ধারাবাহিক তাফসির, পর্ব-১২

কোরআন অস্বীকারকারীদের প্রতি আল্লাহর চ্যালেঞ্জ

মুফতি আরিফ মাহমুদ হাবিবী
| আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৪, ১১:২৯ | প্রকাশিত : ২২ মার্চ ২০২৪, ২১:৫৩

প্রিয় পাঠক,

মহিমান্বিত রমাজানের মাগফিরাত অংশে আমরা প্রবেশ করেছি। কোরআন নাজিলের এই মাসে দয়াময় রবের অশেষ দয়ায় আমরা আজ ১২ তম পারার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলবো ইনশাআল্লাহ।

আগের পর্ব: মুসা-ইউনুস আ. এর আলোচিত তিন ঘটনার শিক্ষা ও অন্যান্য

সুরা হুদ

এটি মক্কি সুরা।' আয়াতসংখ্যা: ১২৩। রুকুসংখ্যা: ১০

বারোতম পারায় দুটি সুরা রয়েছে। সুরা হুদ ও সুরা ইউসুফ। সুরা হুদের মাত্র পাঁচ আয়াত এগারোতম পারায়, অবশিষ্ট সুরা বারোতম পারায় স্থান পেয়েছে।

কোরআনের মহত্ত্ব বর্ণনার মাধ্যমে এ সুরা শুরু হয়েছে। বলা হয়েছে, স্বীয় আয়াত, অর্থ ও বিষয়ের দিক থেকে এই কোরআন (দলিল-প্রমাণ দ্বারা) মুহকাম তথা সুদৃঢ় কিতাব। এতে কোনো ত্রুটি নেই। কোনো ধরনের বৈপরীত্য নেই। মুহকাম হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হল, এমন এক সত্তা এ কিতাবের ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ করেছেন, যিনি হাকিম (প্রাজ্ঞ) ও খবির (সর্বজ্ঞাত)। তার সকল হুকুমই কোনো-না-কোনো হেকমতের উপর ভিত্তিশীল। তিনি মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এবং তার ব্যক্তিগত বিষয়, দুর্বলতা ও প্রয়োজন সম্পর্কে সম্যক অবগত।

তাওহিদ ও তার প্রমাণপঞ্জি কিতাবুল্লাহর মহত্ত্ব বর্ণনা করার পর ঈমানের ভিত্তিমূল-তাওহিদের প্রতি আহ্বান করা হয়েছে। তাওহিদের প্রতি আহ্বানের পর গোটা বিশ্বজগতে ছড়িয়ে থাকা তাওহিদের দলিল-প্রমাণ উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালাই সকল সৃষ্টিজীবকে রিজিক দান করেন। মানুষ, জিন, জীবজন্তু, পাখি, জলস্থলে বসবাসকারী কীট-পতঙ্গ সবকিছুর তিনি রিজিক দেন। তিনিই আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু যারা তার দলিল-প্রমাণ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে না, হঠকারিতাবশত যারা নিজেদের চোখে পট্টি বেঁধে রেখেছে, তারা তাওহিদ অস্বীকার করে থাকে।

আল কোরআনের চ্যালেঞ্জ

যারা কোরআনকে আল্লাহ তায়ালার কালাম বলে স্বীকার করে না সেই অস্বীকারকারীদের চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে যে, কোরআন যদি আসলেই মানবরচিত হতো তা হলে তোমরাও এর মতো দশটি সুরা বানিয়ে নিয়ে এসো।

অস্বীকারকারীদের প্রতি তিন-তিনবার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়।

প্রথমবার সুরা ইসরাতে (আয়াত: ৮৮) কোরআনের মতো একটি পূর্ণ কিতাল আনার চ্যালেঞ্জ করা হয়। দ্বিতীয়বার সুরা হুদে (আয়াত: ১৩) কোরআনের মতো দশাট সুরা বানানোর এবং তৃতীয়বার সুরা বাকারায় (আয়াত: ২৩) ও সুরা ইউনুসে (আয়াত: ৩৮) কোরআনের মতো একটি সুরা বানানোর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কোনোবারই তারা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়নি। এ ছাড়াও এ সুরায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা হয়েছে, নিম্নে তা উল্লেখ করা হল:

মানুষের দুটি শ্রেণি

প্রথম শ্রেণির মানুষের জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে শুধুই দুনিয়া। তারা জীবনকে অধিক থেকে অধিকতর আরামদায়ক বানানোর চিন্তা-ফিকিরে সব সময় মত্ত থাকে। তারা ভুলেও আখেরাতের কথা স্মরণ করে না।

দ্বিতীয় শ্রেণির লোকেরা দুনিয়ার জন্য চেষ্টা-পরিশ্রম করে বটে; তবে তাদের সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টার লক্ষ্য থাকে আখেরাত। তারা আখেরাতকে সামনে রেখেই দুনিয়ার জীবন পরিচালনা করে থাকে। (১৫-১৭)

প্রথম শ্রেণির উদাহরণ অন্ধ ও বধির লোকদের মতো। আর দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষের উদাহরণ চক্ষুষ্মান ও শ্রবণশক্তির অধিকারী ব্যক্তির মতো।

কোরআনুল কারিমের বৈচিত্র্যময়তা

কোরআনুল কারিমের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, দলিলের আলোকে কাফের- মুশরিকদের মত খণ্ডন করার পর এতে পূর্ববর্তী নবী-রাসুল ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঘটনা বর্ণনা করা হয়। এর ফলে দলিল-প্রমাণ আরও শক্তিশালী হয়। আলোচনায় বৈচিত্র্য আসে। আর মানুষ সাধারণত বৈচিত্র্যময়তা পছন্দ করে থাকে। আল্লাহ তায়ালা যেমনিভাবে তাকবিনি (সৃষ্টিগত) নিদর্শন তথা এই বিশ্বজগতের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যের প্রতি লক্ষ রেখেছেন তেমনি তিনি শরয়ি নিদর্শনসংবলিত কোরআনুল কারিমের আলোচনার ক্ষেত্রেও সেদিকে খেয়াল রেখেছেন।

পৃথিবীর দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, প্রতিনিয়ত তাতে মৌসুমের

পরিবর্তন ঘটছে। কোথাও ফুল, কোথাও কাঁটা, কোথাও উঁচু পাহাড়, কোথাও সমতল ভূমি, কোথাও সমুদ্র, কোথাও সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, কোথাও উড়ন্ত বালু, কোথাও ঠান্ডা, কোথাও গরম, কখনো হেমন্ত, কখনো শরৎ, কখনো সকাল, কখনো দুপুর, কখনো সন্ধ্যা; এভাবেই বিশ্বজগতের বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটে চলছে।

বিধানের সাথে সাথে বিভিন্ন সংবাদ, দলিল-প্রমাণের সাথে ঘটনা, উপদেশের সাথে জান্নাত ও জাহান্নামের দৃশ্য, সুসংবাদের সাথে ভীতিপ্রদর্শন, প্রতিশ্রুতির সাথে ধমক উল্লেখ করা হয়েছে। আলোচনায় এক শৈলী থেকে অন্য শৈলীতে, এক

দৃশ্য ছেড়ে অন্য দৃশ্যের অবতারণা করা হয়েছে। এক ঘটনা থেকে অন্য ঘটনা, এক বিষয় থেকে অন্য বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পাঠক ও শ্রোতাদের কোনো বিরক্তি আসে না।

সুরা হুদে কোরআনের উপস্থাপনা-শৈলীর এ নমুনাটি পরিলক্ষিত হয়। প্রথমে কোরআনের সত্যতা, তাওহিদ ও রিসালাত সত্য হওয়ার দলিল-প্রমাণ উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর হজরত নুহ, হজরত হুদ, হজরত সালেহ, হজরত লুত, হজরত শোয়াইব, হজরত মুসা ও হজরত হারুন আলাইহিমুস সালামের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের সত্যতা এবং কোরআনের মুজিজা হওয়ার দলিল হিসেবে এ সমস্ত ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।

মক্কার মুশরিকরা ভালো করেই জানত যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন উম্মি (নিরক্ষর) মানুষ। তিনি না পড়তে জানতেন আর না লিখতে পারতেন। আর না তিনি কারো শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তবু তিনি সম্পূর্ণ নিখুঁত, নির্ভুল ও বিশুদ্ধভাবে এসব ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ওহী ব্যতীত তা কী করেই-বা সম্ভব? কোরআন এ বিষয়টির প্রতি মনোনিবেশ করার জন্য নবী-রাসুলদের ঘটনা বর্ণনা করার পর সাধারণত ওহী ও নবুওয়াতের আলোচনা করে থাকে।

আলোচ্য সুরায় হজরত নুহ আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করার পর বলা হয়েছে, এসব ঘটনা হচ্ছে অদৃশ্যের সংবাদ, যা আমি তোমার নিকট ওহী হিসেবে পাঠিয়েছি। ইতিপূর্বে আপনি এবং আপনার সম্প্রদায় কেউ তা জানত না। তাই ধৈর্য ধারণ করুন। মুত্তাকিদের জন্য রয়েছে শুভ পরিণাম। (৪৯)

তেমনিভাবে হজরত মুসা আলাইহিস সালাম ও হজরত হারুন আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করার পর বলা হয়েছে, 'এ হচ্ছে কয়েকটি জনপদের সামান্য ইতিবৃত্ত, যা আমি আপনাকে শোনাচ্ছি। তন্মধ্যে কোনো কোনোটি এখনও বিদ্যমান আছে আর কোনো কোনোটির শেকড় কেটে ফেলা হয়েছে।'' (১০০)

এসব ঘটনায় একদিকে জ্ঞানবান, চক্ষুষ্মান ও দৃষ্টিবানদের জন্য শিক্ষার অফুরন্ত ভাণ্ডার রয়েছে, অন্যদিকে এতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুমিনদের জন্য সান্ত্বনা ও অবিচল থাকার উপকরণ ও শিক্ষা রয়েছে। এ কারণে এসব ঘটনা বর্ণনা করার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইসতিকামাত (দৃঢ়পদ) থাকার হুকুম দেওয়া হয়েছে। আসলে গোটা জাতিকেই এই হুকুম দেওয়া হয়েছে।

ইসতিকামাত (অবিচলতা)

ইসতিকামাত থাকা এমন এক নির্দেশ, যার সম্পর্ক আকিদা-বিশ্বাস, কথা-কাজ আচার-ব্যবহার সবকিছুর সাথে। ইসতিকামাত (দৃঢ়পদ) থাকা কোনো সহজ বিষয় নয়; বরং তা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আল্লাহ তায়ালা তার বিশেষ কিছু বান্দাকে এব তাওফিক দান করে থাকেন।

ইসতিকামাত (দৃঢ়পদ) থাকার উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা যে বিধান মোইগতির জীবন পরিচালনা করার নির্দেশ দিয়েছেন সে অনুযায়ী পূর্ণ জীবন মোচালনা করা। হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লা আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর এই আয়াতের চেয়ে কঠিন কোনো আয়াত অবতীর আলাই সাহাবিগণ একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিছু দাড়ি সাল দেখে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর রাসুল, আপনি এতো দ্রুত বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছেন। তিনি তখন বললেন, হুদ এবং এ ধরনের সুরাগুলো আমাকে বৃদ্ধ বানিয়ে দিয়েছে।

আলেমগণ বলেন, এ কথার মাধ্যমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুরা হুদের এ আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, যাতে তাকে ইসতিকামাত (অবিচলতা) অবলম্বন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো বুজুর্গ আল্লাহর দীনের উপর ইসতিকামাত (অবিচল) থাকাকেই প্রকৃত কারামত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই সঠিক কথা হল, ইসতিকামাত অবলম্বন করার চেয়ে বড় কোনো কারামত নেই।

এখানে ইসতিকামাত (অবিচলতা)-এর গুরুত্বের প্রতি লক্ষ রেখে এবং এই

ইসতিকামাত (অবিচলতা) কামনা করে আল্লাহর নিকট দোয়া করে পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্প্রদায়সমূহের (সুরা হুদে ইতিপূর্বে যার বৃত্তান্ত এসেছে) ঘটনা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা জরুরি, যেখানে তাদের তিরস্কার করে বলা হয়েছে, 'আর তোমার প্রতিপালক যখন কোনো পাপপূর্ণ জনপদকে পাকড়াও করেন, তখন এমনিভাবেই পাকড়াও করে থাকেন। নিশ্চয় তার পাকড়াও খুবই মারাত্মক, বড়ই কঠোর। যারা পরকালের আজাবকে ভয় করে এতে তাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।'

(১০২-১০৩)

এর দ্বারা যেন এটা বলা হল যে, যে মহান সত্তা গতকাল অবাধ্য বসতির উপর আজাব নাজিল করেছিলেন, তিনি আজও অবাধ্য জাতিকে আজাবে পাকড়াও করতে পারেন।

এভাবে ১১৬নং আয়াত অধ্যয়নের মাধ্যমে জানা যায়, সাধারণত কোনো সম্প্রদায়ের উপর তখনই আল্লাহর আজাব অবতীর্ণ হয় যখন তাদের মধ্যে দুটি গুনাহ সংঘটিত হয়। প্রথমটি হচ্ছে, সে সম্প্রদায়ে এমন জ্ঞানী ও দয়ালু ব্যক্তি না থাকা, যে তাদেরকে ফেতনা-ফাসাদ থেকে বারণ করবে। দ্বিতীয় গুনাহ ইয়োক না সম্প্রদায়ে সীমাতিরিক্ত ভোগ-বিলাস এবং পাপাচার বেড়ে যাওয়া।

এভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুমিনদের সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে। সবর ও ইসতিকামাতের প্রাসঙ্গিক ঘটনা উল্লেখ করার পর এ সুরার সর্বশেষ আয়াতে বলা হয়েছে, 'হে মুহাম্মদ, নবীদের যেসব অবস্থা আমি আপনার নিকট তুলে ধরলাম, এর মাধ্যমে আমি আপনার অন্তর দৃঢ় ও অবিচল রাখি। এসব ঘটনার মাধ্যমে আপনার নিকট সত্য এসে গেছে। আর মুমিনদের জন্য এতে রয়েছে নসিহত ও শিক্ষা।' (১২০)

সুরা ইউসুফ

এটি মক্কি সুরা।' আয়াতসংখ্যা: ১১১। রুকুসংখ্যা: ১২

এ সুরায় ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। এজন্য সুরাটিকে ইউসুফ নামকরণ করা হয়েছে।

কোরআনে বিভিন্ন নবীর ঘটনা বারবার উল্লেখ হয়েছে। কিন্তু তবু এতে কোনো বিরক্তির সৃষ্টি হয় না। সব জায়গাতেই নতুন শব্দ, নতুন উপস্থাপনা, নতুন কোনো শিক্ষা, নতুন কোনো উপদেশ পাওয়া যায়। এই ঘটনাগুলো ছোট কলেবরে চমৎকারভাবে গোটা কোরআনে বিক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ হয়েছে। একত্র করা হলে পুরো ঘটনাটি বুঝে আসে।

কিন্তু হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা একাধিকবার বর্ণিত হয়নি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ঘটনা সুরা ইউসুফে উল্লেখ হয়েছে। অন্যান্য সুরায় ইউসুফ আলাইহিস সালামের নাম এসেছে; কিন্তু তার ঘটনা উল্লেখ করা হয়নি।

আলেমগণ বলেছেন, যেসব ঘটনা কোরআনে বারবার উল্লেখ হয়েছে- বিরোধীরা যেভাবে তার মোকাবেলা করতে পারেনি, তেমনিভাবে যেসব ঘটনা মাত্র একবার উল্লেখ হয়েছে, সেটিরও তারা বিরোধিতা করতে পারেনি।' হজরত ইউসুফ

আলাইহিস সালামের ঘটনাকে কোরআন নিজেই 'আহসানুল কাসাস' (সর্বোত্তম ঘটনা) বলে উল্লেখ করেছে। কেননা এ ঘটনায় যে পরিমাণ শিক্ষণীয় নসিহত ও উপাদান রয়েছে, সম্ভবত একসাথে অন্য কোনো ঘটনায় তা নেই।

পাদান রকতার দৃষ্টিকোণ থেকে তাকালে দেখারা রাজা বাদশাহ ন সব বিষয় হান পেয়েছে, যা দীন ও দুনিয়া দুটোই পরিশুদ্ধ করে। রাজা-বাদশাহ ও তাদের অধীনস্থ পেয়েছে, যা চরিত্র, শত্রুদের অত্যাচারের বিপরীতে প্রবল ধৈর্য, বহুমুখী বড়সন্তে ও ন্যায় মোকাবেলা, স্বপ্নের ব্যাখ্যা, নারীদের কূটচাল, রাষ্ট্রনীতি, রাষ্ট্রের সূক্ষ্ম বিষয়াদি তার জীবন, পারিবারিক জীবন, প্রেম-ভালোবাসা, রাহা তাকওয়া প্রভৃতি সর সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে। এতে আমবিয়া আলাইহিমুস সালাম, নেককার বুজুর্গ, ফেরেশতা, শয়তান, জিন, মানুষ, জীবজন্তু, পশুপাখি, রাজা-বাদশাহ ব্যবসায়ী, জ্ঞানী-মূর্খ সবার অবস্থাই আলোচিত হয়েছে। এই ঘটনায় ইজ্জত-সম্মান,

ঘটনার চমৎকার দিক

অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এমনকি তিনি সর্বপ্রথম মুসলিম রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিত্বে

পরিণত হন। এরপর মক্কা বিজয়ের পর কোরাইশি ভাইয়েরা লজ্জিত হয়ে তার

অপদস্থতা, ধনসম্পদ, ক্ষমতা, ধৈর্য, দৃঢ়তা ও কুপ্রবৃত্তির কথাও আছে। ঘটনাটির একটি চমৎকার দিক হল এর মাধ্যমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধীদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ইউসুফ আলাইহিস সালামের মতো আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়েও হিংসা করা হয়েছে। তাকে হত্যা করার পরামর্শ হয়েছে। যার কারণে তাকে মক্কা ত্যাগ করতে হয়েছে। তিনদিন সাওরপর্বতের গুহায় আত্মগোপন করতে হয়েছে। সেখান থেকে তিনি মদিনায় হিজরত করেছেন। এরপর ধীরে ধীরে তার

সামনে মাথা নিচু করতে বাধ্য হয়। এগুলোকে আকস্মিকভাবে মিলে যাওয়া বিষয় বা ইচ্ছাকৃতভাবে মেলানো বিষয় যা-ই বলা হোক না কেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলেছিলেন, 'আমি তোমাদের ব্যাপারে সেই সিদ্ধান্তই নিতে চাই, যা আমার ভাই ইউসুফ তার ভাইদের ব্যাপারে নিয়েছিলেন। যাও, তোমরা সকলেই স্বাধীন। তোমাদের উপর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।"

ইউসুফ আ. এর ঘটনা এতটাই প্রসিদ্ধ যে, প্রকৃত মুসলিম পরিবারের সকল ছেলেমেয়েই কম-বেশ তা মুখস্থ জানে। এ কারণে এখানে তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হল না। তবে এ ঘটনা থেকে যেসব শিক্ষা ও উপদেশ অর্জিত হয়, তা বোঝার জন্য সংক্ষেপে ঘটনাটি উল্লেখ করা সমীচীন মনে করছি। ঘটনাটি বারোতম ও তেরোতম পারায় বর্ণিত হলেও আমরা পুরো ঘটনাটি সংক্ষেপে এখানেই বর্ণনা করব। এরপর তা থেকে যেসব উপদেশ ও শিক্ষা অর্জিত হয়, তা উল্লেখ করব।

হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা

এক.

ইয়াকুব আলাইহিস সালামের বারো ছেলে ছিল। হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদের মধ্যে অস্বাভাবিক সুন্দর ছিলেন। তার চেহারা ও চরিত্র দুটোই সুন্দর ছিলা তিনি ও তার ভাই বিনয়ামিনের সবার ছোট হওয়াও এই ভালোবাসার একটি ছিল। ছিল। আর তাদের মায়েরও ততদিনে মৃত্যু হয়ে গিয়েছিল।

ছোট বাচ্চার প্রতি ভালোবাসা মানুষের স্বভাবগত বিষয়। হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহুর মেয়েকে জিজ্ঞাসা করা হয় আপনার নিকট আপনার কোন সন্তান সবচেয়ে বেশি প্রিয়? তিনি উত্তরে বলেন, ছোট সন্তান, যতক্ষণ না সে বড় হয়। অনুপস্থিত সন্তান, যতক্ষণ না সে উপস্থিত হয়। অসুস্থ সন্তান, যতক্ষণ না সে সুস্থ হয়।'

এ ভালোবাসার কারণে ভাইয়েরা তার সাথে হিংসা করা শুরু করে। তারা তাদের পিতাকে খেলাধুলার কথা বলে হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে জঙ্গলে নিয়ে যায়। তারপর তাকে কূপে ফেলে দেয়।

দুই.

কূপের পাশ দিয়ে একটি কাফেলা যাচ্ছিল। পানি নেওয়ার জন্য তারা কূপে বালতি ফেলে। ভেতর থেকে ইউসুফ আলাইহিস সালাম বের হয়ে আসেন। কাফেলার লোকেরা মিসরে নিয়ে তাকে বিক্রি করে দেয়।

তিন.

মিসরের জনৈক মন্ত্রী তাকে ক্রয় করে বাড়িতে নিয়ে যান। ইউসুফ আলাইহিস সালাম যৌবনে পদার্পণ করলে বাদশাহর স্ত্রী তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। সে মন্দ কাজের জন্য তাকে ফুসলানোর চেষ্টা করে। হজরত ইউসুফ তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। মন্ত্রী দুর্নাম থেকে বাঁচার জন্য ইউসুফ আলাইহিস সালামকে জেলে বন্দি করেন।

চার.

জেলখানায় তিনি তাওহিদের দাওয়াত দিতে থাকেন, যার কারণে বন্দিরা তাকে অনেক সম্মান করত। তৎকালীন বাদশাহর স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়ায় তিনি তার নজরে পড়েন। বাদশাহ তাকে খাদ্যভাণ্ডার, ব্যবসা-বাণিজ্যের দায়িত্বশীল এবং রাষ্ট্রের উজির মনোনীত করেন। মিসর এবং তার আশপাশে দুর্ভিক্ষের কারণে তার ভাইয়েরা রেশন নেওয়ার জন্য মিসর আসে। দুয়েকবার সাক্ষাতের পর তিনি তাদের বলেন, আমি তোমাদের ভাই ইউসুফ। এরপর তার মাতাপিতাও মিসর চলে আসেন। সকলেই এখানে বসতি গড়ে তোলেন।

চলবে ইনশাআল্লাহ....

লেখক: আলেম ও ওয়ায়েজ; খতীব, বায়তুল আমান জামে মসজিদ, মিরপুর-০১।

(ঢাকাটাইমস/২১মার্চ/এসআইএস)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ইসলাম বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :