কুয়েতি অভিযোগ সামলে নিয়েছেন সাংসদ পাপুল!

সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২০, ১৭:৩৯ | প্রকাশিত : ০৩ মার্চ ২০২০, ০৮:২৪

মানব পাচারের বিরুদ্ধে কুয়েতের সিআইডির অভিযানের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে গ্রেপ্তারের ভয়ে যে কুয়েত থেকে ‘পালিয়েছিলেন’ লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাংসদ পাপুল, গত দুই সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সেই দেশেই অবস্থান করছেন তিনি। এদিকে বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দৈনিক আরব টাইমস, আরবি দৈনিক আল কাবাস, কুয়েতি টাইমসসহ কয়েকটি দৈনিকে বাংলাদেশি এক সাংসদের বিরুদ্ধে মানব পাচারে জড়িত থাকার সংবাদ প্রকাশিত হলে তোলপাড় উঠেছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মানব পাচার চক্রটির একজন গ্রেপ্তার হলে বাকি দুজন কুয়েত থেকে দেশে চলে এসেছেন। এই দুজনের একজন লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাংসদ কাজী শহীদুল ইসলাম পাপলু বলে সংবাদ প্রচারিত হয়।

জানা গেছে, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি তাকে ইঙ্গিত করে কুয়েতের পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পরদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে কুয়েতে যান।

এর তিন দিন পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো অবৈধ পথে কুয়েতে লোক নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে এমপি পাপুলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য চেয়ে চিঠি দেয় কুয়েত দূতাবাসকে। দ্রুততম সময়ে একটি প্রতিবেদন পাঠাতে দূতাবাসকে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো জবাব এসেছে কি না তা জানাতে পারেনি বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান সংস্থাটি। গতকাল একজন কর্মকর্তা জানান, তারা শিগগির এ ব্যাপারে ফলোআপ করবেন।

পাপুলের দীর্ঘদিন ধরে কয়েতে অবস্থান করা নিয়ে তার নির্বাচনী এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তার অনুসারীরা একে ইতিবাচক হিসেবে নিয়ে বলছেন, তার বিরুদ্ধে যে খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে তিনি পালিয়েছিলেন, তা সঠিক নয় প্রমাণ হলো।

পাপুলের বিরোধীপক্ষের অভিযোগ, তিনি মানব পাচারের অপকর্ম ঢাকতে কুয়েতে অবস্থান করছেন। আর এদিকে দেশে জরুরি প্রয়োজনে মানুষ তার খোঁজে গিয়ে না পেয়ে ফিরে আসছে।

আর একটি পক্ষের ভাষ্য, করিৎকর্মা মানুষ পাপুল কুয়েতে সামলে নিয়েছেন। তিনি সময় বুঝে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন, আবার ফিরে গিয়ে সব ঠিক করে নিয়েছেন। কুয়েতি পত্রিকার প্রতিবেদনেও তার বিরুদ্ধে কুয়েতে জনশক্তি রপ্তানির জন্য সরকারি কার্যাদেশ পেতে ঘুষ হিসেবে সেখানকার সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তাদের পাঁচটি বিলাসবহুল গাড়ি দেওয়ার তথ্য এসেছিল।

পাপুলের ক্যারিশমা গত সংসদ নির্বাচনেও দেখা গেছে লক্ষ্মীপুর-২ আসনে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জোটের মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল জোট শরিক জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নোমানকে। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে না পেয়ে পাপুল স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। পরে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ নোমান। পাপুল বিপুল অর্থের বিনিময়ে নোমানকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেন বলে প্রচার আছে।

কুয়েতি পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তিনি নিয়মিতভাবে কুয়েত ও বাংলাদেশে যাতায়াত করেন। কখনো কুয়েতে ৪৮ ঘণ্টার বেশি থাকেন না। গতকাল তার গুলশানের বাসভবনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৪ ফেব্রুয়ারি সপরিবারে কুয়েত যাওয়ার পর এখনো ফিরে আসেননি তিনি।

এই সাংসদের গুলশানের বাসার সামনে তার নিজের এলাকা থেকে আসা পাঁচ-ছয়জনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা আসলে জানেন না সাংসদ কোথায় আছেন। এলাকার নেতারা তাদের বলেছেন তারাও সঠিক জানেন না সাংসদের অবস্থান। তাই তারা গুলশানের বাসায় এসেছেন যদি তাকে পাওয়া যায়।

তারা জানান, একটি কাজের জন্য গত তিন মাস ধরে ঘুরছেন, কিন্তু সাংসদের দেখা পাচ্ছেন না তারা। দেশে থাকলে ফোন ধরেন না এমপি। গত দুই মাস ঘুরেও এই অ্যাপার্টমেন্টে (এমপির বাসা) ঢুকতে পারেননি তারা।

তাদের মতো আরও কয়েকজনের একই অভিযোগ, এলাকা থেকে সাধারণ মানুষ এলেও এমপির সন্ধান পান না কেউ।

ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজনকে নিজের পরিচয় দিয়ে এই প্রতিবেদক এমপির সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তিনি জানান, সাংসদ নেই। গত দিন পনেরো ধরে তিনি নেই। কোথায় আছেন তারা বলতে পারবেন না।

বাসার নিচ থেকে এমপির ফোনে যোগাযোগ করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ সময় একজন নিরাপত্তারক্ষী বলেন, ‘কত মানুষ এইখানে আসি অপেক্কা করে, এমপি সাবের খবর থাকে না। থাকলেই না এমপিরে পাইব। রাইত-বিরাইত ফোন দিলে পাওন যা!’

দুদকের নথিতে পাপুল

রাজনীতিতে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাংসদ পাপুলকে নিয়ে কুয়েতি পত্রিকার তথ্যমতে, তার কোম্পানি ২০ হাজারের মতো লোককে কাজের কথা বলে প্রবাসে নিয়ে যায়, যা থেকে তিনি আয় করেন প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

আর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পড়েছে দুদকে। অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি। দুদকের পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল আওয়াল অনুসন্ধানের পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণে বিশেষ তদন্ত অনুবিভাগের মহাপরিচালককে ২৬ ফেব্রুয়ারি চিঠি দেন।

জানা গেছে, দুদকে সাংসদ ও ব্যাংক পরিচালক কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুলের বিরুদ্ধে ১৭৪ পাতার অভিযোগ জমা হয়েছে। দুদকের নথিতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি অবৈধভাবে লোন বরাদ্দ, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ মানি লন্ডারিং করে বিদেশে পাচার এবং শত শত কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। পাপুল এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের একজন পরিচালক। স্ত্রীর নামে একই ব্যাংকের ৩০ কোটি টাকার শেয়ার কিনে তাকে অংশীদার করেছেন তিনি।

দুদকে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালক পাপলু ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ২৮০ কোটি টাকা পাচার করেন হুন্ডি ও বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে। এর মধ্যে ১৩২ কোটি টাকা মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মতিঝিল শাখার একটি হিসাবের মাধ্যমে, ৪০ কোটি টাকা প্রাইম ব্যাংকের এক কর্মকর্তার মাধ্যমে, ১০ কোটি টাকা একই ব্যাংকে ঋণ সৃষ্টি করে ও ১০ কোটি টাকা ইউসিবিএলের মাধ্যমে পাচার করা হয়।

পাপুলের যেসব সম্পত্তির তথ্য দুদকের কাছে জমা পড়েছে, এর মধ্যে রয়েছে গুলশান-১-এর ১৬ নম্বর সড়কে গাউসিয়া ডেভেলপমেন্টের প্রকল্পে মেয়ে ও স্ত্রীর নামে দুটি ফ্ল্যাট, গুলশান-২-এর পিংক সিটির পেছনে গাউসিয়া ইসলামিয়া প্রকল্পে স্ত্রীর নামে ৯০০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, স্ত্রী ও নিজের নামে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ বিভিন্ন স্থানে পাপুলের ৯১ কোটি টাকার সম্পদ আছে বলে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকের ঢাকার ওয়েজ অনার্স শাখায় স্ত্রীর নামে ৫০ কোটি টাকার ওয়েজ ওনার্স বন্ড ও মেয়ের নামে ২০ কোটি টাকার বন্ড আছে। শ্যালিকার নামে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দুটি বিলাসবহুল গাড়ি কিনে নিজে ব্যবহার করছেন। এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে নিজ নামে ৪০ কোটি, মেয়ের নামে ১০ কোটি ও স্ত্রীর নামে ২০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় স্ত্রীর নামে একটি ছয়তলা বাড়ি আছে।

এই সাংসদের নিজের এলাকার লোকজনের অভিযোগ, তার কোম্পানির মাধ্যমে শ্রমিকদের কাছ থেকে ৫-৬ লাখ টাকা করে নিয়ে তাদের কুয়েতে পাঠানো হয়। অনেক শ্রমিক তাদের শ্রমের টাকা পাচ্ছেন না, এমন অভিযোগের ভিডিও ছেড়েছেন অনেকে।

গত মাসে যখন কুয়েতের পত্রিকায় সাংসদ পাপুলের বিরুদ্ধে মানব পাচারের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার কোটি অভিযোগ ওঠে, তখন দেশের গণমাধ্যমে পাপুল দাবি করেছিলেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কারণে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি কোনো ধরনের অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত নন।

আর সম্প্রতি পাপুল কুয়েত থেকে দেশের একটি গণমাধ্যমকে জানান, তার প্রতিষ্ঠান মারাফি কুয়েত গ্রুপে ১০ হাজার বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের ৩০ হাজার লোক কাজ করেন। তার বিরুদ্ধে কারও কোনো অভিযোগ নেই।

স্থানীয় এলাকাবাসী সূত্রে আমাদের লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল গত ৩০ বছর ধরে কুয়েতে ব্যবসা করছেন। মারাতিয়া কুয়েতি গ্রুপ অব কোম্পানিজের স্বত্বাধিকারী তিনি। তাকে নিয়ে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাবেক উপজেলা পরিষদের ভাইস-চেয়ারমান মো. শাহজাহান বলেন, ‘পাপুলের মূল ব্যবসা কুয়েতে মানবপাচার করা। তিনি হাজার হাজার মানুষ কুয়েতে নিয়েছেন। এলাকায় দু-হাতে টাকা বিলি করেন তিনি। তার টাকা পকেটে যায়নি এমন মানুষ পাওয়া যাবে না।’

পাপুলকে ভালো মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে তার ঘনিষ্ঠ এই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ‘তারপরও তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, সেটি দ্রুত তদন্ত করে সঠিক তথ্য উদঘাটন হবে বলে আশা করি।’

প্রথম জীবনে পাপুল কুয়েতের একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেন বলে জানা যায়। পরে নিজেই প্রতিষ্ঠানটির একজন অংশীদার হয়ে ওঠেন। এরপর নিজের মতো করে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে শুরু করেন তিনি।

(ঢাকাটাইমস/৩মার্চ/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :