ঢাকা

বসবাসযোগ্যতার সংজ্ঞাটাই শুভংকরের ফাঁকি

ইকবাল হাবিব
| আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:৩১ | প্রকাশিত : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:৩৮

আপনাকে যদি বলা হয় চোখ বন্ধ করে একটা শহরের উৎকর্ষের চূড়ান্ত একটি ছবি মনে মনে আঁকেন তবে আপনি হয়তো মোগল আমলের দিল্লির কথা ভাববেন। আপনি খেলাফতের সময়কার কথা ভাববেন। রোমান সাম্রাজের সেই আলেকজান্ডারের কথা ভাববেন। একটা শহরে বসবাসযোগ্যতার মূল নিরিখটা কী? সম্প্রতি আন্তর্জাতিক একটা জরিপে ঢাকা শহরকে বসবাস অযোগ্য শহরের তলানিতে দেখানো হয়েছে। আমি এই জরিপকে প্রত্যাখ্যান করি। কেননা, এই জরিপের মধ্যে ত্রুটি রয়েছে। 

ঢাকার রায়েরবাজারে যে পরিমাণ জনঘনত্ব রয়েছে সেই পরিমাণ জনগণ যদি আমি মেলবোর্ন শহরে ঢুকিয়ে দিই তবে মেলবোর্ন শহরের সব ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়বে। ঢাকার প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনঘনত্ব ৪৭ হাজার ৮০০। এরপর সবচেয়ে কাছাকাছি হচ্ছে বম্বে। তার জনঘনত্ব ২৬ হাজার। আপনি এই জনঘনত্বের বিচারে বিবেচনা করলেন না, কিন্তু অন্যান্য মাপকাঠিতে আমাকে বিবেচনা করে ফেললেন। তাই যদি হয়, এই বসবাসযোগ্যতার সংজ্ঞাটাই শুভংকরের ফাঁকি। 

তার মানে এই না বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকার যে সম্ভাবনা সেই সম্ভাবনা অনুযায়ী ঢাকা তার যোগ্যতম জায়গায় পৌঁছেছে। সেখানেও আমাদের ঘাটতি আছে, ঘাটতি আছে বলেই আমরা আন্দোলন করছি। আমরা সেই সম্ভাবনার জায়গাটুকুতে পৌঁছাতে চাই। আমরা পরিষ্কার ভাষায় শব্দ দূষণ চাই না এবং ধুলি দূষণ চাই না। 

আমাদেরই আরেকটা শহর রাজশাহী দূষণ কমিয়ে বিশ্বে রেকর্ড করেছিল। এটা ২০১৭ সালের কথা। তখন তো এটা নিয়ে আমাদের গণমাধ্যমে খুব বেশি লেখালেখি হয়নি। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে লক্ষ মানুষ কীভাবে মানবিকভাবে সামাজিক সৌহার্দ্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকা- নিয়ে হেঁটে যায় সেটা খেয়াল করেছেন?  তার সঙ্গে তুলনা করলে কোথায় যাবে মেলবোর্ন, কোথায় থাকবে ভিয়েনা? 

পয়লা বৈশাখে যে শহরে লক্ষ মানুষ সেজেগুজে কোনো অঘটন ছাড়া আনন্দ উৎসব করে সেই শহরকে আপনি দামেস্ক বা করাচির মতো বোমা ফাটানো শহরের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন না। আপনি শহরের ওই মানুষটাকে যখন সরিয়ে ফেলেন তখন ওই শহর আর শহরই থাকে না। ঢাকার সমস্যাটা অন্য জায়গায়। আমরা এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে আমাদের আইন-কানুন বিধি-বিধানগুলো আরোপ করতে পারলাম না।
আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক সকলের জন্য ইকুইটি বেইজড একটা শহর তৈরি করার সকল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শুধু বিশেষ শ্রেণিকে প্রাধান্য দিয়ে সব কর্মকা-কে ধনীমুখিতায় করছি বলেই আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতে পারছি না। 

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউক,  যাদের দ্বারা নগরীকে সাজানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যাদের মূল কাজ করার কথা ছিল পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, অনুমোদন সে সেই কাজ বাদ দিয়ে গরিবের জমি কিনে বড়লোককে দিচ্ছে। কিন্তু তাদের কাজ ছিল যে ফ্ল্যাট ব্যবসায়ী জনগণকে ঠকায় তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা। তার উচিত ছিল রূপায়ণ টাওয়ারে যাতে আগুন না লাগে প্রত্যেকটা বাড়ির কমপ্লেক্স তদারকি করা। আমাদের ব্যর্থতা আসলে আমরা যাকে দিয়ে যেই কাজ করানো দরকার সেই কাজ করাতে পারিনি। করাতে পারছি না এবং জনসম্পৃক্ত পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যর্থতার কারণে আমাদের সব পরিকল্পনা ভুল অভিমুখে চলে গেছে। 

শহরের দরিদ্র মানুষ যারা বস্তিতে থাকে সব সরকারি গেজেট নোটিফিকেশনে ড্যাপ বলছে প্রায় ৪৪ লক্ষ বস্তিবাসী রয়েছে। সরকারের মন্ত্রী, বাংলাদেশ স্ট্যাটিস্টিকস ব্যুরোর বরাতে সেদিন সংসদে বলেছেন সাড়ে ৬ লক্ষ বস্তিবাসী রয়েছে। তাহলে এই ৩৭ লক্ষ বস্তিবাসী অশরীরী আত্মায় পরিণত হলো। তা যদি হয় এ সব মানুষের প্রতি আপনি বিনিয়োগ করবেন না। তাদের নিয়ে আপনি কোনো প্রকার খরচও করবেন না এবং পরিকল্পনায় তো নাই-ই। ফলে আপনি খুবই খুশি যে আমি আসলে সবাইকে উন্নয়ন করে ফেলছি। এই যে একটা দোলাচাল এটা তো শুভংকরের ফাঁকির মধ্য দিয়ে আমরা আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলছি। এর মধ্য দিয়েই আমরা বড় ধরনের একটা অপরিকল্পিত জায়গায় চলে যাচ্ছি।

ঢাকার মেয়র, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, বিআরটিএর চেয়ারম্যান-এদের প্রত্যেককে কোনো-না-কোনোভাবে আইনের আশ্রয়ে নেওয়া উচিত। জনগণের জবাবদিহিমূলক যেকোনো আইনমূলক জায়গায় তাদের নিয়ে আসতে হবে। তবেই তারা পরিশুদ্ধ হবে। এই যে একটা প্রহসনের ব্যবসা চলছে এ থেকে বের হতে পারলে পুরো ঢাকা শহরটাই হাতিরঝিল হয়ে যাবে। হাতিরঝিলের একজন অংশীদার হিসেবে বলছি, পুরে শহরকে হাতিরঝিলের মতো করা সম্ভব। 

হিসাব করে গবেষকরা দেখেছেন, পুরান ঢাকার যে অংশটুকুতে এই মুহূর্তে ১৮ লক্ষ লোকের বাস।  আর্কিটেক্ট অর্থনীতিবিদরা মিলে, বিনিয়োগকারীরা মিলে আমরা ওই পুরো জায়গাটা ২০ লক্ষ লোকের বাসের ব্যবস্থা করে দিতে পারব পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে। কারও কাছে মাঠ চাইতে হবে না। উন্মুক্ত জায়গা থাকবে এবং যথেষ্ট পরিসরসম্পন্ন সড়কও থাকবে। এই পুনর্গঠনের দায়িত্বটা কে নেবে? পুনর্গঠন না করে যারা এখন ধুয়া তুলে ঢাকাকে অ্যামেন্ডমেন্ট করে নতুন রাজধানীতে চলে যেতে যাচ্ছে তারা দেশের শত্রু। আমরা ধানমন্ডি লেক যখন করি ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ সালে, সে সময় ৭৪ শতাংশ বাড়ি ধানমন্ডি লেক পেছন দিয়ে তৈরি করা ছিল। সবাই রাস্তার দিকে মুখ করে বাড়ি করেছে। এখন সব বাড়ি লেক ফ্রন্ট। এই পরিবর্তন সরকার করেছে? সরকার করেছে লেক প্রজেক্ট। বাকি সব মানুষ করেছে। 

মানুষকে উৎসাহ দিতে হবে, বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে হবে। সেই বিনিয়োগটা কি এই উত্তরটা বলছি। উত্তরটা হচ্ছে প্লটভিত্তিক স্বার্থপরের মতো ছোট ছোট চিন্তা ছাড়তে হবে। লটভিত্তিক চিন্তা করতে হবে। একর হিসেবে। সবাই বাঁচব তবেই হবে আসল বাঁচা। একা বাঁচার দিন শেষ। এ রকম জনঘনত্বের শহরে একা বাঁচা যে সম্ভব না সেটা কে এসে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন জানেন, এডিস মশা। মশা কিন্তু প্রমাণ করেছে তুমি বাঁচবা না, যদি তোমার প্রতিবেশী না বাঁচে। তাকেও তোমার বাঁচাতে হবে। এসব থেকে যদি শিক্ষা নিতে পারি আমার বাঁচার পথ পরিষ্কার। 

আসুন সবাই মিলে বাঁচি। এ সবাই মিলে বাঁচার চর্চা বিদেশ থেকে শিখতে হবে না। কোত্থেকে শিখবে? পুরান ঢাকা। যেখানে সর্দার প্রথা ছিল। এখনো পুরান ঢাকায় দেখবেন সবাই মিলে মিশে কাজ করে। আমরা ভালো জিনিসটা দেখি না, খালি খারাপ জিনিসটাই চর্চা করতে করতে মরে গেলাম। ওইখানেই সম্ভাবনা লুকানো। আমরা ওই সম্ভাবনার চর্চা করি, সারা ঢাকায়, সব নগরায়নে একই ভূমিকা শক্তিশালী করি সব বদলে যাবে। এখন এটা কে করবে রাজনৈতিক দল? রাজনৈতিকভাবে যাদেরকে নির্বাচিত করেছি তারা। তার বদলে যদি আমাদেরকে চাঁদাবাজ, গুন্ডা-বদমাইশকে কাউন্সিলর বানাতে হয় তাহলে হবে না। সর্দার মানেই যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান লোক, অন্যের জন্য ভাবা লোক তাদেরকে আমাদের সর্দার বানাতে হবে। 

ফিরিয়ে দেন সে রাজনীতি, ফিরিয়ে দেন সে নির্বাচন। ফিরিয়ে দেন সে ধরনের জনপ্রতিনিধি। আমরা তাদের হাত দিয়ে গড়ব বাংলাদেশ। কারণ রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া কিছু হবে না। যেমন আমি পেশাজীবী, একজন স্থপতি আমার পক্ষে তো এটা বদলানো সম্ভব না। সেটা যাদের দ্বারা বদলানো সম্ভব তাদেরকে বলতে দিতে হবে। তাদেরকে বিশ্বাস করতে হবে। বিদেশি জিনিসপত্র অনুকরণের দরকার নেই। সম্ভাবনার সব জিনিস আমাদের এখানে আছে। শুধু আমাদের জিনিসের ওপর ভিত্তি করে আস্থা-বিশ্বাস নিয়ে সবাই বাঁচব এ মানসিকতা নিয়ে কাজ করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। যারা আমাদের ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য শহর হিসাবে দেখাচ্ছে তাদেরকে ধিক্কার। এটা একটা হীনমন্যতা থেকে তারা করেছে। এটা একটা সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের উদ্দেশ্য হচ্ছে বিনিয়োগবান্ধবতা ও পর্যটনবান্ধবতার ওপর ভিত্তি করে শহরের তালিকা তৈরি করা।

ঢাকায় দুই কোটি মানুষ আছে ঠিকই কিন্তু এগুলো গাজীপুর, সাভার, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ সব মিলে। ড্যাপের মাস্টার প্লান যেটা সেটা কিন্তু পুরোটা মেলে। কিছু মানুষ তথ্য বিভ্রাট তৈরি করে এক ধরনের আত্মতুষ্টি ভোগ করে। রাজউক সম্প্রতি একটা জরিপ করেছে ড্যাপের জন্য। তারা বলছে ঢাকায় ৭৩ শতাংশ ৩ তলা, ৪ তলার বেশি বাড়ি নেই। তার মানে ৭৩ শতাংশ বাড়ি যদি আপনি ৫ থেকে ৬ তলা করেন কি পরিমাণ মানুষ এতে বসবাস করতে পারবে চিন্তা করতে পারেন?  সরকার যদি পুরো শহরকে খন্ড খন্ড ভাগে ভাগ করে কাউকে দিত যে তুমি এই এলাকা করো তোমার কর মাফ করা হবে। ডেভেলপাররা ঠিকই করবে তাতে লাভ হবে দেশের। ওই জায়গায় বড় বিনিয়োগ চিন্তা করা প্রয়োজন। তাতে লাভটা হবেÑ বড় বড় সড়ক হবে, আগুন লাগলে চুড়িহাট্টার ঘটনা ঘটবে না। নির্দিষ্ট জায়গায় ইন্ডাস্ট্রি হবে, নির্দিষ্ট জায়গায় মানুষ থাকবে, নির্দিষ্ট খেলার জায়গা থাকবে। তরুণরা মাদকাসক্ত হবে না। তাই সম্ভাবনা অনুযায়ী এই নগরী যেখানে যাওয়ার কথা ছিল সেখানে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। 

অনুলিখন: আসাদুজ্জামান

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :