মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে হেফাজত?

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২১, ২০:৩৪ | প্রকাশিত : ২০ আগস্ট ২০২১, ২০:২১

কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক আলোচিত-সমালোচিত সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির মাওলানা জুনাইদ বাবুনগরীর ইন্তেকালের দিনই বৃহস্পতিবার রাতে ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। মজলিসে শূরার সিদ্ধান্তে বাবুনগরীর জানাজায় তার নাম ঘোষণা করা হয়। আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন এই কান্ডারির নেতৃত্বে নানামুখী চাপে পড়ে অস্তিত্ব হারাতে বসা হেফাজতে ইসলাম কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে সেটা নিয়ে এখন সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলছে।

ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পাওয়া মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী জুনাইদ বাবুনগরীর মামা হন। জুনাইদ বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন কমিটিতে তিনি হেফাজতের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। এছাড়া আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতের কমিটিতেও তিনি ছিলেন সিনিয়র নায়েবে আমির।

মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর বয়স প্রায় ৯০ বছর। তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরের মহাপরিচালকের দায়িত্বে আছেন। চট্টগ্রামের বাইরে তার তেমন প্রভাব না থাকলেও হাটহাজারী মাদ্রাসা বলয়ের আস্থাভাজন হওয়ায় তিনি ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পেয়েছেন।

মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এর আগেও বিভিন্ন সময় আলোচিত হন। তিনি মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে ইসলামী ঐক্যজোট বিএনপি জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর তিনি পদত্যাগ করেন। এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জানাজার নামাজে ইমামতি করেও তিনি আলোচনায় আসেন।

মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী হেফাজতে ইসলামের তৃতীয় আমির। প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর ইন্তেকালের কয়েক মাস আগে থেকে শফীপন্থীদের সঙ্গে জুনাইদ বাবুনগরীপন্থীদের বিরোধ বাড়তে থাকে। তখন মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী আল্লামা শফীর বিরোধী বলয়ে নেতৃত্ব দেন। আল্লামা শফীর পরে তিনিই আমির হবেন এমন গুঞ্জন থাকলেও শেষ পর্যন্ত তার ভাগিনা জুনাইদ বাবুনগরী আমির নির্বাচিত হন। আর তাকে করা হয় প্রধান উপদেষ্টা। গত মার্চে নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে চাপে পড়া হেফাজত এক পর্যায়ে কমিটি বিলুপ্ত করতে বাধ্য হয়। পরে পাঁচ সদস্যের যে আহ্বায়ক কমিটি করা হয় সেখানেও মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ছিলেন।

আল্লামা শফী গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইন্তেকাল করেন। তার ইন্তেকালের পরপর হাটহাজারী মাদ্রাসায় কাউন্সিলের মাধ্যমে হেফাজতের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। সেই কমিটিতে আমির নির্বাচিত হন জুনাইদ বাবুনগরী, আর মহাসচিব হন নূর হোসাইন কাসেমী। আমির ও মহাসচিবের বলয়ের লোকজন একচেটিয়া কমিটিতে জায়গা পান। আল্লামা শফীর ছেলে আনাস মাদানীসহ এই পন্থী কাউকে রাখা হয়নি সেই কমিটিতে। শফীপন্থীরা বিকল্প কমিটি করবেন ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত তাদের কমিটি আলোর মুখ দেখেনি।

এদিকে গত মার্চে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানানোর বিরোধিতায় মাঠে নামে হেফাজত। তাদের ডাকা হরতালকে ঘিরে ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক তাণ্ডব ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কয়েকজন মারা যান, আহত হন কয়েক শ। এই ঘটনার জেরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরপাকড়ের শিকার হয় হেফাজত। একে একে গ্রেপ্তার হতে থাকেন সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা। সব মিলিয়ে হেফাজতের অর্ধশতাধিক কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে প্রচণ্ড চাপের মুখে কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে পাঁচ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন আমির জুনাইদ বাবুনগরী।

গত ৭ জুন হেফাজতের ৩৩ সদস্যের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। আগের কমিটির মধ্যে যারা বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক ছিলেন, তাদের সবাইকেই বাদ দেওয়া হয়। তবে নতুন কমিটি তেমন আলোচনায় আসতে পারেনি। মাসখানেক আগে জুনাইদ বাবুনগরীর নেতৃত্ব একটি প্রতিনিধি দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে বৈঠক করে। সেই বৈঠকে সরকারের সঙ্গে কিছু ‘বোঝাপড়া’ হয় বলে গুঞ্জন আছে। এরপর হেফাজতের বেশ কয়েকজন নেতা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। গত মার্চের পর কার্যত হেফাজতে ইসলামের দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি নেই। বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম।

গত বছর সেপ্টেম্বরে হেফাজতের মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী ইন্তেকাল করেন। পরে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন মাওলানা নূরুল ইসলাম। হেফাজতের নতুন কমিটিরও তিনি মহাসচিব পদে বহাল থাকেন। বাবুনগরী ইন্তেকালের পর আমির হিসেবে তার নাম উঠে এলেও সংগঠনে তার গ্রহণযোগ্যতা তেমন নেই। ফলে আমির করা হয়নি। তার বাড়ি চট্টগ্রামে হলেও থাকেন ঢাকায়। খিলগাঁওয়ে তিনি মাদ্রাসা পরিচালনা করেন। হেফাজতের আমিরের পদটি চট্টগ্রামের বাইরে কোথাও যাক এটা আপাতত চাচ্ছে না হাটহাজারী বলয়।

মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে হেফাজত কতটুকু ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, এমন প্রশ্নে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় দায়িত্বে থাকা একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘কতটুকু ঘুরে দাঁড়াতে পারবে সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে হেফাজত আর আগের সেই ইমেজ ফিরে পাবে না। কারণ ইতিমধ্যে কিছু হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। তাছাড়া এখন যারা শীর্ষ পদে আছেন তারা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কতটুকু সামনে এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখেন সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে।’

হেফাজতের এই নেতা বলেন, ‘মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ঠিক আছে। কিন্তু তার বয়স প্রায় ৯০ বছর। তিনি থাকেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তিনি সংগঠনকে খুব বেশি কিছু দিতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না।’

হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১০ সালে। সেই সময় নারী নীতিমালার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে সংগঠনটির যাত্রা। তবে সংগঠনটি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করে ২০১৩ সালে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে ইসলাম সম্পর্কে কটূক্তি হচ্ছে এমন অভিযোগ তুলে ওই বছরের ৬ এপ্রিল সংগঠনটি ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ করে। তাদের এই শোডাউন ব্যাপক নজর কাড়ে বিভিন্ন মহলের। তবে এর ঠিক এক মাস পর ৫ মে ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচিতে শাপলা চত্বরে অবস্থানকালে মধ্যরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে পালাতে বাধ্য হন হেফাজতের নেতাকর্মীরা। এরপর সংগঠনটি অনেকটা চুপসে যায়।

হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির ছিলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। তার ব্যক্তিত্বের কারণে সারাদেশের মানুষ তাকে সমীহ করতো। পরবর্তী সময়ে সরকারের সঙ্গেও দেশের শীর্ষ এই আলেমের সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। তার নেতৃত্বেই কওমি মাদ্রাসা দাওরায়ে হাদিসের সনদের সরকারি স্বীকৃতি পায়। এমনকি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শোকরিয়া মাহফিলে প্রধানমন্ত্রীকে ‘কওমি জননী’ উপাধিও দেন আলেম-উলামারা। মূলত আল্লামা শফীর ইন্তেকালের পর হেফাজতে রাজনৈতিক আলেমদের নিয়ন্ত্রণ চলে আসায় সংগঠনটি সরকারবিরোধী অবস্থানে চলে যায়।

(ঢাকাটাইমস/২০আগস্ট/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :