বইয়ের সাম্রাজ্য বাংলাবাজারে একদিন

এম. সুমন হোসেন
 | প্রকাশিত : ২১ নভেম্বর ২০১৯, ১২:০০

বাঙালির পুস্তক  সাম্রাজ্য বাংলাবাজার। এই এলাকায় ঢুকতেই খুশবু  জানান দেয় তার সাম্রাজ্যের নাম। একসময় জ্ঞানী-গুণী, লেখক, কবি-সাহিত্যিকদের পদচারণায় মুখরিত থাকত এই বাজার। আজ কালের পরিক্রমায় বিশেষ সময় ব্যতীত তাদের আর দেখা যায় না এই বাজারে। তারপরও এই বাজার মোটেই নিস্তরঙ্গ নয়, এর নিজস্ব একটি ঢেউ আছে।  চারপাশে সারি সারি বইয়ের দোকান, ভেতরে রাশি রাশি বই।  পুস্তকপাড়াটি বইয়ের গন্ধে ম-ম করে।
 
বাঙালির বাজার থেকে বাংলাবাজার
‘বাংলাবাজার এলাকাটি ছিল মোগল আমলের আগের ঢাকার একটি অতি পুরোনো অংশ। সেই যুগে এ এলাকা ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র। সুলতানি আমলে যখন ‘বাঙ্গালা’ শব্দটি জনপ্রিয় হলো, তখন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এ বাজার। অনেকে মনে করেন শুরু থেকেই এখানে বাঙালিরা ছিলেন, তারা একটি বাজার গড়ে তুলেছিলেন, তাই এর নাম বাংলাবাজার।’ সেখান থেকেই বাঙালিদের প্রতিষ্ঠিত সেই বাজার শত শত বছর ধরে বাংলাবাজার নামে চলে আসছে।
 
বইয়ের বাজার বাংলাবাজার
বাঙালির গড়ে তোলা বাংলাবাজারের জৌলুস এখন বড়ই বাড়বাড়ন্ত। অপরিসর গলি, গলির ভেতরে থরে থরে বিভিন্ন প্রকাশনীর দোকান আর বইয়ের বহুতল মার্কেটে আকীর্ণ এই এলাকায় এখন আকাশ দেখাই দায়। কিন্তু বইয়ের সঙ্গে বাংলাবাজারের সংশ্রব আকস্মিকভাবে ঘটেনি, আছে দীর্ঘ প্রেক্ষাপট। মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ ১৬১০ সালে ঢাকায় স্থাপন করলেন বাংলার রাজধানী। ১৮৬০ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হলো ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’, মানে ছাপাখানা। আর ১৮৬৫ থেকে ১৯০০ এই সময়পর্বে কলকাতার বটতলার পুঁথির আদলে বাংলাবাজারের পার্শ্ববর্তী চকবাজারে দেখা গেল অগুনতি মুসলমানি পুঁথি, গড়ে উঠল কেতাবপট্টি। বাংলাবাজারের সঙ্গে বইয়ের জোড় বাঁধার ক্ষেত্রে এই তিনটি ঘটনার প্রভাব আছে।

১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পরপর একটি-দুটি করে বইয়ের দোকান গড়ে ওঠে এখানে। সে সময় ছাপাখানাগুলো ছিল বাবুবাজারে এবং বাংলাবাজারে ছিল পুস্তক বিক্রয়কেন্দ্র। এছাড়া ব্রিটিশ রাজত্বে উনিশ শতকের শুরু থেকেই ধর্মীয় পুস্তকের দোকান গড়ে  বাংলাবাজারে।
 ১৯৪৭ সালের দেশভাগই প্রকৃত অর্থে নতুনভাবে বিন্যস্ত করল এই বই বাজারকে। সেই পঞ্চাশের সময় বুড়িগঙ্গা ও সদরঘাট লাগোয়া এই বাজার সম্প্রসারিত হয়েছিল যতটা না সৃজনশীল বইয়ের হাত ধরে, তার চেয়ে বেশি পাঠ্যপুস্তককে কেন্দ্র করে। বিশেষত ষাটের কালপর্বে যখন গড়ে উঠল পূর্ব পাকিস্তান পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ওই সময় প্রধানত পাঠ্যবইকে অবলম্বন করে স্বাস্থ্যবান হতে শুরু করল বাংলাবাজার। ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বইÑদুই রকম প্রকাশনায় বাজারটি ছিল রমরমা।
 
বর্তমানের বইয়ের বাজার বাংলাবাজার
পুরান ঢাকা পেরিয়ে বইয়ের হাটবাজার এখন যদিও ছড়িয়ে পড়েছে নতুন ঢাকায়, তবু বাংলাবাজারের মাহাত্ম্য একটুও কমেনি। প্রকাশকদের তথ্যমতে, বর্তমানে এখানে বইয়ের দোকান আছে প্রায় দুই হাজার। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত খুচরা ক্রেতারা হরহামেশা এখান থেকে বই কিনলেও এখন এটি বইয়ের পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত। দেশের সব জায়গায় এখান থেকে সরবরাহ করা হয় সহায়ক পাঠ্যপুস্তক ও সৃজনশীল বই। বাংলাবাজারের একাধিক সৃজনশীল প্রকাশকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন এখান থেকে ছয়-সাত লাখ টাকার মতো সৃজনশীল বইয়ের লেনদেন হয়। ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এই হার থাকে একটু বাড়তির দিকে। চৈত্রসংক্রান্তি ও পয়লা বৈশাখ মিলিয়ে কখনো বা চল্লিশ লাখ টাকার মতোও বিক্রি হয়।’ আর পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রতিদিন বিক্রি হয় কোটি টাকার ওপরে।’
 
এখানে এখন জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতিভুক্ত প্রকাশক আছেন ৭৮ জন। আর পুরোনো সংগঠন বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সদস্য তিন শর বেশি। সব মিলে সদস্যসংখ্যা চার শর ঘর ছুঁয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন অনেক প্রকাশক। অক্ষরবিন্যাস, মুদ্রণ, পেস্টিং, বাঁধাই ও লেমিনেশন,বইয়ের প্রশস্ত কর্মযজ্ঞে বাংলাবাজারের বইপাড়াকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করছেন লক্ষাধিক লোক।
 
বইমেলার প্রস্তুতি
সামনে অমর একুশে বইমেলা উপলক্ষে বাংলাবাজারের প্রেসপাড়াগুলোয় পাওয়া যায় খটখট আওয়াজ। বই ছাপানোর ব্যস্ততা চলছে পুরোদমে। আর বাঁধাইখানাগুলোয় চলছে বইয়ের কারিগরদের কাজ। সময়মতো পাঠকের হাতে বই তুলে দিতে চারদিকে যেন উৎসবের ব্যস্ততা।

বাংলাবাজারে প্রকাশক থেকে শুরু করে মুদ্রণ, বাঁধাই ও পরিবহনসহ এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি মানুষ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
বইমেলার তারিখ যত এগিয়ে আসছে ছাপাখানা ও বাঁধাইখানাগুলোয় এই ব্যস্ততা আরো বাড়ছে।  কাজের চাপ এত বেশি যে, ২৪ ঘণ্টা প্রেস চলছে। মার্চ মাস পর্যন্ত তাদের এই ব্যস্ততা থাকবে।

(ঢাকাটাইমস/২১নভেম্বর/এজেড)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :