মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আমলাদের মাতব্বরি আর কতদিন?

অধ্যাপক দুর্লভ বিশ্বাস
| আপডেট : ০১ মে ২০১৯, ১৮:৩৬ | প্রকাশিত : ০১ মে ২০১৯, ১৮:৩৬

সেই ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই নির্বাচিত সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংসদ ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রে একজন যুগ্ম সচিব, জেলা ইউনিটে ডিসি এবং উপজেলা কমান্ডের দায়িত্ব দেয়া হয় ইউএনওদের ওপর। তিন মাস পর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও তা আর হয়নি। সেই থেকে প্রায় দুই বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর মাতব্বরি করে আসছেন তাদের ছেলে ও নাতির বয়সী আমলারা। এই আমলারা আর কতকাল বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের মাতব্বরি করবেন সেই প্রশ্ন এখন অনেকেরই।

সবাই না জানলেও দেশমাতৃকার স্বাধীনতা যারা ছিনিয়ে আনেন সেই মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সংগঠন গড়ার তাগিদে ১৯৭৩ সালে জাতির জনকই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাদের ডেকেছিলেন। সেই সমাবেশে তিনি বলেছিলেন তোদের জন্য সবকিছু করা হবে। তবে একটু ধৈর্য ধরতে হবে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তা আর অগ্রসর হয়নি। জীবনবাজি রেখে যারা দেশমাতৃকার স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনলেন সেই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে পরের ইতিহাস সবারই জানা। দুই সামরিক সরকারই নিজেদের স্বার্থে তাদের আস্থাবাজনদের দিয়ে ইচ্ছামতো মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালনা করেছেন, যেখানে আপামর মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো ভূমিকা থাকতো না।

‘এক মুক্তি’ ‘এক ভোটের’ মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ধারা মুক্তিযোদ্ধারা পরিচালিত হবেন এ দাবি দীর্ঘদিনের হলেও ২০০৯ সাল পর্যন্ত দুই সামরিক সরকারের ধারাই মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালনার ক্ষেত্রে অব্যাহত থাকে। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের দীর্ঘদিনের সেই দাবি পূরণের ব্যবস্থা করেন। অর্থাৎ ওই বছর জুন মাসে একই দিন এক মুক্তি এক ভোটের মাধ্যমে কেন্দ্র, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। তিন বছরের জন্য নির্বাচিত এসব প্রতিনিধির মেয়াদ ২০১৪ সালের জুনে শেষ হলে তিনি ওই বছরের জুলাই মাসে আবার একইভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ভোটে নির্বাচিত এসব প্রতিনিধি মুক্তিযোদ্ধাদের স্বার্থ সংরক্ষণে সচেষ্ট হওয়া ছাড়াও বিএনপি-জামায়াতের আগুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধেও রাজপথে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শুধু প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করাই নয় বঙ্গবন্ধু কন্যা মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থারও প্রভূত উন্নয়ন করে চলেছেন। কেন্দ্র, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচিত এই প্রতিনিধিদের মেয়াদ ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই শেষ হলে ওই দিন মুক্তিযোদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দায়িত্বে বসান এক যুগ্ম সচিব জেলায় ডিসি এবং উপজেলায় ইউএনওদের। সেই থেকে প্রায় দুই বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের মাতব্বরি করে আসছেন আমলারা।

এই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যেকেরই বয়স হয়েছে, অনেকে ইতিমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন। অনেকে নানা রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত। তাদের ছেলে-মেয়ে এবং নাতি-নাতনির জন্য প্রতিনিয়তই প্রত্যয়নপত্রের প্রয়োজন হয়ে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ইউনিটের প্রতিনিধিরা এসব প্রত্যয়ন দিয়ে এসেছেন। কিন্ত ডিসি ইউ্এনওরা তা দিচ্ছেন না। কদাচিৎ দিলেও তা সাত ঘাটের পানি খাওয়ানোর পর দেয়া হয়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া নানা প্রাত্যহিক সমস্যার সময় বয়স্ক মুক্তিযোদ্ধারা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে এসে থাকতেন। তারাও মুক্তিযোদ্ধাদের ওইসব সমস্যার সমাধান করে দিতেন বা দেয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্ত দীর্ঘদিন ধরে প্রতিনিধি না থাকায় মুক্তিযোদ্ধারা সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে জানা গেছে।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের একজন প্রতিনিধি জেলা ও উপজেলা সমন্বয় পরিষদের সদস্য। এই সদস্যের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা সমন্বয় কমিটি মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের যেকোনো বিষয় অবহিত হয়ে থাকতেন। কিন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনার শাসনামলেও জেলা ও উপজেলা সমন্বয় পরিষদে যারা জীবনবাজি রেখে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন সেই বীরদের কোনো প্রতিনিধি প্রায় দুই বছর ধরে না থাকাকে অনেক মুক্তিযোদ্ধাই বেমানান মনে করছেন। এছাড়া জাতির জনকের জন্মশত বর্ষ এবং স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপকভাবে পালনের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন। কিন্তু তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় মুক্তিযোদ্ধারা জাতির জনকের জন্মশত বার্ষিকী এবং স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী পালনে সেই ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করতে পারবেন না বলে অনেকেই মন্তব্য করছেন।

বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন একজন রণাঙ্গনের যোদ্ধা। তা সত্ত্বেও কীভাবে বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর মাতব্বরি করছেন তাদের ছেলে ও নাতির বয়সী ডিসি, ইউএনওরা সে প্রশ্ন অনেকের। 

লেখক: সাংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :