শশীকাহন: পৌরাণিক উপাখ্যান:ফ্যান্টাসি থ্রিলার সিরিজ,পর্ব- বার

ড. রাজুব ভৌমিক
 | প্রকাশিত : ২০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৫০

ঠিক পরের দিন মহারাজা মঞ্জট তার বিশাল সেনাবহরকে ছোট কুনিকা রাজ্যের চারদিক মোতায়েন করে। মঞ্জটের আদেশ অনুযায়ী, কুনিকা রাজ্যের রাজা সিয়ন্ত তার রাজ্যে ঘোষণা করে যে, যতদিন পর্যন্ত মহারাজ মঞ্জটের পঞ্চযজ্ঞ শেষ না হবে ততদিন পর্যন্ত কুনিকা রাজ্যের বাসিন্দাদের তাদের বাড়ি-ঘর থেকে বাহির হতে পারবে না। সারা কুনিকা রাজ্যে প্রজাদের মধ্যে ভয়ভীতির সৃষ্টি হয়। ঘোর কুনিকা রাজ্যের রাজা সিয়ন্ত মহারাজা মঞ্জটের ভয়ে অস্থির। মহারাজা মঞ্জটকে সবাই অনির্দেশ্য, ধৈর্যচ্যুত, এবং উত্তেজিত রাজা হিসেবে চিনে। উপরন্তু মঞ্জট লক্ষাধিক সেনা নিয়ে সে কুনিকা রাজ্যে হাজির। এদিকে দেরি না করে মঞ্জট কুনিকা রাজ্যের বিশাল কুনিকা সমুদ্র এবং বিশাল কুনিকা পর্বতের মধ্যকার স্থানটি মহারাণী সুনীতিকে নিয়ে দেখা করতে যায়-উদ্দেশ্য অনুশীলন করার। কারণ পঞ্চযজ্ঞটি এক সাথে পর্বত, সমুদ্র, এবং স্থলে মঞ্জটকে করতে হবে। উপরন্তু মঞ্জট কে এক সাথে তিনস্থানে বসে মন্ত্রগুলো একসুরে পাঠ করতে হবে। যদি মঞ্জট পঞ্চযজ্ঞ শুরু করে শেষ না করতে পারে তাহলে তার শরীর সাথে সাথে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তাই মহারানী সুনীতির ইচ্ছা তে এই অনুশীলন। মহারানী সুনীতি তার মায়া-শক্তি ব্যবহার করে মঞ্জটকে একসাথে তিনস্থানে স্থানান্তরিত করার জন্য এই অনুশীলন।

মহারানী সুনীতি ও মহারাজা মঞ্জট কুনিকা সমুদ্র ও কুনিকা পর্বতের সামনের এক স্থলভাগে দাঁড়ায়। তাদের সামনে উত্তাল সমুদ্র এবং বামে কুনিকা পর্বত। সমুদ্রের মধ্যে অনেকগুলি স্রোতের ধারা বইছে-মহারাণী সুনীতি তা মুগ্ধ হয়ে দেখছে। মহারাজ মঞ্জটের আদেশ অনুযায়ী বর্তমানে এই এলাকাটি শশী শূন্য-শুধু মঞ্জট এবং সুনীতি একাকী ঐ স্থানে অবস্থান করছে। কুনিকা রাজ প্রহরী এবং লাগগিন্তা সেনারা বহুদূর থেকে এ অনুশীলনের জন্য মহারাজা ও মহারাণীকে নিরাপত্তা দিচ্ছে। ‘মহারাজ, কাল ক্ষেপন না করে অনুশীলন তাহলে আমরা শুরু করি?’ মহারানী সুনীতি বলল। মঞ্জট তাতে সম্মতি দিল। কিছুক্ষণ পর মহারানী তার মন্ত্রবলে শশী রূপ থেকে রাক্ষসীর রূপ ধারণ করে। এরপর সুনীতি তার মায়াবী বল প্রয়োগ করে মহারাজা মঞ্জটকে পর্বতের উপরে স্থানান্তরিত করার চেষ্টা করে-এবং বহুচেষ্টার পর সে সফল হয় কিন্তু সুনীতি মঞ্জটকে এক সঙ্গে দুই জায়গা তে স্থানান্তরিত করতে পারছে না। এবার সুনীতি তার মায়াবল প্রয়োগ করে মঞ্জটকে সমুদ্রের উপরে ভাসানোর চেষ্টা করছে। বহুবার চেষ্টা করেও সুনীতি সফল হয়নি। এভাবে সারাদিন অতিবাহিত হয়ে যায়। ‘মহারাজ, আজকে আমি অনেক ক্লান্ত। চলুন আগামীকাল প্রাভাতিকে আমরা এখানে এসে আবার অনুশীলন করব।’ মহারানী সুনীতি মঞ্জটকে অনুরোধ করল। এরপর তারা এ স্থান ত্যাগ করে কুনিকা রাজ্যে গঠিত তাদের শিবিরে চলে যায়।

পরেরদিন যথাসময়ে মহারানী সুনীতি ও মহারাজ মঞ্জট সমুদ্রের সামনে এসে আবার অনুশীলন শুরু করল। বহুবার চেষ্টা করেও সুনীতি তার মায়াবী শক্তি প্রয়োগ করে মঞ্জটকে দুই বা ততোধিক স্থানে স্থানান্তরিত করতে সফল হয়নি। এভাবে তারা দিনের পর দিন একসাথে সমুদ্রের ও পর্বতের সামনে অনুশীলন করে কিন্তু কিছুতেই তারা সফল হয়নি। মহারাজ মঞ্জট আশান্বিত হয় এবং রেগে-মেগে আগুন। ক্রোধিত মহারাজ মঞ্জট ক্ষেপে গিয়ে মহারাণী সুনীতিকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। মহারাণী সুনীতি বহুবার কাকুতি-মিনতি করে মহারাজা মঞ্জটের কাছে আরো একদিনের জন্য সুযোগ চায়। মঞ্জট সুনীতির কথায় অবশেষে রাজী হয়। ‘আগামীকাল সূর্যাস্তের পূর্বে যদি তুমি তোমার মায়া শক্তি প্রয়োগ করে সফল না হও, তাহলে সূর্যাস্তের পর তোমাকে আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে।’ মহারাজা মঞ্জট ক্ষেপে বলল।

সেদিন রাত মহারানী সুনীতি তার কক্ষে বসে চিন্তা করতে লাগল। হঠাৎ সুনীতির গুরুর কথা মনে পড়ে যায়। সুনীতির গুরু বহুবছর আগে মারা গেছে। সুনীতি ভাবল এখন তার গুরুর সহযোগিতা ছাড়া আর কোন উপায় নাই। সুনীতি মন্ত্রবলে তার গুরুর আত্মাকে আহ্বান করে। সে ভাবল যে একমাত্র তার গুরুই তাকে এ দু:সময়ে সহযোগিতা করতে পারে। কিছুক্ষণ পর সুনীতির গুরুর আত্মা এসে হাজির। ‘সুনীতি তুই আমারে কেন আহ্বান করলি? তোর এত বড় স্পর্ধা!’ গুরুর আত্মা সুনীতিকে শাসায়। ‘গুরুদেব, আমায় ক্ষমা করুন। আজ এক ভীষণ বিপদে পড়ে উপায়ান্তর না দেখে আপনার শরণাপন্ন হয়েছি।’ সুনীতি কাঁদতে কাঁদতে তার গুরুকে সব ঘটনা খুলে বলল। ‘আমি কাউকে এই বিদ্যা শিখায় নি কারণ এ বিদ্যার অনুশীলন খুবই কঠিন। তোকে এই মায়া শক্তি প্রয়োগ সমুদ্রতলে ডুব দিয়ে করতে হবে। তারপর তোর মায়াশক্তির প্রভাবে মঞ্জট একসাথে তিন বা ততোধিক স্থানে একইসময়ে উপস্থিত হতে পারবে। কিন্তু মনে রাখবি তুই যখনি জলের উপরে উঠে যাবি ঠিক তখনই তোর এ মায়া শক্তি ক্ষমতা হারাবে। তাই তোকে খুব সাবধানে এই মায়া শক্তির প্রয়োগ করতে হবে।’ গুরু নির্দেশ দিল। সুনীতির মনে অবশেষে স্বস্তি ফিরে আসে। ‘গুরদেব, আপনার সহযোগিতা এবং নির্দেশনার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমি আপনার আদেশ অনুযায়ী তাই করার চেষ্টা করব। আমায় আপনি আশীর্বাদ করুন।’ এর পর গুরুর আত্মা অদৃশ্য হয়ে যায়। সুনীতি ভাবল আগামীকাল অনুশীলন তাকে যে কোনভাবে সফল হতে হবে। এছাড়া যে তার আর কোন উপায় নাই।

সূর্যোদয়ের পরে মহারাণী সুনীতি এবং মহারাজা মঞ্জট যজ্ঞের অনুশীলন করার জন্য সমুদ্রের পাড়ে যায়। এরপর সুনীতি মহারাজ মঞ্জটকে বলল, ‘মহারাজ আপনি স্থলে দাঁড়িয়ে থাকুন। আমি সমুদ্রের ভিতরে যাচ্ছি। সমুদ্রের মধ্যে ডুব দিয়ে আমি আমার মায়াশক্তি প্রয়োগ করার চেষ্টা করব এবং এতে আপনি একইসাথে তিন স্থানে যেতে পারবেন।’ এ কথা বলতে বলতে মহারানী সুনীতি সমুদ্রের মধ্যে নেমে একটি ডুব দেয়। মঞ্জট অবাক হয়ে সুনীতির দিকে তাকিয়ে থাকে। সুনীতি কি করছে মঞ্জট তা বুঝতে পারছে না। সমুদ্রের মধ্য ডুব দিয়ে সুনীতি তার মায়াশক্তির প্রয়োগ করা শুরু করে-এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সুনীতি মঞ্জটকে একসাথে তিন স্থানে স্থানান্তরিত করতে সক্ষম হয়। মঞ্জট তার দুই চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। মঞ্জট একসাথে কুনিকা পর্বতের চূড়াতে, কুনিকা সমুদ্রের উপরে, এবং স্থল ভাগে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর সুনীতি সমুদ্র থেকে বাহির হয়ে আসে। মায়াশক্তির প্রভাব শেষ হয় এবং মঞ্জট এখন শুধু সমুদ্রের সামনে স্থলভাগে দাঁড়িয়ে আছে। মহারাজ মঞ্জট রানী সুনীতির সফলতায় ভীষণ খুশি হয় এবং তাকে বলল, ‘মহারানী, আজ আমি তোমার কাজে ভীষণ খুশি। আগামী কালই আমি পঞ্চযজ্ঞের মূল অনুষ্ঠানটি করব।’

পঞ্চযজ্ঞের মূল অনুষ্ঠানের জন্য পরেরদিন একজন পুরোহিত সহ মহারাজা মঞ্জট ও মহারানী সুনীতি সমুদ্রের ধারে আসল। পুরোহিত যজ্ঞের সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করল। ‘মহারাজা, যজ্ঞের জন্য সব প্রস্তুত। আপনি তিন স্থানে স্থানান্তরিত হবার পর আমার সঙ্গে মন্ত্রগুলো পাঠ করবেন।’ পুরোহিত বলল। মহারানী সুনীতি পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আগেই সমুদ্রের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। মঞ্জট সুনীতি কে সব প্রস্তুতের ইশারা দিল-এরপর সুনীতি সমুদ্রের মধ্যে একটি ডুব দিয়ে মায়াশক্তি প্রয়োগ করতে থাকে। সুনীতির মায়াশক্তির প্রভাবে মঞ্জট মুহূর্তেই পর্বতের উপরে, সমুদ্রের উপরে, এবং স্থলে স্থানান্তরিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে পুরোহিত পঞ্চযজ্ঞের মন্ত্র পাঠ করা শুরু করে। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টা চলে যায়। মহারানী সুনীতি মন্ত্রবলে এখনো সমুদ্রের তলদেশ থেকে মঞ্জটের জন্য মায়াশক্তি প্রয়োগ করছে কিন্তু সুনীতির মায়া ক্ষমতা ক্ষণে ক্ষণে ফুরিয়ে আসছে। সুনীতির শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে আসছে। এদিকে পুরোহিত মন্ত্র পাঠ করে চলছে। পুরোহিতের চোখ ও মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে। মঞ্জট পুরোহিতের সাথে সাথে মন্ত্র-পাঠ করছে। মঞ্জট বারবার পুরোহিতের দিকে তাকাচ্ছে কারণ মঞ্জট জানত পুরোহিতের মৃত্যুর পরই তার পঞ্চযজ্ঞ সম্পন্ন হবে-সম্পন্ন না হলে মঞ্জটের মৃত্যু হবে।

মন্ত্রপাঠ করতে করতে কিছুক্ষণ পর পুরোহিতের মৃত্যু হয়। পঞ্চযজ্ঞ অবশেষে সম্পন্ন হয়। মঞ্জট মহারানী সুনীতিকে সমুদ্রের তলদেশ থেকে তুলে নিয়ে আসে। সুনীতির শরীরের অবস্থা বেশ খারাপ। সুনীতি অজ্ঞান হয়ে সমুদ্রের পাড়ে পড়ে আছে। মঞ্জট পাঁচ দেবতার দর্শনের অপেক্ষায় সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু দেবতাদের এখনো কোন দেখা নাই। অসামাল মঞ্জট তার হাতের চুরিটি দিয়ে আত্মহত্যা করতে উদ্যত হয়। এমন সময় পাঁচ দেবতা ( পাপ ও দুষ্কর্মের দেবতা কিতমু, অস্ত্রের দেবতা আম্ভু, সমুদ্র ও বৃষ্টির দেবতা জিনরু, ধন সম্পদের দেবতা শিশক্রু, এবং পর্বতের দেবতা কুন্ত্রা) মঞ্জটের সামনে এক সাথে হাজির হয়। ‘মঞ্জট, দাঁড়াও!’ অস্ত্রের দেবতা আম্ভু বলল। মঞ্জট তাকিয়ে দেখল তার সামনে পাঁচ দেবতা এসে হাজির। ‘তোমার যজ্ঞে আমরা ভীষণ খুশি। বলল তুমি কি বর চাও? তোমাকে আমরা সবাই একটি করে বর দিব।’ সমুদ্র ও বৃষ্টির দেবতা জিনরু বলল। মঞ্জট তখন পাপ ও দুষ্কর্মের দেবতা কিতমুর কাছে তার পূর্বের সকল পাপ থেকে মুক্তি, অস্ত্রের দেবতা আম্ভুর কাছে তার প্রিয় অস্ত্র ‘রম্ভাস্ত্র’, সমুদ্র ও বৃষ্টির দেবতা জিনরুর কাছে ‘ইচ্ছা বৃষ্টি’, ধন সম্পদের দেবতা শিশক্রুর কাছে তার রাজকোষ ভর্তি সম্পদ, এবং পর্বত দেবতা কুন্ত্রার কাছে এক হাজার সিংহ চাইল। ‘তথাস্তু’ বলে সব দেবতা চলে গেল।

সব দেবতাদের বর পেয়ে মঞ্জট আরো বেপরোয়া হয়ে গেল। অসুস্থ মহারাণী সুনীতিকে রথে নিয়ে মঞ্জট সাথে সাথে কুনিকা রাজ্য ত্যাগ করে লাগগিন্তা রাজ্যে চলে যায়। লাগগিন্তা রাজপ্রাসাদে পৌঁছে মঞ্জট সাথে সাথে তার রাজকোষ দেখার জন্য যায়। ধন সম্পদের দেবতা শিশক্রুর কাছে পাওয়া বর অনুযায়ী মঞ্জট তার রাজকোষ ভর্তি সোনা ও অর্থ দেখতে পায়। মঞ্জট আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়।

মঞ্জট বুঝতে পারে যে পুরো চন্দ্রগ্রহে এখন তার মত ধনবান রাজা দ্বিতীয় কেউ নেই। মঞ্জট সাথে সাথে তার মন্ত্রীকে ডেকে রাজকোষের অর্ধেক সম্পদ ব্যবহার করে তার সেনা সংখ্যা বিশ লক্ষে পরিণত করতে আদেশ করে। পুরো চন্দ্রগ্রহে সবগুলো রাজ্য মিলিয়ে বিশ লক্ষ সেনা নাই সেখানে মঞ্জটের সেনা সংখ্যা বর্তমানে পনের লক্ষের উপর। উপরন্তু মঞ্জটের ইচ্ছা তার রাজ্যের জন্য বিশ লক্ষ সেনা সক্রিয় রাখা।

মহারাজা মঞ্জট তার নতুন সেনাপতি কৈন্তানিকে তার কক্ষে ডেকে পাঠায়। কিছুক্ষণ পর সেনাপতি মঞ্জটের কক্ষে প্রবেশ করে। ‘সেনাপতি, আপনি লাগগিন্তা রাজ্যের দশ লক্ষ সেনা নিয়ে কৌশলে লাগগিন্তা ও চলদাজ রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকা লাগান্ত-তে নিয়ে যান। আমরা লাগান্ত এলাকায় সেনা শিবির তৈরি করে ওখান থেকে চলদাজ রাজ্যে অতর্কিত আক্রমণ করব। আপনি সেনা নিয়ে পৌঁছার পর আমি পাঁচ লক্ষ সেনা নিয়ে আপনার পরে আসছি। এরপর সব সেনা নিয়ে এক সাথে আমরা চলদাজ রাজ্যে আক্রমণ করব। মহামন্ত্রী বাকি পাঁচ লক্ষ সেনা নিয়ে লাগগিন্তা রাজ্যে আমার আদেশের অপেক্ষায় থাকবে।’ মহারাজা মঞ্জট সেনাপতি কৈন্তানিকে বলল। সেনাপতি কৈন্তানি মঞ্জটের আদেশ নিয়ে চলে যায়। মঞ্জটের আদেশ অনুযায়ী পরেরদিন গভীর রাতে সেনাপতি কৈন্তানি দশ লক্ষ সেনা নিয়ে লাগান্তের উদ্দেশে চলে যায়।

লাগান্ত, এ এলাকাটি শশী শূন্য, মরুভূমি ও পাহাড়ে বেষ্টিত একটি দুর্গম এলাকা। এটি লাগগিন্তা রাজ্যের শেষ অংশে অবস্থিত যেটির অপর অংশে চলদাজ রাজ্যের সীমান্ত। লাগান্তের আশে পাশে কয়েক শত মাইলের মধ্যেও কোন জলাধার নেই তাই লাগান্তে শশীরা ভয়ে কখনো আসে না। লাগান্ত এলাকাটিতে দুই রাজ্যের কোন সেনা সীমান্ত পাহারায় থাকে না কারণ সবাই জানে এ এলাকা দিয়ে শশীরা রাজ্য অতিক্রম করে না বা করতে পারে না। আর যারা পূর্বে এই এলাকা দিয়ে রাজ্য অতিক্রম করার চেষ্টা করছে তারা জীবিত ফিরতে আসতে পারে নি। কথিত আছে মহারাজা মঞ্জটের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে হাজার হাজার লাগগিন্তাবাসী এই এলাকা দিয়ে চলদাজ রাজ্যে যাবার চেষ্টা করেছিল কিন্তু সবাই ক্ষুধার্ত এবং তৃষ্ণার্ত হয়ে লাগান্তের ভূমিতে মিশে গেছে। মহারাজ মঞ্জট সেনাপতি কৈন্তানিকে পাঁচদিনের খাবার ও পানীয় নিয়ে যেতে আদেশ দিয়েছে। কৈন্তানি দশ লক্ষ সেনা নিয়ে লাগান্তে পৌঁছে যায়। যেহেতু লাগান্ত সীমান্তে কোন চলদাজ সেনা সীমান্ত পাহারায় নাই তাই চলদাজ রাজ্যের মহারাজ এখনো জানে না যে চলদাজ রাজ্যের উপর শীঘ্র আক্রমণ হতে যাচ্ছে। এখন লাগগিন্তা রাজ্যের সেনারা মহারাজ মঞ্জটের জন্য অপেক্ষা করছে। যে খাবার বা পানীয় আছে তা দিয়ে এই দশ লক্ষ সেনা কিছুতেই দুর্গম লাগান্তের অর্ধেক পথও পাড়ি দিতে পারবে না। এর আগেই তাদের মৃত্যু হবে। তাই সেনাপতি কৈন্তানি লাগান্তে পৌঁছে ভিতরে না প্রবেশ করে পাশেই সেনা শিবির তৈরি করে মহারাজ মঞ্জটের আগমনের অপেক্ষায় থাকে।

মহারাজ মঞ্জট দুইদিন পরে এক গভীর রাতে পাঁচ লক্ষ সেনা নিয়ে লাগান্তের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। কয়েকদিনেই মঞ্জট তার পাঁচ লক্ষ সেনার সাথে প্রচুর পরিমানে খাবার নিয়ে লাগান্তে পৌঁছে যায়। মঞ্জট সেনাপতি কৈন্তানির সাথে দেখা করে। ‘মহারাজ, এখানকার উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে সেনাদের সব পানীয় গতকাল শেষ হয়ে যায়। আমাদের অনেক খাবার মজুদ আছে কিন্তু পানীয় জলের অভাবের কারনে সেনারা কিছু খেতে পারছে না। এদিকে উষ্ণ আবহাওয়াতে জল পান না করতে পেরে সেনারা ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়ছে মহারাজ।’ সেনাপতি কৈন্তানি মহারাজা মঞ্জটকে বলল। মহারাজা মঞ্জট তখন বলল, ‘যাও, সব সেনাদের একত্রিত করে মরুভূমি তে কয়েকটি পুকুর তৈরি করতে আদেশ দাও।’ মহারাজের কথায় সেনাপতি কিছুটা অবাক-কিছু না বুঝতে পেরে সেনাপতি কৈন্তানি বলল, ‘মহারাজ আমায় ক্ষমা করুন কিন্তু মরুভুমিতে পুকুর তৈরি করে কি লাভ? আমার সেনারা এই গরমের তেষ্টায় মরে যাচ্ছে।’ মহারাজ মঞ্জট রেগে বললেন, ‘যান, আপনি সব সেনাদের আদেশ দিন পুকুর তৈরি করতে। পনের লক্ষ সেনার এক শত পুকুর তৈরি করতে বেশিক্ষণ লাগার কথা নয়।’ সেনাপতি বুঝতে পারল নিশ্চয় মহারাজের কোন উপায় আছে। আপনার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন হবে মহারাজ।’ এই বলে সেনাপতি চলে যায়।

সেনাপতি কৈন্তানি সব সেনাদের বিকেল হবার আগেই একশত পুকুর তৈরি করার জন্য নির্দেশ দেয়। সাথে সাথে সব সেনারা পুকুর তৈরিতে লেগে যায়। বেলা যখন দুপুর হয়, তখন তৃষ্ণার্ত হয়ে প্রায় এক হাজার লাগগিন্তা সেনা মারা যায়। বাকী সেনারা পুকুর তৈরি করতে করতে দুর্বল হয়ে পড়ে। ঐ দিন বিকেলের মধ্যেই একশত পুকুর খনন হয়ে যায়। পুকুর খনন সম্পন্ন হলে সেনাপতি মহারাজা মঞ্জটের শিবিরে আসল, ‘মহারাজ, আপনার আদেশ অনুযায়ী একশত পুকুর খনন করা সমাপ্ত হইল।’ মঞ্জট পুকুরগুলিকে দেখার জন্য বাহিরে যায়। জলশূন্য পুকুর দেখে মহারাজ মঞ্জট খুব খুশি হয়। এরপর মঞ্জট সমুদ্র ও বৃষ্টির দেবতা জিনরু কে আহ্বান করে কারণ পঞ্চযজ্ঞের শেষে মঞ্জট দেবতা জিনরুর কাছে ‘ইচ্ছা বৃষ্টি’ এর বর পায়। তাই বর অনুযায়ী সাথে সাথে মরুভূমি তে প্রবল বেগে বৃষ্টি নামে। আর সাথে সাথে পুকুরের জন্য তৈরি করা গর্তগুলো ভরে যায়। সেনারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। সেনারা কাজ করতে নতুন ভাবে উদ্দাম ফিরে পায়। পঞ্চযজ্ঞের শেষে মঞ্জট দেবতাদের কাছে কোন কোন বর পায় তা একমাত্র মঞ্জট ছাড়া কেউ জানে না। সেনারা মহারাজ মঞ্জটকে দেবতা মানতে থাকে।

এদিকে লাগান্ত মরুভূমিতে বৃষ্টির ঘটনাটি সাথে সাথে মহারাজ রাসঙ্কের কানে পৌঁছে যায়। মহারাজ রাসঙ্ক মরুভূমিতে বৃষ্টি হচ্ছে এই খবরটি পেয়ে এক দল গুপ্তচর পাঠায় তথ্য সংগ্রহ করার জন্য। চলদাজ রাজ্যের গুপ্তচররা লাগান্তে পৌঁছলে দূর থেকে লাগগিন্তা রাজ্যের লক্ষ লক্ষ সেনা দেখতে পায়। এরপর গুপ্তচররা সাথে সাথে চলদাজ রাজ্যে ফিরে গিয়ে মহারাজা রাসঙ্ককে সব জানায়। মহারাজ রাসঙ্ক জানে তার রাজ্যে সরাসরি আক্রমণ করে মঞ্জট কখনো সফল হতে পারবে না কিন্তু মঞ্জট পনের লক্ষ সেনা নিয়ে যুদ্ধ করতে হাজির এই কথা শুনে রাসঙ্ক একটু ভয় পেয়ে যায়। মহারাজা রাসঙ্ক যুবরাজ শিহিলকে রাজপ্রাসাদে ডেকে পাঠায়। যুবরাজ শিহিল চলদাজ রাজ্যের সেনাক্যাম্পে সেনাদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষনের সব ব্যবস্থা দেখাশুনা করেছে। গুপ্তচর থেকে খবর পেয়ে যুবরাজ শিহিল, সেনাগুরু ও দেবী আজ্রিয়ার পুত্র কিবন এবং শিহিলের পুত্র তৃষকে নিয়ে রাজপ্রাসাদ মহারাজা রাসঙ্কের সাথে দেখা করতে যায়।

‘পিতাশ্রী, আমি আপনাকে পূর্বে বহু বার সতর্ক করেছি যে লাগগিন্তা রাজ্যের মহারাজা মঞ্জট একদিন না একদিন চলদাজ রাজ্য আক্রমণ করতে আসবে। আজ আমার কথা সত্যি হল পিতাশ্রী। আমাদের পূর্বেই লাগগিন্তা রাজ্যে আক্রমণ করা উচিত ছিল। চিতলা রাজ্যের রাজা চিগুর আক্রমনের পর লাগগিন্তা রাজ্যের সেনা ক্ষমতা ছিল খুব কম। এখন তাদের সেনা ক্ষমতা আমাদের চেয়ে তিনগুন বেশি। সব মিলিয়ে আমাদের পাঁচ লক্ষ সেনা আছে। যা দিয়ে লাগগিন্তা রাজ্যের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া অসম্ভব হয়ে যাবে।’ যুবরাজ শিহিল মহারাজ রাসঙ্ককে বলল। ‘যুবরাজ, চিন্তা করো না। আমাদের সাথে দেবতারা আছেন। দেবতারা জানেন এ যুদ্ধ মঞ্জটের লোভের এবং প্রতিহিংসার একটি যুদ্ধ-এতে তারা জয়ী হতে পারে না। এ যুদ্ধ এক অধর্ম শক্তির লোভের ফল। আমরা ধর্মের পক্ষে আছি। আমার বিশ্বাস এই যুদ্ধে আমরাই জয়ী হব। আমরা সব সময় শান্তির পক্ষে ছিলাম এবং এখনো আছি। কিন্তু যুদ্ধ এখন আমাদের দোরগোড়ায় তাই আমাদের এই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। যুবরাজ তুমি চলদাজ রাজ্যের সেনাদের সেনাপতি-সবাইকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে আদেশ দাও।

চলবে...

লেখক: কবি ও লেখক, অধ্যাপক: অপরাধবিদ্যা, আইন ও বিচার বিভাগ, জন জে কলেজ, সিটি ইউনিভার্সিটি নিউইর্য়ক, মনস্তাত্তিক বিভাগ, হসটস কলেজ, সিটি ইউনিভার্সিটি, নিউইর্য়ক। কাউন্টার টেরোরিজম কর্মকর্তা, নিউইর্য়ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এনওয়াইপিডি)।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :