চৌদ্দ শিকে প্রদীপ-লিয়াকত এখন যেমন, সাদা-নীল কারা পোশাকে চুমকিও

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারি ২০২৩, ০৮:১০

দোর্দণ্ড প্রতাপ ছিল তাদের। কাঁপাতেন দক্ষিণ-পূর্বের উপকূলীয় জনপদ টেকনাফ। তাদের ভয়ে তটস্ত স্থানীয় বাসিন্দারা। ধরাকে সরা জ্ঞান করা সেই পুলিশ কর্মকর্তা প্রদীপের নাম আসে সিনহা হত্যার পর। তার সহযোগী আরেক পুলিশ কর্মকর্তা লিয়াকত। সিনহা হত্যায় আদালতের প্রাণদণ্ড নিয়ে দুজনেরই ঠাঁই কারা প্রকৌষ্ঠে।

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের হত্যা মামলায় প্রাণে দণ্ডিত পুলিশের বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে। অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় প্রদীপের স্ত্রী চুমকি কারণও ২১ বছরের সাজা নিয়ে বন্দি চট্টগ্রাম কারাগারে। একই মামলায় প্রাণ দণ্ড নিয়ে প্রদীপের সঙ্গে কাশিমপুর কারাগারে বরখাস্ত পরিদর্শক লিয়াকত আলীও।

আলোচিত সিনহা হত্যা মামলায় রায়ের পর কারাগারে প্রদীপের স্বজনরাও তার খোঁজ খবর নেন না। একই ভাবে স্ত্রী চুমকিরও দিন কাটছে কারা নিভৃতে। কারাবিধি অনুযায়ী তারা প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পান। প্রদীপ আর লিয়াকত সপ্তাহে ফোনে একবার কথা বলার সুযোগ পান; নিয়ম অনুযায়ী কথোপকথন রেকর্ড রাখা হয়।

কারা সূত্রে জানা গেছে, অন্ধকার জগৎ দাপিয়ে বেড়ানো প্রদীপ-লিয়াকতের কারাগারে নেই কোনো প্রভাব। স্বজনরাও তেমন একটা খোঁজ নিতে আসেন না। অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য নেই কোনো অনুতাপ।

মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে এই দুইজন বর্তমানে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে রয়েছেন। কারাবিধি অনুযায়ী তারা প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পান, তবে ডিভিশন পাননি। ফোনে সপ্তাহে একবার কথা বলার সুযোগ পান; নিয়ম অনুযায়ী কথোপকথন রেকর্ড রাখা হয়।

আর ২১ বছরের সাজা হওয়ায় প্রদীপ পত্নী চুমকিকে চট্টগ্রাম কারাগারে কয়েদি পোশাকেই থাকতে হচ্ছে। জেলের নিয়ম অনুযায়ী, সাজাপ্রাপ্ত নারী কয়েদিরা সাদা রঙের ওপর নীল স্ট্রাইপ শাড়ি পরেন। নিয়ম মেনে সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে কয়েদির পোশাক পরতে হয়। তিনিও (চুমকি) তাই পরেন। পর্যাপ্ত ঘুমালেও আনলক, লকাপ, গুনতি এগুলোর নিয়ম অনুসরণ করতে হয় তাকে।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাত ৯টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফে মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা। এর পর ৬ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয় প্রদীপ ও লিয়াকতকে।

এরপর গ্রেপ্তার হন প্রদীপ। এক সময় অস্ত্রের মুখে নিরাপরাধ মানুষকে তাড়া করতেন। যাকে খুশি তাকে তুলে এনে নির্যাতন, আটকে রাখার মতো নিপীড়নমূলক কাজ ছিল তার স্বভাবজাত। ধরে এনে অর্থের বিনিময়ে আবার ছেড়েও দিতেন। এমনকি নিজের বোনের বাড়ি দখল করে তাড়িয়েছেন তাদেরকেও।

তবে প্রদীপের এত সব অপকর্ম প্রকাশ্যে আসেনি কখনো। উল্টো টেকনাফ অঞ্চলে কথিত বন্দুকযুদ্ধে পুলিশের দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে স্বীকৃতিও বাগিয়ে নিয়েছেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর ধরা পড়ে যান প্রদীপ কুমার।

তার নির্দেশে বাহারছড়া ক্যাম্পের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত মেজর সিনহাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। সিনহা হত্যায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিতর্কিত ওসি (বরখাস্ত) প্রদীপ কুমার দাশ ও লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত। তবে এ মামলা থেকে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্যসহ সাতজনকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়।

চট্টগ্রাম কারাগার সূত্রে জানা গেছে, কারাগারে সাধারণ খাবারই খান চুমকি। মাঝে মধ্যে ক্যান্টিন থেকে খাবার কিনে খান। সপ্তাহে একদিন মোবাইলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি যে সেলে বন্দি সেখানে সাজাপ্রাপ্ত আরও একাধিক নারী রয়েছেন। তাদের সবাইকে আলাদা নজরদারির মধ্যে রাখে কারা কর্তৃপক্ষ।

চুমকি ইস্যুতে কারাগারের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘স্বামী মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিয়ে কারাগারে। আবার স্বামীর অপকর্মের কারণে তাকেও কারাগারে থাকতে হচ্ছে। এসব নিয়ে অনুশোচনা চুমকির মধ্যে আছে। কারাগারে এলে আর আটকা থাকলে সবার মধ্যে অনুশোচনা তো থাকেই। চুমকিকেও প্রায়ই মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখা যায়।’

প্রদীপ কুমার দাশ পুলিশের চাকরির পাশাপাশি বিভিন্ন অপকর্ম করে স্ত্রী-সন্তানের জন্য গড়েছিলেন সম্পদের পাহাড়। সেসব সম্পদ দিয়েছিলেন স্ত্রী চুমকি কারণের নামে। কিন্তু অবৈধ সম্পদ রক্ষা করতে পারেননি এই দম্পতি।

দুদকের মামলায় প্রদীপেরও ২০ বছরের সাজা হয়েছে। গতবছরের ২৭ জুলাই চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ মুন্সী আবদুল মজিদের আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। আদালত উভয় আসামিকে চার কোটি টাকা করে অর্থদন্ডও দিয়েছে। একই রায়ে তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাশিমপুর কারাগারের একজন কর্মকর্তা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘কাশিমপুর কারাগার দেশের একমাত্র সেল সিস্টেম কারাগার। সরকারি দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ফাঁসির আসামিদের দেখভাল করা হয়। প্রদীপের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো দিকনির্দেশনা নেই।’

‘অন্যান্য সাধারণ ফাঁসির আসামির মতোই আছেন। নির্ধারিত পোশাক পরিয়ে তাকে সেলে রাখা হয়েছে। অন্যরা যেমন আছেন তিনিও তাই থাকবেন। কারাগারের ঊধ্বর্তনরা সপ্তাহে একদিন তার খোঁজখবর নেন। তবে শারীরিকভাবে তিনি (প্রদীপ) সুস্থ আছেন।’

প্রদীপের সঙ্গে তার পরিবারের কেউ দেখা করতে আসে কি না প্রশ্নের জবাবে জেলার মোহাম্মদ লুৎফর রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘তার স্বজনরা মাঝে মধ্যে দেখা করতে আসেন। তবে এখন সেটা কম। উনি (প্রদীপ) সপ্তাহে একদিন দশমিনিট করে স্বজন এবং আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে পারেন; আর সেটা তিনি করেন।’

লিয়াকতের উত্থান:

ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পেয়ে কক্সাবাজারের বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রে যোগদানের সাত মাসের মধ্যেই তিনি এলাকায় হয়ে ওঠেন মূর্তিমান আতঙ্ক। মাদক কিংবা মানবপাচারের অভিযোগ তুলে যাকে-তাকে ধরে নিয়ে যেতেন।

আটকে রেখে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে আদায় করতেন অর্থ। টাকা নিয়েও অনেককে ক্রসফায়ারের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। একসময়ের দাপুটে ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী এখন মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে কনডেম সেলে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা চাকরিজীবনে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রভাব দেখিয়েছেন সর্বত্র। বিশেষ করে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশের সঙ্গে সুসম্পর্কের সুবাদে জড়িয়েছেন ভয়ংকর সব অপরাধে। মাদক কারবার, সিএনজি টার্মিনাল, গ্রাম্য সালিশ, মাছের ঘাট-আড়ত যেখানে সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই হাত দিয়েছেন। প্রতি মাসে তার নামে উঠত চাঁদা।

স্বেচ্ছাচারিতায় বেপরোয়া হয়ে ওঠা লিয়াকত আলী যেন ছিলেন সব জবাবদিহির ঊর্ধ্বে। কিন্তু আটকা পড়েন সেনাবাহিনীর মেজর (অব.) সিনহাকে হত্যা করে। আদালতের ভাষ্য, মেজর (অব.) সিনহাকে পরিকল্পিতভাবে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করেন পুলিশের ইনস্পেক্টর লিয়াকত আলী।

কারাগারে লিয়াকত যেমন:

সিনহা হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন লিয়াকত আলী। কারাগার সূত্রে জানা গেছে, কনডেম সেলে অন্য আসামিদের সঙ্গেই থাকছেন লিয়াকত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেও তার প্রতি আলাদা করে বাড়তি নজরদারি নেই। কারণ, এই সেলে সব দাগি অপরাধীদের রাখা হয়। সেভাবেই এখানকার নিরাপত্তা আয়োজন সাজানো। সাধারণ অন্য কয়েদিদের মতোই খাবার পান লিয়াকত আলী। দিনের বেশির ভাগ সময় সেলে শুয়ে-বসে সময় কাটে তার। পরিবারের সঙ্গে মাঝেমধ্যে দেখা করার সুযোগ পেয়েছেন বলে জানান কারাগারটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা।

এত অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন লিয়াকত, তার মধ্যে কি কোনো অনুশোচনার লক্ষণ দেখা যায়- জানতে চাইলে কারাসূত্রটি জানায়, ‘না, তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা বোধ নেই। তবে মাঝেমধ্যে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করেন। আর বন্দি পরিবেশও মানিয়ে নিয়েছেন।’

পুলিশে যোগদান ও লিয়াকতের উত্থান:

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব হুলাইন গ্রামের মৃত মো. সাহাব মিয়ার ছেলে লিয়াকত। ছয় ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। ২০১০ সালে পুলিশে যোগ দেন। প্রথমে ডিবি, পরে সোয়াত ও অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটে কাজ করেন। ২০১৮ সালের শেষ দিকে পুলিশ পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পান। এ সময় তিনি টেকনাফ থানায় কর্মরত ছিলেন।

জানা গেছে, লিয়াকত আলী প্রথমে চন্দনাইশ উপজেলায় বিয়ে করেন। ওই স্ত্রীকে তালাক দিয়ে বোয়ালখালীতে আরেক বিয়ে করেন। এই ঘরে তার দুই বছরের এক ছেলে রয়েছে।

(ঢাকাটাইমস/২৩জানুয়ারি/এসএস/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :