এক সেলিমে এত রূপ!

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০১ অক্টোবর ২০১৯, ২১:৪৬

ঢাকার মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো-কাণ্ডের মধ্যে অনলাইনেও জমজমাট ক্যাসিনো-বাণিজ্য উদঘাটন করেছে র‌্যাব। অনলাইনে অবৈধ এ কারবারের মূলহোতা সেলিম প্রধানকে আটকের পর একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। সোমবার বিমানবন্দর থেকে আটকের আগেও তার সম্পর্কে তেমন কিছু শোনা যায়নি। এবার র‌্যাবের অভিযানে বেরিয়ে আসছে সেলিমের অপকর্মের নানা কাহিনি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাধারণ পরিবারে জন্ম নেয়া এই সেলিম শুধু ক্যাসিনো ব্যবসাই নয়, আরও অনেক অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। বিয়ে করেছেন একাধিক। আছে বিদেশিনিও। সবশেষ স্ত্রী চট্টগ্রাম কাস্টমসে সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মরত।

রাজশাহীসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সীমান্তে ভারতীয় গবাদিপশুর সব খাটাল ও মাদক সিন্ডিকেটগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেন সেলিম। যা থেকে কোটি কোটি টাকা পকেটে যেত তার।  শুধু তাই নয়, সীমান্তে জাল টাকার মূল সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণও ছিল তার হাতে। খাটাল থেকে দুই বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা নিয়েছেন সেলিম। আর ক্যাসিনো থেকে মাসে সেলিমের আয় কমপক্ষে নয় কোটি টাকা।

অনলাইনে ক্যাসিনো পরিচালনাকারী এবং বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রধান সেলিম ওয়ান্ডারার্স ক্লাবেরও সহ-সভাপতি। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের শুরুর দিকে ওই ক্লাবটিতে অভিযান চালিয়ে সিলগালা করে দেয়া হয়।

র‌্যাবের ভাষ্য, কোরিয়ার এক নাগরিকের হাত ধরে অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসা শুরু করা সেলিমের ব্যবসা আছে থাইল্যান্ডসহ বেশ কিছু দেশে। তাকে অনেকেই চেনে ‘থাই ডন’হিসেবে। কারণ তার বিপুল অংকের বিনিয়োগ রয়েছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক ও পাতায়া শহরে।

কোটি টাকার গাড়িতে অস্ত্রধারী দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরা করতেন সেলিম। থাইল্যান্ডের পাসপোর্টধারী সেলিমের একাধিক স্ত্রী রয়েছে। এর মধ্যে একাধিক স্ত্রী বিদেশি নাগরিক বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, ওয়ান ইলেভেনের সময় উত্থান হওয়া সেলিম প্রধান একজন ঋণখেলাপি এবং বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচারকারী। রূপালী ব্যাংকের তার কাছে পাওনা ১০০ কোটি টাকা।

সেলিম প্রধান ‘প্রধান গ্রুপ’ নামে একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের চেয়ারম্যান। এই গ্রুপের অধীনে টি২১ ও পি২৪ গেমিংয়ের মাধ্যমে ক্যাসিনো খেলা হতো অনলাইনে। প্রধান গ্রুপের কোম্পানি জাপান বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপার্সের নাম রয়েছে ঢাকা চেম্বারের সদস্যদের তালিকায়। বেশ কয়েকটি স্পা ও বিউটি স্যালুন, এমনকি ল ফার্মও রয়েছে সেলিমের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। বিভিন্ন ব্যাংকের চেক ছাপানোর কাজটি করত সেলিমের প্রিন্টিংয়ের প্রতিষ্ঠানটি।

সেলিমের মামুন কানেকশন

বিএনপি আমলের আলোচিত ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় সেলিমের। বিএনপি সরকারের পতন হলেও সেলিম প্রধান থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। তিনি মামুনকে একটি বিএমডব্লিউ গাড়িও উপহার দিয়েছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। র‌্যাব বলছে, ক্যাসিনো ব্যবসার টাকা লন্ডনেও যেত।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার থাই এয়ারওয়েজে করে ব্যাংকক যাওয়ার সময় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান থেকে সেলিম প্রধানকে আটক করে র‌্যাব। এরপর সেলিমের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে তার গুলশানের বাসা ও বনানীতে তার একটি অফিসে অভিযান চালায় সংস্থাটি। দুই অভিযানে নগদ ২৯ লাখ টাকা, ৮০ লাখ টাকা মূল্যের বিদেশি মুদ্রা, আট কোটি টাকার চেক, ৪৮ বোতল মদ, হরিণের চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আলাদা মামলা হবে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

কে এই সেলিম?

ঢাকায় জন্ম নেয়া সেলিম বেড়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের গাউসিয়া এলাকায়। ভাইয়ের হাত ধরে ১৯৮৮ সালে জাপান চলে যান তিনি। সেখানে গাড়ির ব্যবসা শুরু করার পর সেখান থেকে থাইল্যান্ড যান। সেখানে শিপইয়ার্ডয়ের একটি ব্যবসা শুরু করেন। জাপানিদের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়। যার নাম মিস্টার দু। এ মিস্টার দু সেলিমকে বাংলাদেশ একটি কনস্ট্রাকশন সাইট খোলার প্রস্তাব দেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে একটি অনলাইন ক্যাসিনো খোলার পরামর্শ দেন। সেই সূত্র ধরে টি-২১ এবং পি-২৪ নামে অনলাইন গেমিং সাইট চালু করেন। এর মূল কাজ হচ্ছে টাকার মাধ্যমে খেলা। ওই কোরীয় ও সেলিমের ৫০-৫০ অনুপাতে লাভ ভাগের চুক্তি হয়েছিল।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, তাদের সাইবার মনিটরিং সেল দেখা যায়, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অনলাইনে ক্যাসিনো গেমিংয়ে নিয়োজিত। সোমবার জানতে পারেন এই ব্যবসার প্রধান সমন্বয়ক সেলিম প্রধান বাংলাদেশ থেকে চলে যাচ্ছিলেন। পরে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে বিমান থেকে আটক করা হয়।

পরে সোমবার রাতে গুলশান-২ এর ৯৯ নম্বর সড়কে ১১ সেলিমের বাড়িতে অভিযান চালায় র‌্যাব। এরপর মঙ্গলবার দুপুরে সেলিম প্রধানের বনানীর আরেকটি বাসায় অভিযান চালানো হয়। র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, দুই অভিযানে বিদেশি ৪৮টি মদের বোতল ছাড়া ২৯ লাখ পাঁচ হাজার ৫০০ নগদ টাকা, ২৩টি দেশের বৈদেশিক ৭৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকা সমমূল্যের মুদ্রা ও ১৩টি ব্যাংকের ৩২টি চেক জব্দ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে জব্দ করা হয়েছে অনলাইন ক্যাসিনো খেলার মূল সার্ভার, আটটি ল্যাপটপ এবং দুটি হরিণের চামড়া। সেলিমের দুই সহযোগী আক্তারুজ্জামান ও রোকনকে আটক করেছে র‌্যাব।

যেভাবে পরিচালিত হতো অনলাইন ক্যাসিনো

কেউ অনলাইনে ক্যাসিনো খেলতে চাইলে যেকোনো একটি গেমিং সফটওয়্যার মোবাইলে ইনস্টল করতে হতো। এরপর সেসব সফটওয়্যারে প্রবেশ করলে নানা ধরনের গেমস রয়েছে। গেমসগুলোতে পুরোপুরি বাংলায় নির্দেশনা রয়েছে। ওই গেমসে প্রবেশ করতে গ্রাহককে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যকাউন্ট বা ক্রেডিট কার্ডের প্রয়োজন হয়। নির্ধারিত গেমসের জন্য নির্ধারিত টাকা থাকতে হতো অ্যাকাউন্টে। খেলা শুরুর পর নির্ধারিত ওই টাকা তিনটি অনলাইন ‘গেটওয়ে’তে জমা হতো। গ্রাহক খেলায় জিতলে টাকা অ্যাকাউন্টে ফেরত যেত, অন্যথায় গেটওয়েতে থেকে যেত। এরপর প্রতি সপ্তাহে সেলিম প্রধানের সহকারী আক্তারুজ্জামান সেসব গেটওয়ে থেকে টাকাগুলো তিনটি অ্যাকাউন্টে জমা করতেন। এরপর সেসব টাকা হুন্ডি অথবা ব্যক্তির মাধ্যমে লন্ডনসহ বিভিন্ন দেশে পাচার হয়ে যেত।

জানা গেছে, পি-২৪-এর সঙ্গে বাংলাদেশে ১৫০টি অপারেটর এবং ক্যাসিনো যুক্ত আছে। অনলাইনে বিশ্বের সবচেয়ে প্রচলিত ক্যাসিনোর সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়ার ক্ষমতা আছে তাদের। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর জুয়াড়িদের মুঠোফোনে লাইভ ক্যাসিনোতে যুক্ত করে দেওয়ার সুবিধা চালু করা হয়েছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম ঢাকা টাইমসকে বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, মানি লন্ডারিং এবং মাদকদ্রব্য আইনে সেলিম ও তার দুই সহযোগীদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করা হবে। এদের এসব মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে।

(ঢাকাটাইমস/০১অক্টোবর/ডিএম/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :