নদীতেও এন্টিবায়োটিক

দিদার মালেকী, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৯, ০৯:৪৯
ফাইল ছবি

নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলোতে বিশ্বের সর্বোচ্চ মাত্রার এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি রয়েছে। বাংলাদেশের একটি স্থানে বহুল ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক মেট্রোনিডাজলের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়েও ৩০০ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। গত সোমবার প্রকাশিত এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকির এক সম্মেলনে ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নদীগুলো মারাত্মকভাবে এন্টিবায়োটিক দূষণের শিকার। বাংলাদেশের একটি স্থানে বহুল ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক মেট্রোনিডাজলের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়েও ৩০০ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান এবং আফ্রিকার কেনিয়া, ঘানা ও নাইজেরিয়ার নদীগুলোর অবস্থাও মারাত্মক বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী নদীগুলো যে হারে এন্টিবায়োটিক দূষণের শিকার হয়েছে, তাতে করে পরিবেশগত ঝুঁকির মাত্রাও বেড়ে ৩০০ গুণে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের ৭২টি দেশের নদী থেকে ৭১১টি নমুনা সংগ্রহের পর তা পরীক্ষা করে এর দুই তৃতীয়াংশের মধ্যেই এক বা ততোধিক পরিচিত এন্টিবায়োটিক খুঁজে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

এ ছাড়াও কয়েক ডজন স্থানে মানুষ ও গবাদিপশুর ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয় এমন ওষুধের মাত্রা পরীক্ষা করে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় থাকার কথা জানানো হয়েছে। আর এর জন্য বিশ্বের শতাধিক জৈব প্রযুক্তি ও ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর একটি জোট এএমআর ইন্ডাস্ট্রি অ্যালায়েন্সকে দায়ী করা হয়েছে।

ইয়র্ক এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনিবিলিটি ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী অ্যালিস্টেয়ার বোক্সাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের দিকে তাকালে বিশ্বের এন্টিবায়োটিক দূষিত নদীগুলোর করুণ দৃশ্য চোখে ধরা পড়ে এবং যা খুবই উদ্বেগজনক।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, রোগ প্রতিরোধে সঠিকভাবে কার্যকর এমন এন্টিবায়োটিকের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে নতুন প্রজন্মের ওষুধ আবিষ্কারের ওপর জোর দিতে সরকার ও প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

এর আগে গত ২২ এপ্রিল এক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলে, বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোর বড় নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ৮০ শতাংশ মৃত্যুর জন্য অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সুপারবাগ দায়ী। অর্থাৎ আইসিইউতে ১০টি মৃত্যুর মধ্যে ৮টির জন্যই দায়ী সুপারবাগ।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের পরামর্শ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। আবার চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজ থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়া এবং দোকান থেকে অবৈধভাবে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে রোগী ব্যবহার করে। আবার মানুষের ব্যবহৃত ওষুধ বেশি লাভের জন্য পশুর ওজন বাড়াতেও প্রয়োগ করা হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসক সায়েদুর রহমানকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে দেশে আরও কড়াকড়ি প্রয়োজন। অ্যান্টিবায়োটিক দোকানে কেনাবেচা করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। এসব ওষুধ শুধু হাসপাতাল থেকে বিতরণ করা যাবে, এমন ব্যবস্থা করা উচিত।’

এরপর ২৪ এপ্রিল দ্য টেলিগ্রাফসহ দেশের কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় এ-সংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। ওই রিটের শুনানি নিয়ে যথাযথ তত্ত্বাবধান ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধে পদক্ষেপ নিতে সরকারকে নির্দেশ দেয় হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের বেঞ্চ।

এ ছাড়া যথাযথ তত্ত্বাবধান ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না জানতে চেয়ে জারি করা রুলের আদেশ পাওয়ার দুই দিনের মধ্যে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে প্রতিটি জেলার সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসককে সার্কুলার জারি করতেও বলা হয়।

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি শরীর প্রতিরোধ গড়ে তুললে সে অবস্থাকে বলা হয় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। আর এই প্রবণতার কারণে প্রতি বছর বিশ্বে সাত লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াতে পারে এক কোটিতে।

আর পশুখাদ্য, মাছ এবং কৃষিতে অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। সবচেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষিতে। এটি বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোট অ্যান্টিবায়োটিকের প্রায় অর্ধেক। ফলে খুব সহজেই কৃষি খাদ্যের মধ্য দিয়ে এই অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের শরীরে ঢুকছে। এতে একদিকে যেমন অ্যান্টিবায়াটিকের কার্যকারিতা হারাচ্ছে, তেমনি শরীরও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছে। এ ছাড়া অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কারণে সামান্য জীবানু সংক্রমণও এখন ব্যবহারকারীর জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ঢাকাটাইমস/২৯মে/ডিএম

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :