প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘সচিবালয়ে ফেরা’ নিয়ে মতদ্বৈধতা

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
 | প্রকাশিত : ১৫ মে ২০১৯, ১০:২৪

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ফের সচিবালয়ে ফিরে যাওয়া নিয়ে দুটি পক্ষ তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ খুব করে চাইছে ইস্কাটন গার্ডেনের প্রবাসীকল্যাণ ভবন থেকে সচিবালয়ে ফিরে যেতে। অন্যপক্ষ চাইছে এখানেই থাকতে। এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি হয়েছে।

আর জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রা বলছে, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এজেন্সিগুলোর প্রতিদিনই কোনো না কোনো দাপ্তরিক কাজ থাকে। কাজের সুবিধায় মন্ত্রণালয়টি সচিবালয়ের বাইরে থাকা জরুরি। সচিবালয়ে ফিরে গেলে এটি কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।

মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সাবেক মন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসি দায়িত্বে থাকতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কার্যালয়টি ইস্কাটন গার্ডেন থেকে আব্দুল গনি রোডে সচিবালয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগে একটি ডিও (ডিমান্ড অব অর্ডার) দেন। ওই সময় মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন বেগম শামছুন্নাহার। তৎকালীন মন্ত্রী কার্যালয় সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী ছিলেন। তিনি এ ব্যাপারে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলেও আলোচনা করেছেন। কিন্তু গত মন্ত্রিসভা ভেঙে যাওয়ার পর এই উদ্যোগের পালে আর হাওয়া লাগেনি।

নতুন মন্ত্রিসভায় নূরুল ইসলাম বিএসসির জায়গা হয়নি। তার জায়গায় এসেছেন প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমদ। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ইস্কাটন গার্ডেন থেকে চলে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহীরা ভেতরে ভেতরে আবার সংগঠিত হতে শুরু করেন। কিন্তু গত মার্চে প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রী নাসরিন আহমদ স্ট্রোক করে সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ভর্তি হলে তিনি বেশিরভাগ সময় সিঙ্গাপুরেই কাটিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের কাজে খুব একটা সক্রিয় হতে পারেননি।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি পক্ষ খুব করে চাইছে সচিবালয়ে ফিরে যেতে। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ সচিবালয়ে ফিরে যেতে চান না। এ নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে ভেতরে ভেতরে মতদ্বৈধতা তৈরি হয়েছে।’

সচিবালয়ের ভেতরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য নতুন ভবন নির্মাণের কাজ প্রায় শেষের দিকে। বর্তমানে ২০ তলাবিশিষ্ট ৬ নং ভবনের ১৩ তলায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কয়েক বিভাগের কর্মকর্তারা বসছেন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে শোনা যাচ্ছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন ভবনে ওই কর্মকর্তাদের সরিয়ে নিলে ফ্লোরটি ফাঁকা হবে। তখন সেখানে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে জায়গা করে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) শেখ আতাহার হোসেন জানান, এ ধরনের কোনো উদ্যোগের বিষয় আপাতত তার জানা নেই।   

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ সচিবালয়ে ফিরে যেতে আগ্রহী হলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করছেন। তারা বলছেন, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অনেক অফিসের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড; জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বহির্গমন শাখা; বাংলাদেশ ওভারসিস এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এবং প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের সঙ্গে নিত্যদিনের কাজের সম্পর্ক রয়েছে। জনশক্তি রপ্তানির এজেন্সিগুলোকে প্রতিনিয়তই কমবেশি মন্ত্রণালয়ে আসতে হয়। এ ছাড়া সারা দেশ থেকে ভুক্তভোগীরা তাদের অভিযোগ নিয়ে আসেন। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও শুনানি হয়। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিদেশে গমনেচ্ছুকদের ভোগান্তি কমিয়ে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর চিন্তা থেকে মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলো একই ছাদের নিচে আনা হয়েছিল। এখন মন্ত্রণালয়টি সচিবালয়ে নিয়ে যাওয়া হলে সাধারণ মানুষ সেখানে ঢুকতেই পারবে না।

২০০১ সালের ২০ ডিসেম্বর সরকার প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় স্থাপন করে। প্রথমে এর কার্যালয় সচিবালয়ের ভেতরেই ছিল। কিন্তু পরে এই মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কাজের সমন্বয়ে সমস্যা দেখা দিলে মন্ত্রণালয়টি সচিবালয়ের বাইরে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইস্কাটন গার্ডেনে ২০ তলাবিশিষ্ট প্রবাসীকল্যাণ ভবন উদ্বোধন করেন। মন্ত্রণালয়টিও এখানে স্থানান্তর করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা অনুযায়ী তৎকালীন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের উদ্যোগে ২০১২ সালে মন্ত্রণালয়ের অধীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং পরের বছর বিএমইটি কার্যালয় কাকরাইল থেকে প্রবাসীকল্যাণ ভবনে নিয়ে আসা হয়। তবে বর্তমানে বিএমইটির মহাপরিচালকের কার্যালয় আবার কাকরাইলে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শুধু বিএমইটির বহির্গমন শাখাটি প্রবাসীকল্যাণ ভবনে রয়ে গেছে।

সচিবালয়ে ফিরে যেতে ইচ্ছুক কয়েকজন জানান, যখন মন্ত্রণালয়কে সচিবালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে কথা উঠেছিল, তখন পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না। বর্তমানে ইস্কাটন গার্ডেনে মন্ত্রণালয়ের ফ্লোরটি আনুমানিক ২২ হাজার বর্গফুট। অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন ভবনে সরে গেলে যে জায়গা খালি হবে তা ২১ হাজার বর্গফুটের কাছাকাছি। এখন চাইলে সেখানে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

সচিবালয়ে ফিরে যেতে ইচ্ছুকরা দাবি করছেন, সচিবালয়ে ফিরে গেলে তাদের সঙ্গে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ-সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে। অন্যদের সঙ্গে কাজের সমন্বয় তৈরি হবে।

সচিবালয়ে ফিরে যাওয়ার অভিপ্রায় জানিয়ে যখন গণপূর্ত বিভাগে ডিও দেওয়া হয়েছিল তখন প্রবাসীকল্যাণ সচিব ছিলেন বেগম শামছুন্নাহার। তিনি এখন অবসরে আছেন। তখন কী চিন্তা থেকে সচিবালয়ে ফিরে যাওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে তো ওয়েজ আর্নার্স বোর্ডের কাছ থেকে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ফ্লোর ভাড়া নিয়ে অফিস করছে। সচিবালয়ে ফিরে গেলে নিজস্ব একটা জায়গা হতো, এই আর কি।’

বর্তমানে বিষয়টি কী পর্যায়ে আছে জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব রৌনক জাহান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমার জানামতে এ নিয়ে কোনো দৌড়ঝাঁপ নেই। কর্মচারীরা মাঝেমধ্যে বলে, তখন শুনি। তবে অনেক মন্ত্রণালয় তো বাইরে আছে। আমি তো মনে করি এটাও বাইরে থাকা উচিত। এখানে অনেক মানুষের আসা-যাওয়া করতে হয়। সচিবালয়ে গেলে তো ঝামেলা পোহাতে হবে। এটা আমার ব্যক্তিগত বিবেচনা। এখান থেকে মন্ত্রণালয় সরিয়ে নেওয়া জাস্টিফাইড হবে বলে মনে হয় না।’

সচিব বলেন, এখানে মানুষের দুর্দশা শুনতে হয়। সমস্যাগুলোর শুনানি করা যায়। সচিবালয়ে গেলে তো ভুক্তভোগী মানুষ ঢুকতেই পারবে না। এখানে তারা চাইলেই আসতে পারে। আমরা তাদের কথা শুনতে পারি। ব্যবস্থা নিতে পারি। মনিটরিং টিম পাঠানোর বিষয় থাকে। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সচিবালয়ে গেলে এটা সম্ভব হবে না।

জনশক্তি রপ্তানিকারকরাও মনে করেন, মন্ত্রণালয়টি সচিবালয়ে নিয়ে যাওয়া যুক্তিযুক্ত হবে না। এতে কাজের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বিঘিœত হবে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্ট করে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে সচিবালয় থেকে বাইরে নিয়ে এসেছি। বায়রার ২০০৮-১০ সেশনের কমিটির প্রথম দাবি ছিল মন্ত্রণালয়কে বাইরে নিয়ে আসা। যেহেতু এই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের প্রতিদিন-প্রতিনিয়তই যোগাযোগ করতে হয়। মন্ত্রণালয় যদি সচিবালয়ের মধ্যে থাকে তাহলে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে সেখানে প্রতিদিন যাওয়া সম্ভব হবে না।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন নিজের উদ্যোগে মন্ত্রণালয়কে সচিবালয় থেকে বাইরে নিয়ে আসেন। এটিকে একটা করপোরেট হাউসের মতো তৈরি করেন। যেটা পরবর্তীতে খুবই প্রশংসিত হয়। বহির্বিশ্বেও এটা প্রশংসিত হয়েছে। কারণ, আমরা শুধু নয়, বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান এই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জড়িত।’

বায়রার এই নেতা বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিনই মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে মিটিং থাকে। আমরা বায়রার পক্ষ থেকে চাইব, মন্ত্রণালয়টিকে যেন এখান থেকে সচিবালয়ে সরিয়ে না নেওয়া হয়। তাতে আমাদের দৈনন্দিন কাজে খুবই সমস্যা হবে। সচিবালয়ে গিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করা খুবই দুরূহ হবে।’   

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :