আবার অনেক নারীকে আমিরাতে নেয়ার পর ১৫ থেকে ২০ হাজার দেরহামে বিক্রি করে দেয়া হতো। বিক্রি হওয়া এসব নারীকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হতো বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

(ঢাকাটাইমস/১৩জুলাই/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

আদালত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :