সম্রাটের অফিসপাড়া সুনসান!

বোরহান উদ্দিন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:২৯ | প্রকাশিত : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ১০:১২

রাজধানীর কাকরাইলের ভূঁইয়া ম্যানশন ভবনটি ঘিরে গভীর রাতেও লোকারণ্য থাকত আশপাশের এলাকা। একজন নেতাকে ঘিরে নেতাকর্মীর পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের যাতায়াতে মুখর ছিল এই ভবন। দল কিংবা সংগঠনের কোনো কর্মসূচির সময় পুরো এলাকা নেতাকর্মীতে গিজগিজ করত। আশপাশের দোকানিদের বিকিকিনি ছিল রমরমা। সেই জমজমাট এলাকাটি এখন নির্জীব-মৃতপ্রায়। নেই আগের সেই কোলাহল। সুনসান চারপাশ।

মাত্র একজন মানুষের অনুপস্থিতির কারণে ভূঁইয়া ম্যানশনের আশপাশের এই চিত্রবদল। এই ভবনে ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি (বহিষ্কৃত) ইসমাইল হোসেন সম্রাটের ব্যক্তিগত কার্যালয় ও আড্ডাস্থল। ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার সম্রাট এখন কারাগারে। দল থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে তাকে। আগে যারা নিয়মিত ওই জায়গায় আসতেন তাদের কেউ আর ওদিক মাড়ান না। সংগঠনে তার অনুসারী ও সুবিধাভোগী ছোট-বড় অনেকে এমনকি গা ঢাকা দিয়েছেন অনাগত কোনো দুর্বিপাকের আশঙ্কায়।

লোকজনের আনাগোনা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে ওই এলাকার দোকানিদের বেচাবিক্রিতে। পাশের বারেও। এমনকি রাজমণি সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা এক দোকানির। অনেক নেতাকর্মী ও সম্রাটের কাছে আসা লোকজন দীর্ঘ অপেক্ষার সময় ঢুকে যেতেন প্রেক্ষাগৃহে। এই প্রেক্ষাগৃহের কোনায় বসা সিগারেট বিক্রেতা বলেন, ‘পুরা কাকরাইল খালি হইয়া গেছে। কাইলতন (কাল) সিনেমা হলও বন্ধ হয়ে যাইব। আমরা তো মাঠে মারা গেছি।’

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে যুবলীগ নেতা সম্রাটের নাম আলোচনার শীর্ষে উঠে আসে। কয়েক দিন কাকরাইলের ভূঁইয়া ম্যানশনে তার ব্যক্তিগত কার্যালয়ে অবস্থান করেন শতাধিক নেতাকর্মী ও যুবকের পাহারায়। পরে স্থানান্তর হলে তার অবস্থান নিয়ে সৃষ্টি হয় রহস্যের। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের সীমান্তবর্তী একটি বাড়ি থেকে গত ৬ অক্টোবর তাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

গতকাল কাকরাইল গিয়ে দেখা যায় ভূঁইয়া ম্যানশনের মূল ফটকে তালা। আশপাশের লোকজন জানান র‌্যাবের অভিযানের পর এখানে দু-একজন নিরাপত্তারক্ষীকে দেখা গেলেও কয়েক দিন ধরে কেউ নেই। তবে ভবনের সামনের দেয়ালে লাগানো যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক ও সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ এবং সম্রাটের ছবিসংবলিত ফেস্টুন আগের মতোই আছে।

ভবনের উল্টো দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে রমনা, হাতিরঝিল থানা যুবলীগের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানানোর ফেস্টুন ঝুলছে। এর উপরে সম্রাটের মুক্তি চেয়ে দুই যুবলীগ নেতার টানানো ফেস্টুন। ভুঁইয়া ম্যানশনের সামনেই বাঁ পাশে চায়ের দোকানের ওপরে এক যুবলীগ নেতার পক্ষ থেকে সম্রাটের মুক্তি চেয়ে ফেস্টুন টানানো দেখা গেছে।

পোস্টার-ব্যানারের এই ভিড়ে নেই কোনো নেতাকর্মীর পদচারণ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চায়ের দোকানি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আগে মানুষজন থাকত সারা দিন। চা-সিগারেট, বিস্কুট বিক্রি করতাম ধুমছে। আর এখন তো মানুষই আসে না।’ পাশে দাঁড়ানো একজন তার কথা টেনে নিয়ে বলেন, ‘আইবো (আসবো) কেন, অহন (এখন) তো ভাই নাই হেগো (তাদের)।’

এই কার্যালয়ে বসেই সম্রাট নিয়ন্ত্রণ করতেন ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবের ক্যাসিনো, জুয়া খেলার আসর। এসব থেকে পাওয়া অর্থ আসত এই ভবনে। টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজিসহ নানা দুষ্কর্মও নিয়ন্ত্রিত হতো এখান থেকে। মাসের দিন দশেক কাটাতেন সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনো খেলে। সেখানে উড়িয়ে আসতেন বিপুল টাকা। তার স্ত্রীর ভাষ্য, সম্রাটের একমাত্র নেশা ছিল জুয়া খেলা। সম্রাট যখন সিঙ্গাপুরে থাকতেন তখনো কাকরাইলের ওই এলাকাটি নেতাকর্মীসহ নানা লোকজনে সরগরম থাকত। এখন ‘১০ মণ ঘিও নেই রাধাও নাচে না’।

তিন যুগের বেশি সময় ধরে এই এলাকার ফুটপাতে দোকানদারি করেন চাঁদপুরের আরমান (ছদ্মনাম)। এই সময়ে তিনি বহুজনকে দেখেছেন রাতারাতি বদলে যেতে। টাকাপয়সায়, ক্ষমতায়। বলেন, ‘কত কী দেখলাম জীবনে। একটা সিগারেটের জন্য দাঁড়াইয়া থাকত, শুনলাম ওই লোকেরও নাকি কোটি কোটি টাকা।’ তবে দলের জন্য সম্রাটের মতো নেতাদের ত্যাগ আছে বলেও মনে করেন তিনি।

শুধু কাকরাইল না পুরো দেশই তো ঠান্ডা। বলেন আরমান, ‘সিনেমা হলে লোক নাই, সম্রাটের এখানে লোক নেই। পাশের বারেও লোকজন ভয়ে আসে না। আমাদের অবস্থা শেষ।’

রাজমণি সিনেমা হলের গেটে দায়িত্বরত একজন মজাচ্ছলে বলেন, ‘ভেতরেও (সিনেমা হলে) খালি, বাইরেও খালি।’ বলে হাত ঘুরিয়ে চারপাশটা ইশারা করেন।

র‌্যাবের অভিযান ঘিরে মিডিয়ায় বিপুল আলোচিত সম্রাটের কার্যালয় ভুঁইয়া ম্যানশন। ফলে ভবনটি নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলও কম নয় বোঝা গেল সরেজমিনে। ওই এলাকায় অবস্থানকালে এই প্রতিনিধি লক্ষ করেন, রিকশাযাত্রী ও পথচারীদের প্রায় সবাই জায়গাটি অতিক্রমকালে ভবনটির দিকে তাকান। একজন মা তার ছেলেকে সম্রাটের অফিসের ভবনটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, ‘এইটা সেই সম্রাটের ভবন।’

(ঢাকাটাইমস/১৩অক্টোবর/মোআ/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :