মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২২, ২০:৩৪ | প্রকাশিত : ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৪:১০

দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার লাইফ-লাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। যা ব্যবহার করে ৩৬টি জেলায় যেতে হয় মানুষকে। তীব্র যানজটের কারণে যে সড়ক মানুষের কাছে উৎকণ্ঠার ছিল, এখন তা অনেকটাই স্বাভাবিক। এই ম্যাজিকে যার কৃতিত্ব দেখছেন জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ স্থানীয় মানুষ, তিনি হচ্ছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ- জিএমপি কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম। এমন কথাই বলছেন গাজীপুর মহানগরবাসীসহ ওই সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারীরা। তার দক্ষ পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের প্রশংসা এখন নগরবাসীর মুখে মুখে।

মোল্যা নজরুল গত ১৩ জুলাই জিএমপি কমিশনারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এর আগেও তিনি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও সিআইডিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। যার প্রশংসা এখনো তার সহকর্মীরাসহ বিভিন্ন মহল করে থাকেন।

  • অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জিএমপি কমিশনার মোল্যা নজরুলের বহুমুখী উদ্যোগের প্রশংসা নানা মহলে
  • যানজট নিয়ন্ত্রণ করায় বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি থেকে রেহাই পেল দেশ
  • আব্দুল্লাহপুর-গাজীপুর চৌরাস্তা যেতে আগে লাগত আড়াই ঘণ্টা, এখন লাগে ৩০-৪০ মিনিট

স্থানীয়রা বলছেন, এই মহাসড়কের গাজীপুর অংশে অসহনীয় যানজটে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল মানুষকে। আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত যেতে সময় লাগত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। এখন লাগে ৩০-৪০ মিনিট।

এই যানজট নিয়ন্ত্রণের মধ্যদিয়ে গাজীপুর ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক অঞ্চল সংশ্লিষ্টদের দুর্ভোগের মাত্রা অনেকাংশে কমল। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর ফলে দুর্ঘটনা থেকে মানুষ ও যানবাহন রক্ষা পাচ্ছে। বর্তমান জিএমপি কমিশনার যোগদানের আগের ছয় মাসে ওই সড়কে দুর্ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। তবে তিনি যোগদানের পরবর্তী দুই মাসে দুজন ব্যক্তির প্রাণ যায় ওই সড়কে। যানজট নিয়ন্ত্রণ হওয়ায় বন্ধ হয়েছে যানজটে আটকে থেকে অকারণে গাড়ির তেল পোড়া । এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বড় বড় শিল্পকারখানা ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা দ্রুত পৌঁছাতে পারছেন। কাজের গতি বেড়েছে। সঞ্চার হয়েছে অর্থনৈতিক গতিও। জিএমপি বলছে, এই যানজট নিরসনের ফলে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির হাত থেকে নিরাপদ হলো দেশ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, মহাসড়কের পাশের অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ, অবৈধ ইজিবাইক-অটোরিকশাসহ তিন চাকার যানবাহন নিয়ন্ত্রণের ফলে যানজট নিরসন হয়েছে। ফলে কৃষিপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং শিল্পজাত পণ্যসামগ্রী সহজে ও স্বল্প ব্যয়ে পরিবহন করা যাচ্ছে। দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্প ও ব্যবসার প্রসার ঘটছে। যা জীবন ও জীবিকায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন- জিসিসির ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ আলাপকালে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জিএমপি কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম মাদকের বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছেন, সত্যিই তা প্রশংসার দাবিদার।

ভারপ্রাপ্ত মেয়র আরও বলেন, সন্ত্রাস নির্মূল, চাঁদাবাজি বন্ধ ও যানজট নিরসনে জিএমপি কমিশনারের নেওয়া উদ্যোগের ইতিবাচক সুফল নগরবাসী পেতে শুরু করেছেন।’

এদিকে জিএমপি কমিশনারের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. গিয়াসউদ্দিন মিয়া বলেন, ‘গাজীপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেকোনো সময়ের তুলনায় পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জিএমপি কমিশনার দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।’

মাদক ও অপরাধমুক্ত নিরাপদ সিটি গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে জিএমপি কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, এটি একটি টিমওয়ার্ক। আমি টিম লিডার হিসেবে কাজ করছি। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের টিম এগিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যাশা করছি, এই ধারা অব্যাহত রেখে আগামী এক বছরের মধ্যে গাজীপুর মহানগরকে পুরোপুরি নিরাপদ বাসযোগ্য নগরীতে রূপ দিতে পারব। তিনি বলেন, এ অর্জন আমার একার নয়, টোটাল টিমের। আমরা যে গতিতে কাজ করছি তা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে সফলতার নতুন মাত্রা যোগ হবে গাজীপুর পুলিশে। বাংলাদেশ পুলিশ তথা সরকার জনগণকে যে পুলিশিং উপহার দিতে চায়, জিএমপি তা উপহার দিতে সক্ষম হবে।

তিনি বলেন, আমরা যানজট নিরসনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক গতি সঞ্চার করতে পেরেছি। ট্রাফিকিং ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটা কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। মানুষের উৎকণ্ঠা কমেছে। মহাসড়ক থেকে তিন চাকার গাড়ি তুলে দিয়েছি। এতে যানজট কমেছে।

মাদক নির্মূলে নেওয়া উদ্যোগ সম্পর্কে মোল্যা নজরুল বলেন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ অপরাধী হয়ে ওঠার মূলে রয়েছে মাদক। তাই মাদক নির্মূলে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। সামান্য মাদক নিয়ে কেউ ধরা পড়লেও ওই মাদকের প্রাপ্তিস্থানসহ এর সাথে জড়িত গোটা সাপ্লাই চেইন চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। মাদকের উৎস ও সরবরাহে জড়িতদের গ্রেপ্তার চলমান থাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে। অচিরেই সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত হবে গাজীপুর সিটি, আশাবাদ ব্যক্ত করেন মোল্যা নজরুল।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে মাদক বাইরের দেশ থেকেই সাধারণত আসে। সামান্য মাদক নিয়ে ধরা পড়া মামলা তদন্ত করে দেখা গেছে এর নেটওয়ার্ক সীমান্ত পর্যন্ত। আমরা ওই নেটওয়ার্কে জড়িতদের শনাক্তের খুব কাছাকাছি। শিগগিরই সীমান্তের ওই মাদকের সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক ধরা পড়বে বলেও প্রত্যাশা তার।

জিএমপির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিজিএমইএ ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. নাসির উদ্দিন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘চাইলেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন জিএমপি কমিশনার। আমরা এখন নিরাপদে ব্যবসা করছি। নিরাপদবোধ করছি। এখন আর সন্ত্রাসী চাঁদাবাজের দৌরাত্ম্য নেই।’

জিএমপির সিটিএসবি অ্যান্ড প্রটেকশন ডিভিশনের ডিসি মো. আরিফুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘কমিশনার স্যার অত্যন্ত ডায়নামিক ইনোভেটিভ অফিসার। তার মধ্যে পুলিশ ইনক্লুসিভ লিডারশিপ ও সকলকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বিচক্ষণ নেতৃত্বগুণ ও হোল সোসাইটি হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ খুঁজে পাই। স্যারের সঙ্গে কাজ করতে পেরে খুব ভালো লাগছে।’

এদিকে গাজীপুর সিটি বাসিন্দা মো. আলামিন হাওলাদার। স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। ঢাকা টাইমসের সাথে আলাপকালে বলেন, ‘কোনো সমস্যা হলে এখন আমরা পুলিশের কাছে যেতে ভরসা পাই। জিএমপির বর্তমান কমিশনার আসার পরেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে এখন অনেক ভালো।’

স্থানীয় সিএনজিচালক আলমগীর জানান, আগে সিএনজি স্ট্যান্ডে রাখলে চাঁদা দিতে হতো, এখন চাঁদা দিতে হয় না।

এদিকে গত ২৯ সেপ্টেম্বর জিএমপি সদর দপ্তর পরিদর্শনে আসেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ। এসময় তিনি আইশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও যানজট নিরসনে জিএমপি কমিশনারের নেওয়া বহুমুখী উদ্যোগের প্রশংসা করেন। অন্যদিকে জিএমপি সদর দপ্তর পরিদর্শন করে জিএমপি কমিশনারের গৃহীত সড়কে শৃঙ্খলা আনয়ন কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন ঢাকা রেঞ্জের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাবিবুর রহমানও।

জিএমপির দুই মাসের অর্জন

গাজীপুর সিটির মাদক ব্যবসার অন্যতম হোতা হচ্ছে মধু ও তার পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বছরের পর বছর চলছিল তাদের রমরমা মাদক ব্যবসা। সম্প্রতি সেই মধু, তার স্বামী, ছেলে, মেয়ে ও জামাতাকে গ্রেপ্তার করেছে জিএমপি। এছাড়া সন্ত্রাসী কার্যক্রম, চাঁদাবাজি ও জমি দখলসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ১৬টি মামলার আসামি রবিন সরদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুই চাঁদাবাজকে হাতেনাতে গ্রপ্তারের পর বন্ধ হয়েছে সিএনজি স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি।

জিএমপি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ জুলাই থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মহানগরীটিতে ১২৩টি মাদক মামলা হয়। গ্রেপ্তার হয় ৩০৬ জন। এই সময়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার মামলা হয় ৯টি। গ্রেপ্তার হয় ১৭ জন। উদ্ধার করা হয় একটি রিভলবার, তিনটি পিস্তল ও গুলি। ছিনতাইয়ের মামলা হয় তিনটি, গ্রেপ্তার চারজন। ছিনতাই প্রস্তুতির সময় গ্রেপ্তার করা হয় ৩২ জনকে। ডাকাতির মামলা হয় তিনটি, গ্রেপ্তার হয় পাঁচ জন। ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় ৯৩ আসামিকে। এছাড়া যানজট নিরসনে ও সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যানবাহনের বিরুদ্ধে ২ হাজার ১৪২টি মামলা করা হয়।

২০১৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর ১২৮ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে যাত্রা শুরু করে জিএমপি। এই মেট্রোপলিটন সিটির জনসংখ্যা সরকারি হিসাবে ১০ লাখ।

প্রসঙ্গত, পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক, জিএমপি কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম ২০তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০০১ সালে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। ২২ বছরের চাকরি জীবনে সাহসিকতা ও দক্ষতার জন্য পুলিশের সর্বোচ্চ পদক বিপিএম (বার) ও পিপিএম (বার) অর্জন করেন একাধিক বার। ২০১২ সালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি থাকাকালে সৌদি দূত খালাফ আল আলী, ব্লগার রাজীব, ডা. নিতাই হত্যাকাণ্ডসহ বেশকিছু ক্লুলেস খুনের রহস্য উদঘাটন করেন। ২০১৫ সালে ‘আগুন সন্ত্রাসের’ এক কঠিন পরিস্থিতিতে তাকে জয়পুরহাট জেলার পুলিশ সুপারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখান। ২০১৬ সালে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার তৎপরতায় ধরা পড়ে প্রশ্ন ফাঁসের সর্ববৃহৎ চক্র।

এই অভিযান দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় ‘গুড জব ডান বাই পুলিশ’ হিসেবে ব্যাপক প্রচার পায়। এছাড়া মাদক থেকে মানি লন্ডারিংয়ের প্রথম মামলায় রাষ্ট্রের অনুকূলে মাদক ব্যবসায়ীদের শতকোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করাও তার আরেকটি অর্জন। সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ৩৪২টি নতুন পদ সৃজনে সরকারের সানুগ্রহ অনুমোদন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।

(ঢাকাটাইমস/০৩অক্টোবর/আরআর/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :