বাজেট প্রতিক্রিয়ায় অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

বাজেটে আবেগ আছে, কার্যকর বাস্তবায়ন চাই

জহির রায়হান, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১২ জুন ২০২০, ১৩:৪৫ | প্রকাশিত : ১২ জুন ২০২০, ১৩:১৭

বাজেটের বইয়ের নাম দেয়া হয়েছে ‘অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যত পথপরিক্রমা’। অর্থনৈতিক উত্তরণের বাজেট বলে এখানে প্রচুর আবেগ আছে। মানে অবস্থা আমাদের খুব খারাপ হয়ে গেছে। আমরা অনেক উন্নতি করছিলাম, হঠাৎ করে এই আপদ-বিপদ এসে আমাদের পিছে ঠেলে দিয়েছে। সুতরাং এখানে মানুষকে দুভাবে বাঁচাতে হবে। একটা হলো কোভিড–১৯ থেকে বাঁচাতে হবে, আর একটা হলো না খেয়ে মরা থেকে বাঁচাতে হবে। এ রকম একটা বাস্তবতায় আবেগ থাকাটাই স্বাভাবিক। আবেগ থাকলেই সেটাকে বাস্তবতায় হয়তো নেওয়া যায়।

আগামী ২০২০-২১ প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ ঢাকা টাইমসকে এসব কথা বলেন। তিনি বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেন। বলেন, প্রতি বছরই বাস্তবায়নে ঘাটতি থাকে, এবার যেন সঠিকভাবে বাস্তাবায়ন করা হয়।

গতকাল জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব পেশ করেন। মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা।

খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, বাজেটের আকার নিয়ে যদি কথা বলতে হয়, তাহলে বলব আকার তো বাড়বেই। আমাদের যেহেতু খরচ বেশি করতে হবে, তাই বাজেটও বড় হবে। কিন্তু সেই টাকা থাকতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় রাজস্ব এবং অন্যান্য আয় যেটা ধরা হয়েছে সেটা কতটা যুক্তিসংগত। সেটা বুঝতে পারছি না। এই বছরই বেশ কিছু রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। আগামী বছর সমস্যার উন্নতি খুব বেশি হবে বলে আমার মনে হয় না। রাজস্ব ঘাটতি আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কঅর্থনীতিতে নানান ধরনের টাকাপোড়েনে মানুষের আয়ও কমে গেছে। যদিও বলা হয়েছ পাঁচ লাখ নতুন করদাতা শনাক্ত করা হয়েছে এখন সেখান থেকে কতটা কর আদায় করা যাবে সেটা দেখার বিষয়। এখানে একটা সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

আয়-ব্যয়ের বিশাল ঘাটতির বিষয়ে ড. খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ঘাটতি এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সেটা জিডিপির ছয় শতাংশ। সাধারণত আমরা ঘাটতি পাঁচ শতাংশ পর‌্যস্ত সমর্থন করি। ৭ শতাংশ হলেও আমার আপত্তি থাকত না। এ বছর তো আমাদের উত্তরণ ঘটাতে হবে। বর্তমান যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এই রকম অবস্থা হয় না সাধারণত।

এই ঘাটতিটা মেটাবে কী করে। ড. খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘একটা হচ্ছে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া, আর একটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া। আবার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়া। আরেকটা বিষয় হলো বিদেশ থেকে অনুদান নেয়া। এখানে যেটা লক্ষ রাখতে হবে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে যেন কম ঋণ নেওয়া হয়। বণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ কম নেয়া উচিত। যাতে যারা বিনিয়োগ করবে তারা যেন অর্থ পেতে পারে।’

অগ্রাধিকার খাতে দ্রুত বরাদ্দের তাগিদ দিয়ে ড. খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, অগ্রাধিকার যেটা ধরা হয়েছে- যেমন স্বাস্থ্য, কৃষি, নিরাপত্তা বেষ্টনি, শিক্ষা। এগুলো বাজেটে সেভাবেই আছে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় থোক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। এই বছর যেটা খরচ করা হয়েছে ৫২৯ কোটি টাকা। আবার ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রণোদনা দেয়ার জন্য ৮৫ কোটি দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবীমা ও জীবনবীমাসহ অন্যান্য কাজের জন্য। এটার ধারাবাহিকতায় আরও ১০ হাজার কোটি দেয়া হয়েছে। এটা দ্রুত ব্যবহার করতে হবে, যাতে আমাদের সক্ষমতা বাড়ে। করোনা ভাইরাস এটা কতদিন চলবে আমরা জানি না। কাজেই দ্রুত সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বরাদ্দটা ঠিক আছে।‘

স্বাস্থ্যখাতে আরও বরাদ্দ প্রয়োজন ছিল মন্তব্য করে ড. খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৯ হাজার কোটি টাকা। এটা বাজেটের অংশ হিসেব ৫ শতাংশ, আর জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক নয় শতাংশ। কাজেই খুব একটা বাড়েনি। এই বছর আশা করেছিলাম আর একটু বেশি হবে এবং সেটা আস্তে আস্তে তিন শতাংশের দিকে যাবে। কারণ আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামোটা গড়ে তুলতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক যেগুলো আছে সেটা তেমন ফলপ্রসু হচ্ছে না। সারাদেশের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে কেন্দ্র করে যদি স্বাস্থ্যসেবাটা সম্প্রসারিত করা হয়। সেগুলোকে কেন্দ্র করে বরাদ্দ থাকা উচিত ছিল। তাহলে বর্তমানে যে স্বাস্থ্যখাতের ভঙ্গুরতা সেটা কমত’।

সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের বিষয়ে ড. খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, অনেক মানুষ তো এখন কর্মহীন, তাদের আয় নেই, যে সঞ্চয় ছিল খরচ হয়ে গেছে। না খেয়ে, আধা খেয়ে আছে। তাদের জন্য সরকার খাবার দেওয়া চলমান রাখছে। ৯৫ হাজার ১৫৫ কোটি টাকার বরাদ্দ আছে নিরাপত্তা বেষ্টনিতে। যেটা বাজেটের ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ আর জাতীয় আয়ের তিন শতাংশ। গত অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা। করোনা থেকে বাচাঁনো, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও পুষ্টি নিরাপত্তাহীনতা থেকে বাঁচানোর জন্য এই বৃদ্ধিটা দরকার ছিল।

প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতে ২৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৩৯ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

বলেন, পল্লী উন্নয়নে জোর দেওয়া হলে ভালো। সাধারণ মানুষের অবকাঠামো এখানে যদি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও নিয়ে আসা হয়। পল্লী উন্নয়নে যা যা লাগে।

বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় করার তাগিদ দিয়ে খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য নিরাপত্তা খাতে ২২ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়ে মাত্র এক হাজার ৫ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। তবে পল্লী উন্নয়নের ৩৯ হাজার কোটি টাকা মিলিয়ে দুটোকে দেখলে ঠিক আছে। এখানে রাস্তাঘাট, হাট-বাজার ঠিক করবে। কিন্তু অর্থের ব্যয় করতে হবে সঠিকভাবে।

অনু উদ্যোক্তাদের কাছে বরাদ্দের টাকা পৌঁছানো কঠিন হিসেবে আখ্যায়িত করে স্বাধীনতা পুরস্কারজয়ী এই কৃতী অর্থনীতিবিদ বলেন, বাজেটে অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কথাও বলা হয়েছে। এখানে পৌঁছানো খুব কঠিন কাজ। ব্যাংকের মাধ্যমে এখানে পৌঁছানো যাবে না। অতি ক্ষুদ্র উদ্যেক্তা, যারা দুই থেকে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে। এখানে সারা দেশে এক কোটির মতো প্রতিষ্ঠান আছে। তাদের কাছে পৌঁছানেরা ব্যবস্থা করতে হবে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রস্তাবিত বাজেটে আলাদা কিছু চোখে পড়েনি। তবে বিভিন্ন খাতে কাজগুলো চালু হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। যাদের করোনা প্রাদুর্ভাবে চাকরি চলে গেছে তাদের সেখানে কাজে আনতে হবে।

(ঢাকাটাইমস/১২জুন/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :