তারপরও কেন জনস্বার্থ মামলা করেন ইউনুছ আকন্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৩ মে ২০২১, ১২:২৭ | প্রকাশিত : ৩০ এপ্রিল ২০২১, ১৯:০৭

উচ্চ আদালতে জনস্বার্থের মামলা করে দেশে আলোচিত-সমালোচিত তিনি। বারবার মামলা করে আদালতে বিরক্তির কারণ হয়েছেন, জরিমানা ও ভর্ৎসনার পেয়েছেন। জনস্বার্থে মামলা করে নাকি তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তার শত্রু বেড়ে গেছে। তার পরেও নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনস্বার্থে কেন মামলা করেন? তার মামলাগুলো জনস্বার্থে হয় কি না? এসব মামলার অর্থের জোগান দেয় কে?

‘জনস্বার্থে রিটকারী’ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ এখন পর্যন্ত দুই শর মতো রিট করেছেন। তার বেশির ভাগই ছিল বিতর্কিত। ফলে হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া তার জনস্বার্থের মামলাতে আদেশ পাননি। কিছু কিছু মামলায় বিরক্ত বোধ করেছেন আদালত। করেছেন জরিমানাও। বিচার বিভাগ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করায় তিন মাস আদালতে উকালতি করতে পারেননি ইউনুছ আলী আকন্দ।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই আইনজীবীকে সতর্কও করেছেন আদালত। সম্প্রতি রাজধানীর একটি সড়কে ডাক্তার-পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট বাগবিতণ্ডার ঘটনায় ইউনুছ আলী আকন্দ আদালতে রিট করেন। কারণে-অকারণে রিট করার প্রবণতার প্রতি বিরক্ত আদালত এই আইনজীবীকে সতর্ক করেন এভাবে- ‘মিস্টার আকন্দ, শখের বশে রিট করবেন না। এ ধরনের রিট করলে খারিজ করে জরিমানা করা হবে। জরিমানা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকবেন।’

ইউনুছ আলী আকন্দ ২০১২ সাল থেকে জনস্বার্থে মামলা করছেন। ২০১৪ সালে আদালতের আদেশ বিকৃতভাবে উপস্থাপন করায় তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছিল হাইকোর্ট।

২০২০ সালের ১২ অক্টোবর দেশের বিচার বিভাগ নিয়ে ফেসবুকে বিরূপ মন্তব্য করে পোস্ট দেয়ায় ইউনুছ আলী আকন্দকে তিন মাস হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে আইন পেশা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। এই টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

এত কিছুর পরও তিনি জনস্বার্থে মামলা থেকে বিরত হবেন না বলে জানিয়েছেন ইউনুছ আলী আকন্দ। তার মতে, তাকে জরিমানা করে কোনো লাভ হবে না। তার ওকালতি জীবনে তিনি কখনো একটা টাকাও জরিমানা দেননি। উল্টো মামলা জিতে সরকারের কোষাগার থেকে টাকা নিয়েছেন।

ইউনুছ আলী আকন্দ, যিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচন করে হেরে যান, তার জনস্বার্থে মামলার প্রতি দুর্বলতার কারণ ও সফলতা-ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেছেন ঢাকা টাইমসের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে।

ঢাকা টাইসম: এ যাবৎ জনস্বার্থে মামলা করে কতটি রায় নিজের পক্ষে পেয়েছেন?

ইউনুছ আলী আকন্দ: আনুমানিক দুই শ মামলা করেছি। এর মধ্যে নিজের পক্ষে রায় পেয়েছি ৪০ থেকে ৫০টি মামলার। সম্প্রতি করোনাভাইরাস নিয়েও একটি মামলা করেছি। সেটাতেও নিজের পক্ষে আদেশ পেয়েছি। বিদেশ থেকে বিমান, স্থল, নৌপথে যারা বাংলাদেশে আসবে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। এরপর সুস্থ হলে বাড়ি যাবে।

সুস্থ্ না হলে আবার তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে মর্মে আদেশ পেয়েছি হাইকোর্টের। ২০২০ সালে নিজের পক্ষে রায় পেয়েছি। আদালত ৫টি নির্দেশনা দিয়েছেন। এ আদেশগুলো সরকার মানছে না। যার কারণে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। এগুলো করি, কিন্তু হাইকোর্ট বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করে।

ঢাকা টাইমস: জনস্বার্থের কোন কোন মামলায় রায় পেয়েছেন?

ইউনুছ আলী আকন্দ: সারা দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (কলেজ) ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে সংসদ সদস্যরা থাকতে পারবেন না। এমন রায় পেয়েছি রিট করে। আমিই এ রিট করেছি। এ রিটের কারণে অনেকেই উপকৃত হয়েছেন। হরতাল বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে রিট করে রায় পেয়েছি। বামদের আন্দোলন ও মিছিলে পুলিশ পিপার স্প্রে করত, আমি রিট করে সেগুলো আটকে দিয়েছি। হাইকোর্ট মিছিলে স্প্রে না করার নির্দেশনা দিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষার্থেীদের বিষয়ে রিট করে আদেশ পেয়েছি।

ঢাকা টাইমস: জনস্বার্থের মামলা করতে গেলে অনেক খরচ হয়, সেটা জোগান দেয় কে?

ইউনুছ আলী আকন্দ: নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে মামলা করি জনস্বার্থে। আমি মামলা-মোকাদ্দমায় মক্কেলের পক্ষে আইনি সেবা দিয়ে যা আয় করি তার কিছু অংশ জনস্বার্থের মামলার ব্যয় করি। এটি করা উচিত। কারণ আমি এ দেশের নাগরিক। জনস্বার্থের মামলা মূলত সরকারের বিপক্ষে যায়। জনগণ উপকৃত হয়। আমার আয়ের একটা অংশ থেকে মামলাগুলো করি। এসব করেও আমার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আদেশ দেয়া হয়েছে, সবই জনস্বার্থের মামলায়। এর আগে অমি ভালোই ছিলাম। এখন জনস্বার্থে মামলা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছি। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।

ঢাকা টাইমস: জনস্বার্থে মামলা, আপনি ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝামেলা হবে কেন?

ইউনুছ আলী আকন্দ: জনস্বার্থে মামলা সব সময় সরকারের বিপক্ষে যায়। এজন্য যারা সরকারদলীয় তাদের অনেকেই আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। জনস্বার্থের মামলা করে আমার শত্রু বেড়ে গেছে। আমার কোনো শত্রু ছিল না। সাংবাদিকরাও মাঝে মাঝে আমার দুর্বলতা খুঁজে রিপোর্ট করে। একটি পত্রিকা লিখেছে আমাকে নাকি আপিল বিভাগ বলেছে আমি অভ্যাসগতভাবে আদালত অবমাননা করি। এটি ঠিক না। আমি একবার একটি জনস্বার্থের মামলায় আদালত উপস্থিত ছিলাম না। এজন্য আমার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আদেশ দেন। আমি কোর্টে গেলে হয়তো এ রকম আদেশ হতো না। দশ হাজার টাকা আমার বিরুদ্ধে কস্ট ধরা হয়েছিল। আপিল করলে হয়তো এ আদেশ টিকত না। কারণ আমি তো অফেন্ডার না।

ঢাকা টাইমস: আপনি বলছেন শত্রু বেড়ে গেছে, কোর্ট বিব্রতবোধ করে। যখন-তখন জনস্বার্থের মামলা না করলেই পারেন।

ইউনুছ আলী আকন্দ: এটা আমার অবলিগেশন। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি এটি দায়িত্ববোধ থেকেই করি। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এটা শুধু আমার না, আপনারও। আমাদের সকলের। আইন মান্য করা মানুষের সেবা করা। এটা আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য। এই সেবাটা করা উচিত যারা সরকারের দায়িত্বে আছে। সরকারের কাছ থেকে যারা বেতন পায় তাদের। তারা আমাদের জন্য করে না। করে শুধু সরকারের জন্য, নিজের জন্য।

ঢাকা টাইমস: কত সালে জনস্বার্থের মামলা শুরু করেন?

ইউনুছ আলী আকন্দ: আমি ২০১২ সাল থেকে জনস্বার্থে মামলা করছি। ২০১২ সালে হরতালের কারণে পরীক্ষা বন্ধ ছিল। আমি রিট করেছিলাম। কারণ হরতালে সবাই সমস্যায় পড়ত। হরতালের বিরুদ্ধে রিট করে রুল পেয়েছি। রুল জারির পরে মিডিয়ার আমার নাম ব্যাপকভাবে প্রচার হলো। ভালো করে কাভারেজ দিয়েছে মিডিয়া। তখন আবার চিন্তায়ও পড়ে গেলাম, বিরোধী দল কী যেন করে আমাকে। হরতাল বন্ধ করলে তো বিরোধী দল শত্রু হয়ে গেল। আমি রিট করে এমপিদের বাণিজ্য বন্ধ করে দিলাম। এমপিরা এখন আমার বিপক্ষে। এমপিদের বিরুদ্ধে মামলা করায় প্রয়াত আব্দুল মতিন খসরু আমার বিরুদ্ধে আদালতে দাঁড়িয়েছেন। মতিন খসরু, মনসুরুল হক চৌধুরী, এ এম আমীন উদ্দিন, ফিদা এম কামাল- সবাই আমার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।

ঢাকা টাইমস: আপনার এ রকম কার‌্যক্রম কি আরও চলবে?

ইউনুছ আলী আকন্দ: আমি অসহায় মানুষদের পক্ষে। তাদের দেখার কেউ নাই। আমার বিবেকে যত দিন বাধা দিবে তত দিন আমি জনস্বার্থের মামলা করে যাব। আমাকে ফাইন (জরিমান) করে কোনো লাভ হবে না। আমি জনস্বার্থের মামলা করেই যাব। আমি এখন পর‌্যন্ত একটা টাকাও ফাইন হিসেবে জমা দেইনি। বরং আমিই আরও সরকারের কোষাগার থেকে নিয়েছি ১৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশের ইতিহাসে কেউ নিতে পেরেছে? আমি নিয়েছি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের দুর্নীতি প্রমাণ করে আমি টাকা নিয়েছি। যেটা বাংলাদেশের কেউ পারবে না। জনস্বার্থের মামলাগুলো প্রমাণ করতে হলে মেধা লাগে, সাধনা লাগে। সবকিছুই লাগে।

(ঢাকাটাইমস/৩০এপ্রিল/এএইচএম/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :