যে নিয়মে পানি পান করলে উপকার মেলে

সুস্বাস্থ্যের জন্য পানি অত্যাবশ্যক। মানুষের জীবনে অক্সিজেনের পরেই পানির স্থান। শরীরের ৭২% হলো পানি। এমনকি হাড়ের এক-চতুর্থাংশ, পেশির তিন-চতুর্থাংশ ও মস্তিষ্কের ৮৫% পানি দিয়ে গঠিত। রক্ত ও ফুসফুসের ৮০% পানির তৈরি। সুস্থ ও সবলভাবে বেঁচে থাকার জন্য পানি পানের কোনো বিকল্প নেই। পানি কিডনির মাধ্যমে আপনার শরীরের সব ক্ষতিকারক উপাদান দূর করে দেয়।
পানি খাদ্য ভাঙতে সাহায্য করে, যাতে আপনার শরীর খাবার থেকে পুষ্টি শোষণ করতে পারে। পানি কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। তবে চিনি যুক্ত পানীয় না পান করাই ভাল। চিনি পূর্ণ পানীয়র পরিবর্তে সম্ভব হলে পানি বেছে নিন।
খাবার খেতে খেতে পানি পান করলে খাবার হজম হতে দেরি হয়। পাকস্থলীতে তৈরি হওয়া অ্যাসিড হজম প্রক্রিয়া ত্বড়ান্বিত করে। খেতে খেতে পানি পান করার ফলে অ্যাসিডের ঘনত্ব কিছুটা হলেও কমে যায়। তাহলে কখন পান করবেন পানি। পানি পান করার বিশেষ কিছু নিয়ম আছে।
পানি পান করার পদ্ধতি ও শরীরে পানির প্রয়োজনীয়তা না জানলে তা বিপদ ডেকে আনে বলেই দাবি চিকিৎসকদের। তাদের মতে, শরীরের পেশী, হাড়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান, সব কিছুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই পানি পান করতে হবে। পানি তেষ্টা পেল, আর যেমন অবস্থাতেই থাকি না কেন, পানি পান করে নিলাম— এ নিয়মে বিপদ আছে বলে আশঙ্কা চিকিৎসক মহলে।
খেতে খেতে পানি পান করার ফলে অ্যাসিডের ঘনত্ব কিছুটা হলেও কমে যায়। খাবার হজম হতে অনেক দেরি হয়। তাই খাওয়ার আগে এবং খেয়ে ওঠার কিছুক্ষণ পর পানি পান করেন অনেকে।
চিকিৎসকের মতে, পানি হজমের প্রক্রিয়ায় অসুবিধা করে না। উল্টো খাবারের সময় বা পরে পানি পান খাদ্য হজমে সহায়তা করে।
তবে সব থেকে ভাল যদি খাবার খাওয়ার কিছু সময় আগে এক গ্লাস পানি পান করা হয়। এতে শরীরের হজম ক্ষমতা ভাল হয়। খেতে বসে, খেতে খেতে খাওয়ার এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি থাকে বাচ্চাদের মধ্যে। কারণ অধিকাংশ বাচ্চাই ঠিকমতো খেতে চায় না।
খাওয়ার মাঝে বাহানা হিসেবেই তারা এভাবে পানি পান করে। অধিকাংশ মা-বাবার ধারণা খাওয়ার সময় পানি পান করলে বাচ্চার শরীরে সঠিক পরিমাণে পুষ্টি যায় না। এই ধারণা একরকম ভুল বলেই মত পুষ্টিবিদদের। খাওয়ার মাঝে এক চুমুক দিয়ে পানি পান করা মোটেই অস্বাস্থ্যকর নয়। যদি না তা কার্বোনেটেড ড্রিংক্স হয়।
স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া করেন এমন সুস্থ-সবল মানুষ, তার ওজন ও কাজের ধরনের উপর নির্ভর করে, দিনে ৩-৪ লিটার এমনকি ৫-৬ লিটার পর্যন্ত পানি পান করতে পারেন। তবে ঠান্ডা ঘরে এসির মধ্যে শুয়ে-বসে থাকা মানুষ যদি লিটার লিটার পানি খেতে শুরু করেন, সমস্যা আছে। কম লবণ খেলে তো বিশেষ করে দিনে ৩-৪ গ্রামের মতো লবণ ও ৫-৬ লিটার পানি পানি পান করা মোটে ভাল নয়। বেশি বয়সে ও কিডনি কম কাজ করলে বিপদ আরও বেশি।
কিডনি বিশেষজ্ঞের মতে, দিনে যত গ্রাম লবণ খাবেন, পানি খেতে হবে মোটামুটি তত লিটার। সুস্থ-সবল কমবয়সী মানুষ ৫-৭ গ্রামের মতো লবণ খেলে ৫-৭ লিটার পর্যন্ত পানি পান করতে পারেন। কোনও কারণে কম লবণ খেতে হলে সেই হিসেবে পানি খাওয়া না কমালে রক্তে সোডিয়াম কমে বিপদ হতে পারে। বাড়াবাড়ি হলে সোডিয়াম বিপদসীমার নিচে নেমে গিয়ে হাইপোন্যাট্রিমিয়ার মতো সমস্যা হওয়াও বিচিত্র নয়।
হাইপোন্যাট্রিমিয়া হলে প্রথমে গা-বমি করে বা বমি হয়, ক্লান্ত লাগে, বারবার মূত্রত্যাগ করতে হয়, মাথা ব্যথা করে। আচমকা আচ্ছন্ন বা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তে পারেন। বয়স্ক মানুষদের সমস্যা বেশি হয়। সঙ্গে ভুলে যাওয়ার অসুখ থাকলে বিপদ বাড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে সামান্য কিছু ক্ষেত্রে রোগী মারা যান। খুব কম সময়ে প্রচুর পানি খেয়ে নিলে সামান্য কিছু ক্ষেত্রে চরম বিপদ হতে পারে।
অনেক বেশি পানি পান করলে রক্তকে পাতলা করে পরিমাণে বাড়িয়ে এক দিকে যেমন ইলেক্ট্রোলাইট ইমব্যালেন্সের সূত্রপাত করে, সঙ্গে চাপ বাড়ে শিরা-ধমনি ও হৃদযন্ত্রে। খাটনি বাড়ে কিডনির। ১-২ ঘণ্টার মধ্যে ৭-৮ লিটার পানি পান করলে সমস্যার জের মস্তিষ্কে পৌঁছে যায় কখনও। হালকা মাথা ব্যথা থেকে শুরু করে শ্বাসকষ্ট বা মৃত্যুও হতে পারে। কাজেই পানি পান করুন মেপে।
কী ধরনের খাবার খাচ্ছেন তার উপরও নির্ভর করে পানির চাহিদা। ঘরে কম তেল-লবণ-মশলায় রান্না করা সুষম খাবার খেলে কম পানি পান করলেই হয়। আর ফাস্ট ফুড বা প্রসেসড ফুডে প্রচুর লবণ থাকে বলে এ সব নিয়মিত খেলে পানি পান বাড়াতে হয়।
চিকিৎসকের মতে, শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে পানি পান করা উচিত তেষ্টা পেলে। ডায়াবেটিস থাকলে অনেক সময় শরীরে পানির চাহিদা না থাকলেও তেষ্টা পায়। কিডনি ঠিক থাকলে তাতে ক্ষতি নেই। কারণ যত বার প্রস্রাব হয় তার সঙ্গে কিছুটা করে সুগার বেরিয়ে গিয়ে উন্নতিই হয় রোগের।
তবে হার্ট ফেলিওর, ক্রনিক কিডনির অসুখ, অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ ইত্যাদির কারণে যাদের লবণ কম খেতে হয়, তাদের পানির ব্যাপারে সতর্ক থাকা দরকার। ঠান্ডা ঘরে সময় কাটালে হুটহাট পানি পান করার বদলে এক-আধবার চা খেয়ে তেষ্টা মেটালে কোনও ক্ষতি নেই। আবার অত পানি খেতে ভাল লাগে না বলে মাঝেমধ্যে যে স্যুপ, ঘোল, ফলের রস, চা-কফি খাওয়া হয়, তার হিসেবও পানির মধ্যে ধরতে হবে। কারণ দিনে ৩-৪ লিটার তরলের চাহিদা যে স্রেফ পানি দিয়েই মেটাতে হবে, এমন কিন্তু নয়।
ভারী খাবার গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে যদি পানি পান করেন, তাহলে বিভিন্ন এনজাইমগুলো সঠিক মাত্রায় খাবারের সঙ্গে মিশতে পারবে না। ফলে হজম প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়, যা কিনা সকল রোগের উৎস! খাওয়ার ৪০ মিনিট পরে একটি লেবুর রস হালকা কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে পান করুন। স্ট্রোক বা হার্ট এটাক এড়াতে ঘুমের কিছুক্ষণ আগে সামান্য পানি পান করবেন।
চিকিৎসকদের মতে, দাঁড়িয়ে পানি খাওয়ার চেয়ে বসে পানি খাওয়া অনেক বেশি স্বাস্থ্যসম্মত। রক্তচাপ, স্নায়বিক ক্রিয়াকলাপ, কিডনির কার্যকারিতা ইত্যাদি নানা দিক পরীক্ষা করে দেখেছেন, বসে পানি করাই উত্তম।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, খালি পেটে পানি পান করলে অনেক রোগ থেকেই মুক্ত থাকা যায়।
ঘুম থেকে উঠে বাসি মুখে পানি পানের উপকারিতাও অনেক বেশি। এটা যদি অভ্যেস করতে পারেন, তাহলে অনেক রোগই আপনার পিছু ছাড়তে বাধ্য হবে। তবে পান করতে হবে ৪-৫ গ্লাস পানি। প্রথম দিকে এতটা সম্ভব না হলে ১-২ গ্লাস দিয়েই শুরু করুন। পানি পানের এই অভ্যেস আপনার রক্ত পরিষ্কার রাখবে। এতে শরীরের পেশি ভাল থাকবে, শরীরে নতুন কোষ তৈরি হবে। মেটাবলিজম রেটও প্রায় ২৪ শতাংশ বাড়বে। হজমশক্তি বাড়বে। সব মিলিয়ে আপনি সারদিন ধরে তরতাজা থাকবেন।
(ঢাকাটাইমস/২০ সেপ্টেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































