বিজয় একাত্তর হল

কপাট খোলে না লাইব্রেরির, জমেছে ধূলা

মনিরুল ইসলাম, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২৩:২২ | প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২০:১৫

প্রতিষ্ঠার ছয় বছর পেরিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল। প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থীর বাস এই হলে। তাদের নানা বিষয়ে পড়াশোনা ও জ্ঞান অর্জনের জন্য রয়েছে একটি মাত্র লাইব্রেরি। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ছয় বছরেও পুরোদমে সচল করা হয়নি লাইব্রেরিটি। দিনের পর দিন বন্ধই থাকে। বরং দীর্ঘদিন না খোলায় ধূলা-ময়লা জমেছে লাইব্রেরিতে।

বছর বছর বরাদ্দ দেয়া হলেও কেনা হয়নি কোনো বই। যে কটা বই আছে সেগুলো সৌজন্য পাওয়া। এ নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে আবাসিক শিক্ষার্থীদের। তবে, লাইব্রেরির দায়িত্বপ্রাপ্ত আবাসিক শিক্ষক বলছেন, শিক্ষার্থীরা বাহ্যিক বই পড়তে চায় না, তাই লাইব্রেরি খোলা হচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তীব্র আবাসন সংকট দূর করতে ২০১৩ সালে ৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯তম হল বিজয় একাত্তর হল। মনোরম স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হলটি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বৃহত্তম হল। উদ্বোধনের প্রায় এক বছর পর সিট বরাদ্দ দিয়ে সচল করা হয় হলটি। এরপর ছয় বছর পার হয়েছে। এর মাঝে কয়েক দফায় সচল করা হয় লাইব্রেরিটি। কিন্তু পুরোদমে সচল করতে ব্যর্থ হয় কর্তৃপক্ষ। এর জন্য শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, হলের চতুর্থ তলায় অবস্থিত লাইব্রেরির দরজায় তালা দেয়া। দীর্ঘদিন না খোলাতে তালায় ময়লা জমে আছে। জানালার কয়েকটি কাচ ভাঙা। ভাঙা কাচের নিচ দিয়ে ভেতরে চোখ রাখতেই দেখা গেছে প্রচুর ময়লা। এলোমেলো চেয়ার-টেবিল। এক পাশে সম্পূর্ণ ফাঁকা বড় একটি বুকসেলফ। তবে অন্য পাশের বুকসেলফে বেশ কিছু বই রাখা আছে।

হল অফিস সূত্রে জানা যায়, এসব বইয়ের একটিও লাইব্রেরির বরাদ্দ থেকে কেনা হয়নি। সব বিভিন্ন জায়গা থেকে পাওয়া সৌজন্য কপি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর বই কেনার জন্য প্রায় এক লাখ বিশ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট বইয়ের তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিজয় একাত্তর হলে লাইব্রেরি মঞ্জুরি হিসেবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও একই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১ লাখ ১০ হাজার এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দ দেয়া হয় এক লাখ টাকা।

পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কেন বই কেনা হচ্ছে না, আর কেনই বা লাইব্রেরি পুরোদমে সচল করা হচ্ছে না জানতে চাইলে লাইব্রেরির দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক আমিনুল ইসলাম এ জন্য শিক্ষার্থীদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা বাহ্যিক বই পড়তে চায় না, তাই এটি খোলা হচ্ছে না।

তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, লাইব্রেরিই খোলা থাকে না, তারা পড়বেন কীভাবে। শিক্ষার্থীরা পড়ুক বা না পড়ুক কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিয়মিত লাইব্রেরি খোলা রাখা বলেও মন্তব্য শিক্ষার্থীদের।

হল সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠাকাল ২০১৩ সাল থেকে ২০১৯ সালের শেষ পর্যন্ত হল প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন টেলিভিশন ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ জে এম শফিউল আলম ভূঁইয়া। তিনি দায়িত্বকালে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে অনানুষ্ঠানিকভাবে (মৌখিক) বেশ কয়েকবার কয়েকজন লাইব্রেরিয়ানকে লাইব্রেরি দেখাশোনার দায়িত্ব দেন। তবে মৌখিক এসব নিয়োগে স্থায়ী হননি লাইব্রেরিয়ানরা। সর্বশেষ গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রাধ্যক্ষ শফিউল আলম ভূঁইয়া আনুষ্ঠানিকভাবে লাইব্রেরিয়ান সহকারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। এর এক মাস পর নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর নিয়োগের জন্য এক প্রার্থীকে সুপারিশ করা হয়। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যেও গ্রন্থাগার সহকারীকে নিয়োগ না দিয়েই একই বছরের ডিসেম্বরে দায়িত্ব ছাড়েন শফিউল আলম।

নতুন প্রাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বে আসেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল বাছির। লাইব্রেরিয়ান সহকারী নিয়োগের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে চাইলে জানা যায়, লাইব্রেরিয়ান সহকারী নিয়োগের মানদণ্ড পূরণ করতে না পারা সত্ত্বেও নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল একজনকে। নিয়োগের মানদণ্ড পূরণ না করায় উপাচার্য ওই সুপারিশ বাতিল করেছেন বলে ঢাকা টাইমসকে জানান প্রাধ্যক্ষ ড. আব্দুল বাছির।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গত মেয়াদের প্রাধ্যক্ষ শফিউল আলম ভূঁইয়া ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এটি একটি বাজে কথা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নিয়োগের শর্ত পূরণ করেনি এমন কাউকে আমরা নিয়োগের জন্য সুপারিশ করিনি।’

নিয়োগের শর্ত পূরণ না করায় সেই নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানে কেন তারা নিয়োগ বাতিল করেছে। তবে শর্ত পূরণ করেনি এমন কাউকে আমরা নিয়োগের জন্য সুপারিশ করিনি।’

এ বিষয়ে হল সংসদের ভিপি সজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আমাদের যে ইশতেহার ছিল আমরা চেয়েছি প্রতিটা ইশতেহারই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করার। লাইব্রেরিটা দীর্ঘদিন ধরে সচল নেই। আমাদের সাবেক প্রাধ্যক্ষের কাছে আমরা ৮-১০ বার দাবি জানিয়েছি, যেন লাইব্রেরিটি দ্রুত সময়ের মধ্যে সচল করা হয়। মানসম্মত লাইব্রেরির জন্য যে বইগুলো প্রয়োজন সেগুলো কেনার জন্যও একাধিকবার দাবি জানিয়েছি। তিনি আমাদের বারবার অজুহাত দিতেন লাইব্রেরিয়ান নিয়োগ দিয়ে লাইব্রেরি সচল করা হবে। কিন্তু তার মেয়াদের শেষ মুহূর্তে এসে যেসব নিয়োগ বাকি ছিল তা সম্পূর্ণ করলেও লাইব্রেরিয়ান নিয়োগ সম্পন্ন করেননি।’

সজিব বলেন, ‘চলতি বছরের শুরুতে আমাদের নতুন প্রাধ্যক্ষ এসেছেন। তিনি তার দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। স্যারের সঙ্গে হল সংসদের ষষ্ঠ কার্যনির্বাহী সভায় আমরা জোরালোভাবে দাবি জানিয়েছি যেন দ্রুত লাইব্রেরিটি সচল করা হয়। স্যার আমাদের আশ্বস্ত করেছেন লাইব্রেরিয়ান নিয়োগে যে জটিলতা আছে সেটি দূর করে দ্রুত সময়ে লাইব্রেরি সচল করা হবে।’

এ বিষয়ে হল প্রাধ্যক্ষ ড. আব্দুল বাছির ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমি সবে মাত্র দায়িত্ব নিয়েছি। গত বছর লাইব্রেরিয়ান হিসেবে নিয়োগের জন্য যাকে সুপারিশ করা হয়েছিল তিনি নিয়োগের সব শর্ত পূরণ করতে পারেননি। এখন আবার নতুন করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হবে।’

তবে লাইব্রেরি খোলা না রাখার কারণ হিসেবে লাইব্রেরির দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকের বক্তব্য সঠিক নয় বলে মনে করেন হল প্রাধ্যক্ষ। তিনি বলেন, ‘আশা করি সব প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী এক মাসের মধ্যে লাইব্রেরিয়ান নিয়োগ দিয়ে হল লাইব্রেরি পুরোদমে সচল করা হবে।’

ঢাকাটাইমস/২৭ফেব্রুয়ারি/ইএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

শিক্ষা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :