জ্যেষ্ঠপুত্র: চলচ্চিত্রে ও জীবনে

সুলতানা স্বাতী
 | প্রকাশিত : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:০৩

আমার প্রাণের ’পরে চলে গেলো কে...অনেকদিন পর গানটি শুনলাম। আর তারপর সারা দিন ধরে শুনতেই থাকলাম। সেই সঙ্গে গানটি যে মুভির, সেটার দৃশ্যগুলো বারবার মনে করতে থাকলাম। আসলে মনে করলাম না, দৃশ্যগুলো বারবার মনের অজান্তেই মনে চলে এলো। আর খুব মনে পড়ছিলÑআমার গ্রামের বাড়ি। শৈশব। আত্মীয়স্বজন। ভাইবোন। আহা, ছোট ভাইটা আজ আমার থেকে বহুদূরে-কোন এক সমুদ্রে জাহাজে পাল তুলছে। বোনটা ঢাকাতেই থাকে। দেখা হয় মাঝে মাঝে। একসময়কার দিনরাতের সঙ্গীরা আজ দূরে দূরে। কিন্তু টান কি কমেছে এতটুকুও? আসলে দুটো মানুষের মধ্যে দূরত্ব হয় দুই রকমের। শারীরিক আর মানসিক। মন চাইলেই দেখা করা যায়, কথা বলা যায়। কিন্তু মানসিক দূরত্ব? একবার তৈরি হলে সেটা শুধু বাড়তেই থাকে। এই যা, ধান ভানতে শীবের গীত গাইছি! বলছিলাম ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ সিনেমাটির কথা। 

আসলে অনেকদিন পর, ‘নায়ক-নায়িকার জুটি’ ছাড়া একটি বাংলা সিনেমা দেখলাম কিনা। পুরো ছবিতে জুটি-দুই ভাই। ছবিজুড়ে রয়েছে ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের, ভাইয়ের সঙ্গে বোনের, ভাশুরের সঙ্গে ভাই-বউয়ের, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের টানাপড়েন, মান-অভিমান আর ভালোবাসার ছড়াছড়ি। ওই গানটার কথাই ধরুন না কেন- আমার প্রাণের ’পরে চলে গেলো কে...

শোকসভায় এসে গাইতে গাইতে সুদেষ্ণা যখন একসময় কান্নায় ভেঙে পড়লেন, তখন সুপারস্টার ইন্দ্রজিৎ সেখান থেকেই গানটা আবার শুরু করলেন। কোনো একসময় দুজনের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, কিন্তু পরিণতি পায়নি। কিন্তু যেন টানটা ঠিকই রয়ে গেছে। পুরো ছবিতে দেখা গেছে এই দুজনের সেই অভিমান, আন্তরিকতা, বন্ধুত্ব আর নির্ভরতা। ছবির শেষ অবদি, সুদেষ্ণাতেই নির্ভর করেছেন নায়ক। 
গানের শেষ দিকে এসে হট্টগোলের মধ্যে দেখা গেল দুই ভাইয়ের একমাত্র বোনটিকে, এত মানুষের ভিড়ে ভয় পেয়ে কাঁদছেন। আর সব ভুলে দুজনেই ছুটলেন মানসিক ভারসাম্যহীন বোনটিকে আগলাতে। রক্তের টান তো একেই বলে! কিন্তু তারপরও কিছু কথা থেকে যায়। যত টানই থাকুক না কেন, দুই ভাইয়ের মধ্যে রয়েছে গেছে চাপা ক্ষোভ, মান-অভিমান আর অহংবোধের ঠোকাঠুকি। বড় ভাই ইন্দ্রজিৎ সুপারস্টার। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। ছোট ভাই পার্থ গ্রামের নাট্যদলের নাট্যকার, অভিনেতা। পুরোনো আমলের বিশাল বাড়ি আর অফিস সামলেও যে শখের নাটক চালিয়ে যাচ্ছে। দুই ভাইয়ের মাঝে একমাত্র বোন ইলাÑ মানসিক ভারসাম্যহীন, যাকে রাখতে হয় ঘরবন্দি করে। বাবা, আর এই বোনটির দায়িত্ব একা পার্থই সামলেছে। বাবার হঠাৎ মৃত্যু দুই ভাইকে আবার একত্রিত করেছে। কিন্তু তারা কি একত্রিত হতে পেরেছে? পেরোতে পেরেছে মানসিক দূরত্ব? সুপারস্টার ভাই- নিজের দেশের বাড়িতে এক রাতও থাকেন না। মন্ত্রীর ঠিক করে দেয়া বাংলোতে ওঠেন। ছোট ভাই তো সেই বাড়িতেই থাকছেন বছরের পর বছর। শৈশব থেকে বেড়ে উঠেছেন যে বাড়িতে, স্টার হওয়ার পর সেখানে আর থাকতে পারছেন নাÑ এটা কি শুধুই সুপারস্টারের এত দিনের গড়ে ওঠা অভ্যাস? নাকি তিনিও বুঝিয়ে দিতে চান ব্যবধানটা? আর ছোট ভাই? ভালো অভিনেতা হয়েও পড়ে রয়েছেন গ্রামের নাট্যদলে। কেউ চেনে না তাকে। বড় ভাইয়ের জনপ্রিয়তায় তাই কি মনে দানা বেঁধেছে ঈর্ষা? নাকি দাদা তাকেও সুযোগ দিতে পারত, টেনে তুলতে পারত আরো ওপরের দিকে, কিন্তু তা করেননি। তাই তার প্রতি ক্ষোভ? নাকি সুপারস্টার হয়ে দাদা নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, তাদের খোঁজখবর রাখেননি, তাই নিয়ে অভিমান? 

একেবারেই পারিবারিক ছবি ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’। যেন আমাদের বাড়িরই গল্প। যেখানে জীবনে চলার সিঁড়িতে একজন উঠে যায় অনেক উঁচুতে আরেকজন থেকে যায় মাটিতে। আর তারা যদি হয় খুব কাছের, রক্তের সম্পর্কের, তাহলে তাদের সহাবস্থানটা কেমন হয়? রক্তের সম্পর্কও কি আলাদা স্তরের দুজন মানুষের ব্যবধান ঘোচাতে পারে? মৃত্যু একটা অনিবার্য। মৃত্যুর পরের পরিস্থিতিও অনিবার্য। সেখানও কি সুপারস্টারের তকমাটাই সব? ছবিটা দেখতে দেখতে তাই তো মনে অনেক প্রশ্নের জমা হয়েছে। ছবিটাকে মনে হয়েছেÑ ছোটগল্পের মতো। শেষ হয়েও হইলো না শেষ!

জ্যেষ্ঠপুত্রের চরিত্রে সুপারস্টার প্রসেনজিতের অভিনয় সংযত, সুন্দর। সংলাপের চেয়ে সংলাপহীন দৃশ্যগুলোতেই তিনি হয়ে উঠেছেন অনন্য। বাড়ির বড় ছেলে হয়েও নিজের অবস্থান না পাওয়ার, নিজের মতামতের গুরুত্ব না থাকার যন্ত্রণাগুলো ফুটে উঠেছে তার স্থির চিত্রগুলোর মাধ্যমে। বিশেষ করে নিজের খেয়ালে নৃত্যরত মানসিক ভারসাম্যহীন বোনের দিকে তার অপলক দৃষ্টি মন ছুঁয়েছে। ছোট ভাইয়ের চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তী তো অভিনয় করেন না, চরিত্রে ঢুকে যান। ভারতীয় বাংলা সিনেমার এক অসামান্য অভিনেতা তিনি। আর মানসিক ভারসাম্যহীন বোনের চরিত্রে সুদীপ্তা চক্রবর্তীর বিশ্বাসযোগ্য অভিনয়ে চোখে পানি চলে এসেছে বারবার। অসাধারণ অভিনয় করেছেন তিনি। আসলে জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ পুত্রের মাঝে এই ছবির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিই পরিবারের ‘মেজো’। তাই তো ইন্দ্রজিৎ ও পার্থের দৃশ্যগুলো ততটা ধাক্কা দেয় না, যতটা দাগ কাটে ইলার সঙ্গে দুই ভাইয়ের আলাদা আলাদা দৃশ্যে। সুদেষ্ণা চরিত্রে গার্গী রায়চৌধুরীর কঠিন ব্যক্তিত্বও যেন একেবারে মানানসই। এছাড়া ছবির প্রতিটি চরিত্রের লুকও নজর কেড়েছে। অসাধারণ, গ্ল্যামারাস ইন্দ্রজিতের পাশে অতিসাধারণ পার্থের বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে তাদের পোশাকে, মেকআপেও। 

‘জ্যেষ্ঠপুত্র’-এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন বাংলা সিনেমার ভিন্নধারার এক পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের নাম। কারণ ছবির মূল ভাবনা তারই। ‘অন্য নায়ক’ নামে এই চলচ্চিত্রটি বানাতে চেয়েছিলেন তিনি। ছবিমুক্তির আগে আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রসেনজিৎ জানিয়েছিলেন, তার মা মারা যাওয়ার সময় সঙ্গে ছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তখনই ছবির ভাবনাটা এসেছিল তার মাথায়। আর ছবির মূল নায়কও করতে চেয়েছিলেন তাকেই। কিন্তু হঠাৎ চলে যাওয়ায়, তার সে ভাবনা আর বাস্তবে রূপ পায়নি। তাই তো তার ইচ্ছের মর্যাদা দিতেই ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় রয়েছেন প্রসেনজিৎ। অন্যদিকে এক সাক্ষাৎকারে পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ছবিটির মাধ্যমে তিনি ঋতুপর্ণ ঘোষকে গুরুদক্ষিণা দেয়ার চেষ্টা করেছেন মাত্র। আরো জানিয়েছেন, তিনি প্রায়ই ঋতুপর্ণ ঘোষের বাড়ি যেতেন, বিশেষ করে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ যখন বানাচ্ছিলেন। তখনই ঋতুর কাছে এই গল্পটা শুনেছিলেন। তার ভাবনাকেই নিজের মতো করে সাজিয়ে ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ তৈরি করেছেন কৌশিক। ছবিটি তৈরির আগে ঋতুপর্ণ ঘোষের ভাই ইন্দ্রনীল ঘোষের অনুমতিও নিয়েছেন। 

‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ অর্থাৎ বাড়ির বড় ছেলে। শুধু জন্মগত কারণেই বড় নন, জ্যেষ্ঠপুত্র হতে গেলে দায়িত্বের ধারে ও ভারেও তাকে বড় হতে হয়। কিন্তু সব জ্যেষ্ঠই কি হতে পারে বড়? নিতে পারে ‘বড়’র দায়িত্ব? তাছাড়া জ্যেষ্ঠপুত্র তো কোনো পোস্টও নয়। এটি তাকে অর্জন করতে হয় না। জন্মসূত্রেই পায়। তবে জ্যেষ্ঠ হওয়ার গুণাবলি তাকে অর্জন করতে হয় বৈকি। এই ছবির জ্যেষ্ঠপুত্র প্রসেনজিৎ হতে কি পেরেছেন জ্যেষ্ঠ? পালন করেছেন জ্যেষ্ঠের দায়িত্ব? বাবা আর বোনের দায়িত্ব নিয়েছেন ছোট। তাহলে তিনি কেন পাবেন না জ্যেষ্ঠের মর্যাদা? আমাদের পরিবারে, সমাজে, দেশেও কি আমরা একই চিত্র দেখতে পাই না? যারা বড়, তারা কি সব সময় নিতে পারে দায়িত্ব? এমনকি, সবাই কি পারেন যার যার দায়িত্ব পালন করতে? আর যারা দায়িত্ব পালন করেন? তারা কি পান? সব সময় তারা কি সেই শ্রদ্ধা, সেই মর্যাদা পান? তাই তো, পার্থের গলায় শোনা যায় এমন সুর “এত বছর ধরে বাবাকে আমি একা দেখেছি, দাদা। কারো টিকিও দেখিনি। বাবার কাজ, আমি চাই না সেদিন কোনো স্টার বা সুপারস্টার আসুক। কালও বাবা আমার দায়িত্বেই থাক। জ্যেষ্ঠপুত্র কোনো অধিকার নয় দাদা!” আর বদলে চুপচাপ চলে যান জ্যেষ্ঠ ইন্দ্রজিৎ। কারণ তিনি জানেন, তার অপারগতা। বোঝেন, তার দায়িত্বহীনতা। রক্তের অধিকার খাটিয়ে ভাইয়ের ওপরও তাই তো জোর খাটাতে পারেন না। জোর গলায় বলতে পারেন না কিছুই। তাই তো ছবির নাম ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ যেন একেবারে সার্থক। তবে খুবই ছোট্ট একটা দ্বিধা- যত বড় সুপারস্টার হোক না কেন, গ্রামের বাড়িতে তাকে নিয়ে এতটা বাড়াবাড়ি কি হয়? বিশেষত যখন সবাই (ভক্তকুল) জানে, বাবার মৃত্যুতে শোকার্ত এক পুত্র এসেছেন। আরেকটি বিষয়, সুপারস্টাররা কি সব সময় স্টারের ইমেজই ধরে রাখেন? কখনোই কি তারা হতে পারেন না সাধারণ। কারো মৃত্যুতেও না?

(ঢাকাটাইমস/৫ডিসেম্বর/এজেড)

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিনোদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :