শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্র

পাঁচ পরিচালকের কোটি টাকার ভাড়া বাণিজ্য

সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:২১ | প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:১৩

ঢাকার কমলাপুরের টিটিপাড়ায় শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের নামে একটি জমি বরাদ্দ দেয় বাংলাদেশে রেলওয়ে। এককালীন মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ও মাসিক ভাড়ার ভিত্তিতে সেই জমি স্টার লাইন পরিবহন নামের একটি কোম্পানির কাছে ভাড়া দিয়েছে ক্রীড়া চক্রের পাঁচ পরিচালক। এজন্য তারা তাদের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে এলএসআরজেবি নামের একটি কোম্পানিও খুলেছেন। ওই কোম্পানির নামেই প্রতি মাসে ভাড়া তোলা হয়। এভাবে গত কয়েক বছরে তারা হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা।

রেলওয়ের একটি সূত্র জানায়, কমলাপুরের টিটিপাড়ায় রেলের ১৫ কাঠা জমি ২০১৩ সালে শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের নামের বরাদ্দ দেয়া হয়। ওই জমিতে স্থায়ী ক্লাব ও প্যাভেলিয়ান করার কথা ছিল। কিন্তু বরাদ্দের পর থেকেই ওই জমিটি একটি পরিবহন কোম্পানির কাউন্টার ও বাস রাখার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যদিও জমিটি ভাড়ার বিষয়ে তেমন কিছু জানেন না বলে ভাষ্য রেলের কর্মকর্তাদের।

সরেজমিনে ওই জায়গায় দেখা গেছে, স্টার লাইন পরিবহন নামে একটি কোম্পানি বাস কাউন্টার করেছে। পাশাপাশি ওই জায়গায় তারা তাদের বাসগুলোর রাখছে। প্যাভেলিয়ন ও খেলাধুলা চর্চার জন্য জায়গাটি বরাদ্দ হলেও সেখানে তার কোনো নমুনা পর্যন্ত নেই।

স্টারলাইন পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাজী আলাউদ্দিন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি এটা ভাড়া নিছি এলএসআরজেবির কাছ থেকে। ভাড়ার জন্য অগ্রিম দুই কোটি টাকাও দিছি। এই জায়গার জন্য মাসে দশ লাখ টাকা করে ভাড়া দিই।’

ক্রীড়াচক্রের জায়গা কীভাবে ভাড়া নিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের পাঁচজন পরিচালকের কাছ থেকে নিছি। চুক্তি হইছে এলএসআরজেবি (খঝজঔই) নামের কোম্পানির সঙ্গে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এলএসআরজেবি হলো শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের পাঁচজন পরিচালকের নামের আদ্যাক্ষর। এর প্রথম অক্ষরটি হলো ইসমত জামিল আকন্দ লাভলুর ‘এল’, দ্বিতীয় অক্ষরটি যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিমের নাম থেকে ‘আর’, সেলিমের নামের ‘এস’, এস এম জাহাঙ্গীরের ‘জে’ এবং বেলায়েত হোসেনের নামের ‘বি’।

স্টার লাইন পরিবহনের হাজী আলউদ্দিন বলেন, ‘মাস শেষে আমাদের কাছ থেকে এস এম জাহাঙ্গীর এসে ভাড়ার টাকা নগদে নিয়ে যান। তবে এদের সঙ্গে কথা হয়েছে যদি ক্রীড়াচক্র জায়গা চায় আমরা খালি করে দিমু।’

ভাড়া দেয়ার পর কোনো রশিদ দেয়া হয় কি-না প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘না, এই টাকার কোনো রশিদ আমাদের কাছে নাই। তবে আমরা যে টাকা দিই তার একটা হিসাব তো আছেই।’

তার কথার সত্যতা পাওয়া যায় স্টার লাইন পরিবহনের আরেক পরিচালক সাইদুল হক মিন্টুর বক্তব্যে। তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা মোটা অংঙ্কের টাকা ডোনেশন দিয়ে জায়গাটা নিয়েছি। তবে সেটা শেখ রাসেলের কাছ থেকে নয় জাহাঙ্গীর ও রেজার কাছ থেকে।’

জানতে চাইলে শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের পরিচালক এস এম জাহাঙ্গীর ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এই জায়গা সম্পর্কে আপনার জানার দরকার কী?’

জায়গা ভাড়ার বিষয়টি আরেক পরিচালক রেজাউল করিম দেখেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘ক্রীড়াচক্রের ওই জমির বিষয়টি রেজা ভাই দেখেন। আমি জানি না।’

ভাড়ার টাকা তিনি আদায় করেন কি করে প্রশ্ন করলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের এই পরিচালক।

অন্যদিকে শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগ সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিমের কাছে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে তার অফিসে যেতে বলেন।

প্রতিবেদক আরকে মিশন রোডে তার অফিসে গিয়ে ক্রীড়াচক্রের নামে বরাদ্দ জায়গায় ভাড়া বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে রেজাউল বলেন, ‘আমরা জায়গাটা ভাড়া দিতে পারছিলাম না। পরে নিজেরাই এটা নিয়ে নিই। কিছু টাকা লাভে আমরা এটি স্টার লাইনকে ভাড়া দিই।’

কিন্তু প্রতি মাসে স্টার লাইন থেকে ভাড়া বাবদ আদায় করা ১০ লাখ টাকা ক্রীড়াচক্রের ফান্ডে জমা পড়ে কি-না প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘জমা দিই। তবে মাঝে মধ্যে মিস হয়ে যায়।’ মাঝেমধ্যে জমা দেয়ার কোনো প্রমাণ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে অপরাগতা দেখান।

ঢাকা রেলওয়ে (কমলাপুর) স্টেশনের অধীনে থাকা ভূমিগুলোর দেখভালের দায়িত্বে কমলাপুরে একজন ভূমি কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আর সহকারী স্টেট অফিসার নজরুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে জানান, ২০১৩ সালে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই জমিটি শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল।

তবে জমিটি কী কাজে ব্যবহার হয়ে আসছে জানেন না দাবি করে তিনি বলেন, ‘যেহেতু এটি একটি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বরাদ্দ হয়েছে, তাই উক্ত জমির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আমরা অবহিত নই।’

শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের নামে বরাদ্দ জায়গা কীভাবে পাঁচ পরিচালক অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দিয়েছে জানতে ক্রীড়াচক্রের চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান তানভীরের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের একজন পরিচালক নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ক্রীড়াচক্রের নামে স্টার লাইন কোম্পানি থেকে দুই কোটি টাকা নিয়ে এই পাঁচ পরিচালক ভাগ করে নিয়েছেন। আর ভাড়া হিসেবে প্রতি মাসে নেয়া টাকাও ক্রীড়াচক্রের ফান্ডে আসে না।’

তার অভিযোগ, এই পাঁচ পরিচালক ক্রীড়াচক্রকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছেন। কারও কিছু বলার নেই। তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই ঝামেলা।

(ঢাকাটাইমস/১৫ডিসেম্বর/এসআর/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :