গল্প

মন খারাপের চিঠি

সঙ্গীতা ইমাম
 | প্রকাশিত : ০৯ মার্চ ২০২০, ১০:৫১

জিপিওর গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে গোলাম মওলা সাহেবের মনে হয়- একসময় কী ভিড় থাকত এ চত্বরটাতে! সকালে দরজার কাঠের পাল্লাগুলো খুলতেই লোকজন হুড়মুড় করে দৌড়ে কে কার আগে কাউন্টারে লাইনে দাঁড়াবে, তার প্রতিযোগিতা চলত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে বিদেশে আত্মীয়-বন্ধুদের কাছে চিঠি পাঠাত। খাম, ডাকটিকিট আর এয়ারোগ্রাম কিনত।

কোনো কাউন্টারে খামের ওজন মেপে সেই দামের টিকিট লাগাতেন বা ছাপ টিকিট দিয়ে চিঠি পোস্ট করতেন। আবার কোথাও বা অনেক স্বপ্ন চোখে নিয়ে চাকরির দরখাস্ত পাঠাবার লাইন। ডাক বিভাগের বিমাও রমরমা ছিল একসময়। এখন এই বুথগুলো ফাঁকা পড়ে থাকে।

কাচের ওপারে বাশার ভাই, ইউনুস সাহেব, রহমত আলী সাহেব, লোকমান ভাই প্রত্যেকেই প্রায় পনেরো থেকে কুড়ি বছর ধরে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। মানুষের কত অনুরোধ রাখতে হতো তখন। এখন শুধু অপেক্ষা, খবরের কাগজ পড়া, সময়মতো উঠে নামাজ পড়ে টিফিন খেয়ে এসে আবার অপেক্ষা- কখন অফিস ছুটি হবে।

কদাচিৎ দু-একজন যে আসে না তা নয়, তবে বেশির ভাগই কোনো অফিসের বা সংগঠনের দাওয়াত বা নোটিশের চিঠি নিয়ে। একই মানুষ আসেন বলে মুখগুলো চেনা হয়ে গেছে বাশার সাহেবের। এরা এলেই বাশার সাহেবের কাউন্টার সচল হয়। বাকি কাউন্টারে খাম বা টিকিট কিনতে সারা দিনে একজনও আসেন না- এমন দিনও যায়। সহকর্মীদের সাথে আড্ডাটাও তখন আর তেমন জমে না। সবার সংসারের অবস্থাই সবার জানা। অভাব আর নিস্তরঙ্গ জীবন। কোনো কোনো দিন চাঞ্চল্যকর কোনো খবর পত্রিকায় পড়লে আলোচনা সরগরম হয়। সেই আলোচনায় গোলাম মওলাও এসে যোগ দেন।

গোলাম মওলা ডাক বিভাগের কর্মী। তার কাজ সেগুনবাগিচা, তোপখানা আর পল্টন এলাকার ডাকবাক্স খুলে চিঠিগুলো ভাগ ভাগ করে এনে নির্দিষ্ট জায়গায় জমা দেয়া। ডাকবাক্সগুলো মেরামতের ব্যবস্থা করা, নষ্ট হয়ে গেলে তালা বদলানো বা মাঝে মাঝে রং করা। আজকাল তো আর কেউ সেভাবে চিঠি লেখে না। তাই প্রতিদিন ডাকবাক্সও খোলা হয় না। সপ্তাহে দু দিন- সোম আর বৃহস্পতিবার ডাকবাক্সগুলো খোলেন গোলাম মওলা। এমন অনেক মাসই যায়, সারা মাসে আটবার ডাক বাক্স খুলে একটি চিঠিও তিনি পাননি। এলাকার গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গায় পাশাপাশি তিনটি ডাকবাক্স থাকেÑ লাল, হলুদ আর নীল। লাল রঙের ডাকবাক্সে থাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠানো চিঠিগুলো। হলুদ রঙের বাক্সটিতে ঢাকা শহরের আর নীল রঙা ডাকবাক্সটিতে বিদেশে পাঠানো চিঠিগুলো।

মাসের পর মাস ডাকবাক্সগুলো খুলে খালি হাতে ফিরে আসতে আসতে একসময় গোলাম মওলা বাক্সগুলো খোলার আগ্রহই হারিয়ে ফেলেন। পোস্টমাস্টার সাহেবকে বলে পার্সেল ডিপার্টমেন্টের কিছু কাজে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছেন- সেও অনেকদিন। জিপিওর এই বিভাগটিই সবচেয়ে সচল। সারা দেশ থেকে জিনিসপত্র আসে এই ব্যস্ত শহরে আবার শহর থেকেও নানা কিছু যায় দেশের নানা প্রান্তে। কুরিয়ার সার্ভিসের তুলনায় ডাক বিভাগের পার্সেল সার্ভিস অনেক সস্তা। আর জিনিসপত্রও নিরাপদে পৌঁছায়। ফলে পার্সেল বিভাগের প্রতি এখনও মানুষের আগ্রহ আছে।

পার্সেল বিভাগের নানান আদান-প্রদানে লেগে থাকে মায়ের আদর-স্পর্শ, স্ত্রী কিংবা প্রেমিকার ভালোবাসার ছোঁয়া বা বন্ধুর প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় নানা কথার ফুলঝুরি। আজকাল তো হরহামেশাই মানুষ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান। প্রতিটি পরিবারেই দেখা যায় একজন না-একজন বিদেশে থাকেন। তাদের কাছেও উৎসব অনুষ্ঠানের উপহার, জরুরি কাগজপত্রসহ আরও কত কিছু পাঠাতে হয়! প্রযুক্তি যতই উন্নতি করুকÑ মায়ের বিয়ের শাড়িটা বিদেশে থাকা বোনের কাছে তো আর ফেসবুকে পাঠিয়ে দেয়া যায় না! তাছাড়া যারা বিদেশে পড়তে যেতে চান, তারাও নিরাপদে কাগজপত্র পাঠানোর জন্য ডাক বিভাগের পার্সেলকেই বেছে নেন। ফলে এই পার্সেল বিভাগের কাজ আর ব্যস্ততা এখনও ডাক বিভাগকে সচল রেখেছে। এখন জিপিওর প্রাণ বলতে গেলে এই পার্সেল বিভাগ। তাই এই বিভাগে কর্মরতদের গর্বে যেন মাটিতে পা পড়ে না! তবু এর কারণেই জিপিও ভবনে এখনও মানুষের আনাগোনা আছে।

আর কিছু লোকজন দেখা যায় বিল কাউন্টারগুলোতে। সে সংখ্যাও আজকাল কমে আসছে। অনলাইনে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা থাকায় প্রবীণ মানুষরাই এখন এসে দাঁড়ান এই লাইনে। পার্সেল বা বিলের লাইনে দেখা যায় এলাকার অফিসগুলোতে কর্মরত পিয়নদের। হাতে এক গোছা চিঠি বা বিলের কাগজ।

দুই.

আজ গোলাম মওলা বারবার কেন যেন পুরোনো দিনে ফিরে যাচ্ছেন মনে মনে। একটা সময় এমন দিনও ছিল, যখন প্রতিদিন তিনটি আলাদা চিঠির বোঝা নিয়ে জিপিওতে আসতে ঘাম ছুটে যেত। কী বিরক্ত যে লাগত তখন! লোকে এত চিঠি লেখে! খেয়ে কাজ নেই নাকি এদের!

আর আজকাল মনে হয় উল্টো। কেউ কি ভুল করেও একটা চিঠি লিখতে পারে না? চিঠিটা হারিয়েই গেল মানুষের জীবন থেকে! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটি দাপ্তরিক ফাইলের ওপর লেখা ডাক বিভাগের সেøাগানটি চোখে পড়লÑ ‘চিঠি লিখুন, ইহাই স্থায়ী।’

মনের অজান্তেই যেন গোলাম মওলা ফাইলটি হাতে তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ সেøাগানটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। কত চিঠি বিলির স্মৃতি মনের কোণে এসে জমা হলো। নিজের স্মৃতি, সহকর্মীদের কাছে শোনা স্মৃতি... এসবই যেন একে একে এসে জমা হতে লাগল মনের বারান্দায়। কত কাজ ছিল তখন হাতে! কত মিষ্টি চিঠি, কত জরুরি খবর, কখনো বা দুঃসংবাদ... এমন কত রকমের চিঠি ভর্তি বস্তা এনে জমা করা হতো জিপিওতে। তারপর এলাকা ভাগ করে চলত চিঠির বিলি-বণ্টন। বিদেশিগুলো আলাদা করে পৌঁছে দিতে হতো নির্দিষ্ট জায়গায়। তখন বিরক্ত লাগলেও এখন মনে হয় তার কাজটি কত দায়িত্বের ছিল।

এসব ভাবনা মাথায় নিয়েই জিপিও থেকে বের হলেন গোলাম মওলা। নিজের অজান্তেই বায়তুল মোকাররম পেরিয়ে স্টেডিয়ামের গেটের পাশের ডাকবাক্সগুলোর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার মনে হলো- কতদিন তিনি বাক্সগুলো খোলেন না। আর রোদ-জল-বৃষ্টিতে ডাকবাক্সের রং এখন আর আলাদা করা যাচ্ছে না। ডাকবাক্সগুলো রং করাও দরকার। এসব কথা মনে হতেই দ্রুতপায়ে তিনি জিপিওতে ফিরে এসে পোস্টমাস্টার স্যারের কাছে গিয়ে ডাকবাক্স রং করার অনুমতি চাইলেন। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের রিক্যুইজিশন দিলেন।

স্যার বললেন, পরদিন সকালে এসে স্টোর থেকে জিনিস নিয়ে যেতে।

এরপর গোলাম মওলা নিজের চাবির বাক্স খুলে চাবির গোছা নিয়ে আবার চলে গেলেন ওই ডাকবাক্সগুলোর সামনে। প্রথমে হলুদ বাক্সটা খুলে দুটো মরা ইঁদুর আর ময়লা ছাড়া কিছুই পেলেন না। যত্ন করে তিনি হলুদ ডাকবাক্সটি পরিষ্কার করে আবার তালা লাগিয়ে দিলেন।

এরপর খুললেন নীল ডাকবাক্স, সেখানেও প্রচুর ময়লা। ময়লা পরিষ্কার করতে গিয়ে একটি চিঠি পেলেন। যত্ন করে চিঠিটি তুলে নিয়ে দেখেন খামের ওপরে প্রাপকের জায়গায় কাঁপা হাতের লেখায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির একটি ঠিকানা। আর প্রেরকের জায়গায় শুধু লেখাÑ ‘এ বি এম শামসুদ্দিন, পল্টন, ঢাকা।’

বোঝা যাচ্ছে না চিঠিটি কতদিন ধরে পড়ে আছে এই ডাকবাক্সে। খানিকটা নেড়েচেড়ে চিঠিটি পকেটে নিয়ে তালা বন্ধ করে এবার লাল ডাকবাক্সটা খুললেন। সেটাও শূন্য। ধুলাবালি আর ময়লা পড়ে আছে। বাক্সটি পরিষ্কার করে আবার তালাবন্ধ করলেন।

নীল ডাকবাক্সে পাওয়া চিঠিটি তিনি পকেটে নিলেন। নিজের গাফিলতির ওপর খুব রাগ হচ্ছিল গোলাম মওলার। বারবার মনে হচ্ছিল- তিনি ডাকবাক্স খোলেননি বলে এই মানুষজনের কতই না অসুবিধা হয়েছে। এই দুজনের না জানি কত জরুরি খবর ছিল প্রিয়জনকে পৌঁছানোর। ভীষণ এক আত্মগ্লানি পেয়ে বসল গোলাম মওলাকে। তার মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ডাকবাক্স বন্ধ করে নিজের মেজাজ নিজের ওপর চড়িয়ে গোলাম মওলা বাড়ির পথে রওনা হলেন।

গোলাম মওলা স্টেডিয়ামের সামনে থেকে সায়েদাবাদগামী বাসে উঠলেন। তার পৈতৃক বাড়ি উত্তর শাহজাহানপুরের এক গলিতে। সরু গলি- এতটাই সরু যে, দুটো রিকশা পাশাপাশি যেতে পারে না। তিন ভাইয়ের ভাগের বাড়ি। নিচতলায় দুই ভাই আর দোতলার তিন ঘর ও সামনের ছাদটুকুই তার আস্তানা।

ঘরের দরজার তালা খুলে ভেতরে ঢুকলেই প্রতিদিন এক বিরাট শূন্যতা গ্রাস করে তাকে। স্ত্রী ফরিদা বেগম মারা গেছেন প্রায় দু বছর হতে চলল। প্রভিডেন্ট ফান্ড ভেঙে একমাত্র ছেলেকে পড়তে পাঠিয়েছিলেন আমেরিকায়। পড়া শেষে সেখানেই সংসার পেতেছে ছেলে। মায়ের মৃত্যুতেও আসার সময় হয়নি তার। নাতনিকে দেখেছেন ছবিতে।

তবে প্রতিদিনের শূন্যতার সঙ্গে আজকের শূন্যতার একটা ফারাক আছে। মানুষ প্রতিদিন যে শূন্যতার সঙ্গে বাস করে, তার সঙ্গে কেমন একটা অভ্যস্ততা জড়িয়ে যায়। ঘরে ঢুকেই গোলাম মওলা যেন টের পেলেন- এ তার প্রতিদিনের বাড়ি ফেরার শূন্যতা নয়। কেমন একটা গুমোট ভাবনা, একটা বিষণ্নতায় মনটা আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। বিলি না-হওয়া চিঠি দুটোই যেন মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। খুব ইচ্ছে করছে চিঠি দুটো খুলে পড়ে দেখতে। কতদিন আগের চিঠি, কোথায়, কার কাছে পাঠানো হয়েছিল- খুব জানতে ইচ্ছে করছে গোলাম মওলার। বারবার মনে হচ্ছে কোনো একটি উপায় বের করে চিঠিগুলো যদি প্রাপককে পৌঁছে দেয়া যেত! নিজেকে গ্লানিমুক্ত করার আর কোনো উপায় খুঁজে পেলেন না গোলাম মওলা। কিন্তু অন্যের চিঠি খুলে পড়তেও তার বিবেকে বাধছে। মনের সাথে অনেক যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত তিনি চিঠি দুটো খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন। মনে মনে নিজেকে বোঝালেন- যদি চিঠির ভেতরে কোনো তথ্য পাওয়া যায়; তবে তো চিঠিটি পৌঁছানো সম্ভব হলেও হতে পারে।

চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখে নিজের মনের নানা দ্বিধাকে জয় করলেন তিনি। খামটি খুলে চিঠিটা চোখের সামনে মেলে ধরলেন। এক মৃত্যুপথযাত্রী বাবার চিঠি। বিদেশে পাড়ি জমানো বহু বছর না-দেখা ছেলের কাছে একবার শেষ দেখার জন্য আকুল মিনতি চিঠিজুড়ে। লেখা হয়েছিল ২০১৯ সালের ১১ অক্টোবর তারিখে। প্রেরক লিখছেন-

বাবা রাহুল,

বউমা ও নাতি সোনাকে নিয়ে কুশলে আছ আশা করি। তোমাকে দেখি না কতদিন। পাঁচ বছরেরও বেশি হবে। অথচ দেখ, মনে হয় যেন কত যুগ দেখি না তোমাদের। তোমার মা তো তোমাদের দেখার আকাক্সক্ষা বুকে নিয়েই চলে গেলেন। আমাকেও ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছেন। আর হয়তো দুই কি তিন মাস। ক্যানসার এখন ফুসফুসেও ছড়িয়ে গেছে। আমিও কি তোকে না দেখেই চলে যাব রে বাপ! বাবা রে, শেষ ইচ্ছা মনে করেও একবার আয়। আর যদি দেখা না-ই হয় অতৃপ্ত আমার তবু কোনো দাবি থাকবে না তোর প্রতি। তুই যেন ভালো থাকিস, এই দোয়াই করি। নাতিকে তো কখনো চোখের দেখা দেখতে পেলাম না। খালি ছবিতেই দেখলাম। তোকেও দেখি না কতকাল। যাবার আগে না হয় আমার ছোট রাহুলের ছবি নিয়েই চলে যাব। যদি সম্ভব হয় দাদু ভাইকে বলিসÑ বাংলাদেশটা ওর দেশ। এদেশে ওর বাবার ছোটবেলা কেটেছে, এই দেশে ওর দাদু-দিদা থাকত।

আমি চলে গেলে তো বাড়ির শেষ পাহারাদারটাও চলে যাবে। এখন বকর-বিল্লাল আছে বলে তবুও বিল-টিল দেয়। পরে কী হবে রে বাপ! এই বাড়িতে তোর ছেলেবেলা কেটেছে। এখান থেকে তুই স্কুলে গেছিস, কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে আজ আমেরিকায়। তোর মনে আছে লিটিল জুয়েলস স্কুল থেকে তুই দৌড়ে বাড়ি চলে আসতিস। তোর মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতেন। তখন বাড়ির পাশের স্কুল থেকেও তোর বাড়ির ফেরার কী তাড়া ছিল! আর আজ এত দূর থেকেও তোর একবার বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না?

থাক এসব কথা। আজকাল এসবই বেশি মনে পড়ে। তোমার আগের টেলিফোন নম্বরে অনেকবার ফোন করেও পাইনি। যদি চিঠিটা তোমার হাতে যায়, পারলে একবার ফোন কর। যদি বেঁচে থাকি কথা হবে রে বাপ। দেখতে না পেলেও গলার স্বরটি তো শুনে যাব। ভালো থাকিস বাবা।

ইতি

বাবা

চিঠিটা পড়তে পড়তে থরথর করে কাঁপছেন গোলাম মওলা। তার দু চোখ বেয়ে সমানে পানি ঝরছে। পড়া শেষ হলে তিনি পাথর হয়ে বসে রইলেন।

তিন.

কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে থাকার পর গোলাম মওলার মনে হলো নিজের অপরাধ কিছুটা লাঘব করতে হলে তাকে এই চিঠির লেখককে খুঁজে বের করতেই হবে। পল্টন বড় জায়গা। তবে চিঠিতে লিটিল জুয়েলস স্কুলের পাশে বাসা ছিল বলে লেখা আছে। তিনি ঠিক করলেন কাল সকালে অফিসে যাবার আগে লিটিল জুয়েলস স্কুলের কাছে গিয়ে এ বি এম শামসুদ্দিন নামে কোনো বয়স্ক মানুষের বাড়ির খোঁজ করবেন।

রাতে আর কিছু খেতে ইচ্ছা করল না তার। বিছানায় শুয়ে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক নানা চিন্তায় ডুবে থাকলেন। বারবার নিজেকে দোষারোপ করলেনÑ কেন তিনি ডাকবাক্স নিয়মিত খোলেননি! বিছানায় ছটফট করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন।

পরদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে রওনা হলেন পল্টন হাউজ বিল্ডিংয়ের পিছনে লিটিল জুয়েলস স্কুলে। স্কুলের সামনে যানজট। ছোট ছোট শিশুরা বাবা-মায়ের হাত ধরে স্কুলের গেটে যাচ্ছে। ঢোকার আগে মা-বাবার আদর নিচ্ছে, টা-টা করে বন্ধুর গলা ধরে ঢুকছে স্কুলে। চোখ ভিজে এলো গোলাম মওলার।

খানিকটা সরে এসে সামনের মনোহারি দোকানের সামনে দাঁড়ালেন। একটি ছেলে বেচাকেনা করছে। খুব ব্যস্ত সময়। পেছনে ক্যাশে বসে আছেন মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক। মনে হয় দোকানের মালিক। স্কুলের ঘণ্টা পড়তেই দোকানের ভিড় কমে আসল। গোলাম মওলা ক্যাশে বসা ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে এ বি এম শামসুদ্দিন সাহেবের কথা জিজ্ঞেস করলে প্রথমে তিনি চিনতে পারেননি। তারপর কিছুক্ষণ ভেবে স্কুলের দেয়ালের শেষে একটি পুরোনো দোতলা বাড়ি দেখিয়ে দিলেন।

ভদ্রলোকের কথায় গোলাম মওলা খানিকটা আশার আলো দেখে এগিয়ে যেতেই ভদ্রলোক পেছন থেকে ডাকলেন।

ফিরে আসতেই ভদ্রলোক বললেন- ‘ওই বাড়িতে তো দু জন পুরোনো কাজের লোক ছাড়া আর কেউ নেই।’

এ বি এম শামসুদ্দিন সাহেবের কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেনÑ ‘উনি তো দেড় মাস আগেই মারা গেছেন। ক্যানসারের পেশেন্ট ছিলেন তো...।’

কথাটি শুনে গোলাম মওলা ওখানেই বসে পড়লেন। এত হতাশ তিনি কোনোদিন হননি। তবুও খানিকটা সময় নিয়ে তিনি উঠে নিজেকে শক্ত করে ওই বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন।

পোড়োবাড়ির মতো একা দাঁড়িয়ে বাড়িটি। বাড়িটি দেখেই বুকটা ধক করে উঠল তার। নিচে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে কলিংবেল বাজালেন কয়েকবার। ওপর থেকে একজন বয়স্ক লোক গলা বাড়িয়ে ‘কাকে চাই’ জানতে চাইলেন।

শামসুদ্দিন সাহেবের নাম বলতেই ওপরের লোকটা খুব বিরক্ত হয়ে বললেন- ‘তিনি তো দেড় মাস আগেই মারা গেছেন।’

কথাটুকু বলেই চলে যাচ্ছিলেন লোকটি। তাড়াতাড়ি গোলাম মওলা তাকে একবার নিচে আসতে অনুরোধ করলেন। লোকটি অনিচ্ছা সত্ত্বেও গজগজ করতে করতে নিচে এসে দরজা খুলে দাঁড়ালেন।

গোলাম মওলা তার সামনে চিঠিটি ধরে জিজ্ঞেস করলেন- ‘এ হাতের লেখা আপনি চেনেন?’

লোকটি জানাল- এটি তার স্যার এ বি এম শামসুদ্দিনের লেখা। আর নাম-ঠিকানা স্যারের ছেলের।

এবার গোলাম মওলা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। পথের মধ্যে বসে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কাঁদতে কাঁদতে জানতে চাইলেন মৃত্যুর পরে শামসুদ্দিন সাহেবের ছেলে এসেছিলেন কি না।

লোকটি চোখ মুছতে মুছতে মাথা নেড়ে জানাল- না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :